মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী ২০১৪ সালে প্রথম সংসদ সদস্য (এমপি) হয়েই নানারকম বিতর্কে জড়াতে থাকেন। সর্বশেষ বিতর্কে জড়ান চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি। নিজ দলের বয়োবৃদ্ধ পৌর মেয়রকে অনুসারী দিয়ে পেটানোর অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এর আগে নিজ অনুসারী দিয়ে মুক্তিযোদ্ধার ওপর হামলার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। আবার পছন্দ মতো নির্বাচন কর্মকর্তা নিয়োগ না দেওয়ায় উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে মারধর, চাচাকে চেয়ারম্যান পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতানো, নামে-বেনামে বিভিন্ন প্রকল্পের নামে টিআর-কাবিখার টাকা লুটেরও অভিযোগ আছে দু'বারের এই এমপির বিরুদ্ধে। দলীয় নেতাকর্মীদের মামলায় জড়ানোতেও ঘুরেফিরে আসে এই এমপির নাম।

বাঁশখালীর বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এর আগে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদকারী মৌলভি সৈয়দের ভাই মুক্তিযোদ্ধা আলী আশরাফের মৃত্যুর পর এমপির নির্দেশে তাকে সম্মান না দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এটি নিয়ে ক্ষোভ দেখা দিলে তিনি 'বাঁশখালীতে কোনো মুক্তিযুদ্ধ হয়নি' বলে মন্তব্য করেন। এর প্রতিবাদে পরিবারের সদস্যরা স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে বাঁশখালীতে প্রতিবাদ সমাবেশ করলে সেখানে বাধা দেয় এমপির অনুসারীরা। এরপর মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ডের ব্যানারে চট্টগ্রাম মহানগর ও দক্ষিণ জেলার নেতারা ২০২০ সালের ২৪ আগস্ট চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করলে সেখানে পৌর মেয়র সেলিম, এমপির এপিএস তাজুল ইসলাম ও এপিএস মুস্তাফিজুর রহমান রাসেলের নেতৃত্বে হামলা হয়। এ ঘটনায় মামলা হলে এপিএস রাসেলসহ চারজনকে আটক করে পুলিশ। এর আগে পছন্দের ব্যক্তিকে নিয়োগ না দেওয়ায় ২০১৬ সালের ১ জুন উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে মারধর করেন তিনি।

২৫ বছর ধরে সভাপতি: বাঁশখালীতে ১৯৯৬ সালে উপজেলা আওয়ামী লীগের ৬৭ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়। প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা সুলতানুল কবির চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে সভাপতি হন বর্তমান সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী। এখনও সেই কমিটির সভাপতি হয়ে আছেন তিনি। ২৫ বছর ধরে কোনো কাউন্সিল হচ্ছে না।

দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান বলেন, 'এমপি মোস্তাফিজের নানা কর্মকাণ্ডে দল বিব্রত। বিষয়টি দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে একাধিকবার জানানো হয়েছে।'

মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'কেন্দ্র থেকে যখন নির্দেশনা আসবে, তখন ব্যবস্থা নেব আমরা।'

গত জানুয়ারিতে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরীর বিষয়ে বাঁশখালী পৌরসভার মেয়র ও পৌর আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ সেলিমুল হক চৌধুরী বলেন, 'এমপির লোকজন গত ১৮ জানুয়ারি আমার ওপর হামলা চালিয়েছে। সিরাজ, মিনার ও ইলিয়াছ এমপির লোক হিসেবে পরিচিত। ঘটনার পর থেকে এমপির অনুসারীরা আমাকে ভয়ভীতিও দেখাচ্ছে। এমপি বাঁশখালীতে একক রাজত্ব কায়েম করতে চান। সে কারণে আমাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে।'

গত ১৮ জানুয়ারি বাঁশখালী উপজেলা যুব মহিলা লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হীরা মনির বাসায় চায়ের দাওয়াতে যান মেয়র সেলিমুল হক চৌধুরী। সে বাসায় অতর্কিত ঢুকে কয়েকজন মিলে তাকে মারধর করে। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ও স্থানীয়রা গিয়ে তাকে উদ্ধার করেন। এর তিন দিন পর এ সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা জানান, ২০১৬ সালের ২৮ জানুয়ারি বাঁশখালীর পুঁইছড়ি মদিনাতুল উলুম মোহাম্মদিয়া মাদ্রাসায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে শামীম বিন সাঈদীর সঙ্গে একটি অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন এমপি মোস্তাফিজ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা জানান, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের আগে-পরে বাঁশখালীতে নজিরবিহীন নাশকতা হয়েছিল। এসব ঘটনায় ১১টি মামলা হলেও সব মামলার চার্জশিট (অভিযোগপত্র) থেকে জামায়াত-শিবিরের অনেক চিহ্নিত ক্যাডারকে বাদ দিয়ে দলীয় ও অঙ্গসংগঠনের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়। এমপির নির্দেশে এমনটি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।