বাঁশখালী। চট্টগ্রামের সর্বদক্ষিণের এই উপজেলার অবস্থান মহানগর থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে। ৩৯২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ উপজেলায় বাস করে পাঁচ লাখ মানুষ। তাদের সংসদ সদস্যের (এমপি) নাম মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী। ২০১৪ সালে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হয়ে এখন আছেন দ্বিতীয় মেয়াদে। তবে যখন থেকে তিনি এমপি হয়েছেন, তখন থেকেই সঙ্গী করেছেন 'বিতর্ক' নামের শব্দটিকে; পাশাপাশি নিজেকে সমৃদ্ধ করেছেন অর্থবিত্তে।

আগে একটি ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে চাকরি করতেন মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী। এমপি হওয়ার পর গত ৯ বছরে তার সম্পদ বেড়েছে ১৪ গুণ। শুধু নিজের নয়, অর্থবিত্তের জোয়ার নেমেছে তার পরিবারে। গৃহিণী স্ত্রী শাহীন আক্তার চৌধুরীর সম্পদ বেড়েছে চার গুণ।

এমপি হওয়ার আগে মোস্তাফিজের গাড়ি ছিল না। এখন তিনি ১ কোটি ২২ লাখ টাকা দামের প্রাডো জিপ ও ল্যান্ডক্রুজার স্টেশন ওয়াগন গাড়ির মালিক। তার স্ত্রীর নামে হয়েছে বাড়ি। গৃহিণী স্ত্রী কিনেছেন গাড়িও। সর্বশেষ আয়কর নথিতে শাহীন আক্তার তার সম্পদ দেখিয়েছেন প্রায় ৬৫ লাখ টাকা। কোনো পেশায় না থেকেও এক বছরে আয় দেখিয়েছেন তিনি ৬ লাখ ৮ হাজার টাকা। বিরোধপূর্ণ জায়গা দখল করতে এমপি তার স্ত্রীকে ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বাঁশখালী পৌরসভার প্রাণকেন্দ্রের ওই জায়গার বাজারমূল্য এক কোটি টাকার বেশি।

২০১৪ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরীর মোট সম্পদ ছিল ১১ লাখ ৬৬ হাজার ১৮৪ টাকার। আর সর্বশেষ ২০২১-২২ অর্থবছরে জমা দেওয়া আয়কর নথিতে এমপি মোস্তাফিজ তার সম্পদ দেখিয়েছেন ১ কোটি ৬৭ লাখ ২২ হাজার টাকার।

৯ বছর আগে মোস্তাফিজুর রহমান বার্ষিক আয় উল্লেখ করেন ২ লাখ ৭৪ হাজার ৬০০ টাকা। এবার তিনি আয় দেখিয়েছেন ৯ লাখ ৮৩ হাজার ৫৩৫ টাকা। ৯ বছরে তার আয় বেড়েছে তিন গুণ। সংসদ সদস্য হিসেবে বেতন-ভাতা ও প্রভাতী ইন্স্যুরেন্স থেকে আয় দেখিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া ব্যাংকে এখন তার ১৮ লাখ টাকা ঋণ আছে বলে উল্লেখ করেছেন।

হয়েছে গাড়ি, বেড়েছে বাড়ি: আগে একটিও ছিল না, এমপি হওয়ার পর মোস্তাফিজুর রহমান এখন ব্যবহার করেন ৩৭ লাখ টাকা মূল্যের টয়োটা ব্র্যান্ডের প্রাডো জিপ এবং ৮৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকা মূল্যের ল্যান্ডক্রুজার স্টেশন ওয়াগন। গাড়ির মূল্যের এ তথ্য তার আয়কর বিবরণীর। বাজারে দুটি মডেলের গাড়ির দামই প্রতিটি এক কোটি টাকার বেশি।

হলফনামার তথ্যমতে, আগে কোনো প্লট ছিল না এই এমপির। এখন তিনি রাজউকের একটি প্লটের মালিক। আয়কর নথিতে এটির দাম দেখিয়েছেন ১৬ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। এ ছাড়া প্রায় ২৮ শতাংশ অকৃষি জমির মালিক হয়েছেন তিনি। এর বাইরে তার নামে কৃষি জমি আছে ৪ একর। এটি পৈতৃক সূত্রে পেয়েছেন বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে এখন তার জমা আছে ১০ লাখ টাকা। নগদ টাকা আছে ৩৫ লাখ ৩০ হাজার। ৯ বছর আগে এই পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৭০ হাজার টাকা।

