অনৈতিক সম্পর্কে জড়িত- এ সন্দেহে স্ত্রী তানজিনাকে (২৫) বঁটি দিয়ে কুপিয়ে হত্যার পর লাশ ২১ টুকরা করে ঘরে থাকা ফ্রিজে রেখে দেয় রাসেল (২৯)। এরপর সুযোগ বুঝে প্রতিদিন রাতে বাড়ির পাশের ডোবায় এক এক করে লাশের টুকরা ফেলতে থাকে। এভাবে ফ্রিজে থাকা টুকরাগুলো ছয় দিন ধরে বাড়ির ছাদ থেকে ডোবায় ফেলা হয়। খণ্ডিত মাথা একটি পলিথিনে মুড়িয়ে ফেলা হয় শেষ দিন। এরপর বাড়িওয়ালাকে গিয়ে রাসেল জানায়, তার স্ত্রী করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে মারা গেছেন। পরে কিছু হাঁড়িপাতিল ও বিছানা নিয়ে গা-ঢাকা দেয় সে।

গত বছরের ২৯ মার্চ গভীর রাতে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার দেওভোগ এলাকার আদর্শনগরে মো. নোয়াবের বাড়ির তৃতীয় তলায় ঘটে ওই হত্যাকাণ্ড। ঘটনার প্রায় ১১ মাস পর গত মঙ্গলবার রাসেলকে গ্রেপ্তারের পর বেরিয়ে আসে তানজিনা হত্যার গা শিউরে ওঠা রহস্য। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) অভিযানে রাসেলকে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি হত্যায় ব্যবহৃত বঁটি ও লাশের টুকরা রাখার ফ্রিজটি জব্দ করা হয়।

রাসেলের দেখানো মতো বৃহস্পতিবার বিকেলে দেওভোগ আদর্শনগর এলাকার একটি ডোবা সেচে ১৯টি হাড় উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হাড়গুলো তানজিনার কিনা নিশ্চিত হতে ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে বলে জানিয়েছেন পিবিআই নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম।

এর আগে মঙ্গলবার রাতে রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার কুমুরগঞ্জ গ্রামের বাড়ি থেকে রাসেলকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। রাসেল ওই গ্রামের হাবিবুর রহমানের ছেলে। নিহত তানজিনা একই উপজেলার পাশের চিথলী গ্রামের আবদুল জলিলের মেয়ে।

বৃহস্পতিবার ১৯টি হাড় উদ্ধারের পর ঘটনাস্থলেই সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন পুলিশ কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, পাশের গ্রামের তানজিনার সঙ্গে রাসেলের পূর্বপরিচয় ছিল। ২০০৮ সালে এসএসসি এবং ২০১০ সালে এইচএসসি পাসের পর রাসেল জীবিকার তাগিদে প্রথমে ঢাকা এবং পরে নারায়ণগঞ্জে আসে। ফতুল্লার বিসিকে রনি নিট কম্পোজিটে রাসেল এবং পাশের ফারিহা গার্মেন্টে তানজিনা চাকরি করতেন। ওই সময় তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। রাসেল তানজিনাকে বিয়ে করার জন্য পারিবারিকভাবে প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়। পরে রাসেল পারিবারিকভাবে ২০১৯ সালে মোনালিসা নামে এক মেয়েকে বিয়ে করে। কিন্তু গ্রামের বাড়িতে রাসেলের বিয়ের খবর পেয়ে তানজিনা দ্রুত নারায়ণগঞ্জে চলে আসেন। ওই সময় তানজিনার সঙ্গে রাসেলের আবারও যোগাযোগ হয়। পরে তারা পরিবারের অগোচরে বিয়ে করে আদর্শনগর এলাকার মো. নোয়াবের বাড়ির তৃতীয় তলায় স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে বসবাস শুরু করে।

পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম বলেন, গ্রেপ্তারের পর রাসেল জানায়, বিয়ের পর তানজিনা বিভিন্ন পুরুষের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলত। এ নিয়ে তাদের মধ্যে দাম্পত্য কলহ দেখা দেয়। ঘটনার দিন গত বছরের ২৯ মার্চ রাতে রাসেল তানজিনাকে ফোনে কথা বলতে দেখে মারধর করে। এক পর্যায়ে রাসেল ঘরে থাকা বঁটি দিয়ে তানজিনার গলায় আঘাত করলে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে এবং জ্ঞান হারায়। পরে রাসেল বঁটি দিয়ে দেহ থেকে তানজিনার মাথা আলাদা করে। দুই হাত কেটে আট টুকরা এবং দুই পা কেটে আট টুকরা করে। ধড় থেকে কোমর পর্যন্ত অংশকে তিন-চার টুকরা করে।

এদিকে লাশের টুকরাগুলো ডোবায় ফেলার পর ঘর থেকে কিছু হাঁড়িপাতিল, হত্যায় ব্যবহৃত বঁটি ও তোশক-বালিশ নিয়ে রাসেল সোনারগাঁয়ের দাউদপুরের একটি মেসে গিয়ে ওঠে। সেখানে তিন দিন অবস্থান করে। তবে আদর্শনগরের বাসা ভাড়া ১০ হাজার টাকা বাকি রেখেই রাসেল চলে যায়। বাড়ির মালিক নোয়াব পরে রাসেলকে ফোন করলে সে ঘরের ফ্রিজ বিক্রি করে দিয়ে টাকা নিতে বলে। নোয়াব পাশের বাসার এক ভাড়াটিয়ার কাছে ফ্রিজটি ১৩ হাজার টাকায় বিক্রি করেন। বাকি তিন হাজার টাকা বিকাশের মাধ্যমে রাসেলের কাছে পাঠিয়ে দেন নোয়াব।

এদিকে তানজিনার কোনো খোঁজ না পেয়ে তার ভাগ্নে পলাশ ফতুল্লা মডেল থানায় একটি নিখোঁজের জিডি করেন। জিডির তদন্ত করতে থানা থেকে রাসেলকে ফোন করা হলে সে সোনারগাঁয়ের মেসে আসবাবপত্র রেখেই সাভারে প্রথম স্ত্রী মোনালিসার বড় বোন আশার কাছে চলে যায়। এরপর সেখানেই বসবাস শুরু করে। তবে সম্প্রতি গ্রামের বাড়ি রংপুরে গেলে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।

পিবিআই সূত্র আরও জানায়, গ্রেপ্তার এড়াতে রাসেল ২৫টি মোবাইল ফোন এবং ১৫টি সিম পরিবর্তন করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে তানজিনাকে হত্যার কথা স্বীকার করেছে বলে পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম জানান।