স্বজনের জমি দখলের অভিযোগ: চট্টগ্রামের রহমান নগরে নিকটাত্মীয়ের কয়েক কোটি টাকা দামের একটি জায়গা এমপি দখল করে রেখেছেন বলে অভিযোগ আছে। নাম প্রকাশ না করে এমপির কয়েকজন স্বজন জানান, ২০১৪ সালে এমপি হওয়ার পর রহমান নগরের ওই জমিটা দখলে নেন মোস্তাফিজুর রহমান। সেখানে আগে একটি ছোট ঘর ছিল। তিনি সেটি ভেঙে ফেলেন। তার সেই স্বজনরা এখন থাকছেন ঢাকায়।

এক স্বজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এমপির এখন অনেক প্রভাব। আমরা তাই আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছি। নিশ্চয় তিনি এর বিচার করবেন।
গৃহিণী স্ত্রীর সম্পদ :মোস্তাফিজুর রহমান সংসদ সদস্য হওয়ার পরে তার স্ত্রী শাহীন আক্তার চৌধুরীর সম্পদ বেড়ে যায় অস্বাভাবিক হারে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১২-১৩ অর্থবছরে তার মোট সম্পদ ছিল ১৭ লাখ ৮০ হাজার টাকার। কিন্তু ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে এসে তার সম্পদ বেড়ে হয় ৪৯ লাখ ৩০ হাজার টাকার। এই বছরই প্রথমবারের মতো নির্বাচন করেন মোস্তাফিজুর রহমান। তাই স্বামীর উপহার হিসেবে ৩০ লাখ টাকা পেয়েছেন বলে আয়কর নথিতে দেখিয়েছেন শাহীন আক্তার চৌধুরী। নিজের আয় ২ লাখ ৫৫ হাজার টাকা বলে উল্লেখ করেন।

২০২১-২২ অর্থবছরে শাহীন আক্তারের বার্ষিক আয় ৬ লাখ ৮ হাজার ৮৮ টাকা। এর মধ্যে বাড়িভাড়া থেকে ১ লাখ ১৩ হাজার টাকা আয় করেছেন বলে উল্লেখ করেছেন আয়কর নথিতে। আর 'অন্যান্য' আয় দেখিয়েছেন ৪ লাখ ৯৫ হাজার টাকা।

স্বামী এমপি নির্বাচিত হওয়ার আগে শাহীন আক্তার চৌধুরীর ছিল প্রায় চার শতাংশ জায়গার ওপর দুই তলা একটি ভবন। এখন সেই ভবনটি হয়েছে পাঁচতলা। এটির দাম আয়কর নথিতে উল্লেখ করেছেন ৪২ লাখ ১০ হাজার টাকা। এ ছাড়া ঢাকায় একটি ফ্ল্যাটের মালিকও হয়েছেন তিনি। ১ হাজার ৮৭২ বর্গফুটের ফ্ল্যাটটির দাম তিনি উল্লেখ করেছেন ৪৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। অবশ্য ব্যাংক থেকে ৬৪ লাখ টাকা গৃহঋণ নিয়েছেন বলে উল্লেখ করেছেন। স্বামী এমপি হওয়ার আগে কোনো গাড়ি ছিল না শাহীন আক্তারের। এখন তিনি সাড়ে ১৬ লাখ টাকার একটি গাড়ি ব্যবহার করেন।

কোটি টাকার বিরোধপূর্ণ জমি: ২০১৩ সালে ৯৫ লাখ টাকা মূল্যে ১৬ শতক জমি কিনতে বায়না করেন শাহীন আক্তার চৌধুরী। অংশীদার হিসেবে রাখেন যুবলীগ নেতা মোহাম্মদ মকসুদ (মাসুদ) ও আরিফ মঈনুদ্দিনকে। পিএবি সড়ক পূর্বে থাকা উত্তর জলদী মৌজার এই জমির বিএস দাগ নম্বর ৭৮৩৯। এই জমি নিয়ে কয়েক পক্ষের বিরোধ ছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শুরুতে এটি দখলে নেয় ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা। তাদের হটিয়ে পরে জায়গাটি দখলে নেন যুবলীগ নেতা মকসুদ। এ নিয়ে কয়েক দফা সংঘর্ষও হয়। পরে সেখানে অংশীদার হন শাহীন আক্তার। এক পর্যায়ে নিজের নামে থাকা অংশ বিক্রি করেন শাহীন। কিছুদিন আগে এক কোটি টাকার বেশি দামে মকসুদ বিক্রি করেন তার অংশ।

বেড়িবাঁধ প্রকল্পে অনিয়ম: বাঁশখালী উপকূলে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে সাড়ে ছয় বছর আগে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার প্রকল্প নিয়েছিল পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। কিন্তু নিম্নমানের কাজের কারণে বেড়িবাঁধের একাংশ বিলীন হয়ে গেছে। কয়েক দফা সময় বাড়ানোর পরও প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি।
এ প্রকল্পে যে নিম্নমানের কাজ হচ্ছে তা প্রমাণ হয়েছে বুয়েটের পরীক্ষাগারেও। ২০২০ সালে বেড়িবাঁধে ব্যবহার করা ব্লকের গুণগত মান দৈবচয়ন পদ্ধতিতে যাচাই করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। ১১ হাজার ৩৬০টি ব্লকের নমুনা নেয় তারা। সেখানে ৩ হাজার ৭৮৭টি ব্লক পাওয়া যায়, যা অত্যন্ত নিম্নমানের। পরে সেগুলো বাতিল করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। এ অনিয়ম এমপির সংশ্নিষ্টতায় হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

টিআর কাবিখা প্রকল্পে হরিলুট: বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স মসজিদে সৌর প্যানেল স্থাপনের জন্য ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দুই টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু এ মসজিদে কোনো প্যানেলই স্থাপন করা হয়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক চিকিৎসক সমকালকে বলেন, 'হাসপাতালের মসজিদে কোনো সৌর প্যানেলই স্থাপন করা হয়নি।'

একই অর্থবছরে পশ্চিম ইলশা শেখ রাসেল স্মৃতি সংসদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের জন্য এক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ নামে কোনো সংগঠনের অস্তিত্ব নেই ওই এলাকায়। কাথারিয়া হালিয়াপাড়া দুর্গা মন্দিরের নামে সৌর প্যানেলের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৩৬ হাজার টাকা। অথচ সেখানে কোনো দুর্গা মন্দিরের অস্তিত্ব নেই। শুধু এ তিনটি প্রকল্প নয়, টিআর-কাবিখার প্রকল্পের নামে বাঁশখালীতে সরকারি বরাদ্দ এভাবে হরিলুট হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন উপজেলা আওয়ামী লীগেরই শীর্ষ স্থানীয় নেতারা।

যা বললেন এমপি মোস্তাফিজ: অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী সমকালকে বলেন, '৯ বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ করেছি। এতে নির্বাচনী এলাকায় আমার জনপ্রিয়তা বেড়েছে। এ জন্য অনেকে ঈর্ষান্বিত।'

মাত্র ৯ বছরে সম্পদ ১৪ গুণ বৃদ্ধির কথা অস্বীকার করেন এই এমপি। তার ভাষ্য, 'এমপি হওয়ার পরে আমি আরও ফকির হয়েছি। আমার কোনো সম্পদ বাড়েনি। ২৮ বছর আগে নাসিরাবাদে একটি বাড়ি করেছিলাম। এখনও সেটিই সম্বল। গ্রামেও নিজের পৈতৃক বাড়িটি দালান করতে পারিনি।'

রাজউকে প্লট, ল্যান্ডক্রুজার গাড়ি, প্রাডো জিপ এবং স্ত্রীর নামে ঢাকায় ফ্ল্যাট প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী বলেন, 'আপনি কোন ধরনের সাংবাদিক? আমার আয়কর নথি আপনি পেলেন কোথায়? এগুলো আপনাদের কে দেয়?'- বলেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন তিনি। অভিযোগের বিষয়ে তার স্ত্রীর মন্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।