'আমরা এক দিনে ১৬ হাজার টাকার বই বিক্রি করেছি। দিনটি আমাদের আনন্দে গিয়েছে। ভালো বই মানুষ এখনও পড়ে। তবে করোনার কারণে প্রথমে একটু মন্দা থাকলেও দিন বাড়ার সঙ্গে তা জমে উঠেছে। হয়তো শেষ সপ্তাহে চিত্র বদলে যাবে।' শোভা প্রকাশনীর বই বিক্রেতা আরফান উদ্দিন এভাবেই তার প্রতিক্রিয়া জানালেন।

চট্টগ্রাম নগরীর কাজীর দেউড়ির পশ্চিম দিকে এম এ আজিজ স্টেডিয়ামের জিমনেশিয়াম মাঠ। গত ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে এখানে শুরু হয়েছে অমর একুশে বইমেলা। প্রকাশকদের সূত্রে জানা গেছে, প্রথম চার দিনে প্রায় অর্ধকোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছে।

আরফান উদ্দিন জানান, চট্টগ্রামের বইমেলাকে ঘিরে ঢাকার অনেক প্রকাশনী প্রতিষ্ঠানের লোকজন আবাসিক হোটেলে রাতযাপন করছেন। মেলা শেষ হলে আবার রাজধানীতে ফিরে যাবেন। এই মেলাকে ঘিরে তাদের রয়েছে অনেক আগ্রহ। শুধু ভালো বই বিক্রির জন্য এক বুক আশা নিয়ে চট্টগ্রামে এসেছে তাদের মতো অনেক প্রতিষ্ঠান।

তবে এবারের বইমেলার চিত্রটা কেমন? জানতে মেলার ভেতরে ঢুকেই দেখা গেল তরুণ পাঠকদের ভিড়। প্রকাশকরা জানিয়েছেন, মহামারির কারণে লোকজনের চলাচল সীমিত থাকায় কিছুটা প্রভাব পড়েছে বিক্রিতে। গত ২১ ফেব্রুয়ারি ভালো বই বিক্রি হয়েছে। ছুটির দিনেও জমে উঠতে দেখা গেছে বইমেলা প্রাঙ্গণ।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, সিটি করপোরেশন আয়োজিত এবারের বইমেলায় ১২০টি স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রকাশনী প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৯৫টি। চট্টগ্রামের বাইরেও ঢাকা ও সিলেটের বেশ কিছু পুস্তক প্রকাশনী এবারের বইমেলায় অংশ নিচ্ছে। ধীরে ধীরে জমে উঠবে প্রাণের বইমেলা- এমনটা আশাবাদ তাদের।

জানতে চাইলে অমর একুশে বইমেলা চট্টগ্রাম-২০২২-এর আহ্বায়ক ড. নিছার উদ্দিন আহমেদ মঞ্জু বলেন, 'এবারের আয়োজনে থাকছে বঙ্গবন্ধু কর্নার, লেখক আড্ডা, ওয়াইফাই জোন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ অনেক কিছু। করোনা সংকটের ভেতরও আমরা চেষ্টা করেছি নগরবাসীকে সৃজনশীল জ্ঞানের সঙ্গে বন্ধন ঘটাতে। প্রথম চারদিনে প্রায় অর্ধকোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছে- এটা ঠিক।'

গল্প-উপন্যাসের ছড়াছড়ি: চট্টগ্রামের অমর একুশে বইমেলায় এবার গল্প-উপন্যাসের প্রচুর নতুন বই চোখে পড়েছে। তবে বিক্রির তালিকায় এসব বই খুব একটা বেশি দেখা যায়নি। কিছু নতুন লেখকের বই এবার সমাদৃত হচ্ছে পাঠকমহলে।

অক্ষরবৃত্ত প্রকাশনীর স্টলে গিয়ে চোখে পড়েছে জয়নুল টিটের লেখা 'বিউটিবোনে লাল পিঁপড়া'। স্টলের পাশেই পাওয়া গেল লেখককে। এই সময় দু'জন পাঠককে অটোগ্রাফ দিতে দিতে তিনি বলেন, 'মানুষ এখন ভারী লেখা পছন্দ করেন না। যান্ত্রিক সময় আর অস্থিরতার কারণে জীবন-বাস্তবতার গল্প চায় তারা। সেই ধরনের কিছু লেখা সাহিত্যরসে তুলে এনেছি আমার বইয়ে।'

এই স্টল থেকে আরও বিক্রির তালিকায় রয়েছে 'হ্যালো পুলিশ স্টেশন' বইটি। সামাজিক নানা অপরাধের চিত্র আর সচেতনতামূলক বার্তা নিয়ে বইটি লিখেছেন মোহাম্মদ মহসিন। যিনি একসময় চট্টগ্রাম নগর পুলিশে ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রথমার স্টলে গিয়ে দেখা গেল বাংলা একাডেমির পদকপ্রাপ্ত কবি ও সাহিত্যিক বিশ্বজিৎ চৌধুরীর লেখা 'খুন ও আদর্শ কুসুম' বইটি পাঠকের পছন্দের তালিকায় রয়েছে।

তাম্রলিপি প্রকাশনীর স্টলে আয়মান সাদিকের 'নেভার স্টপ লার্নিং' বইটি কেনার সময় রূপা মাহমুদ নামে একজন পাঠকের সঙ্গে কথা হয়। তিনি খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছিলেন বইটি। তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'মোটিভেশনাল বইগুলো আমার খুব পছন্দ। তরুণরাও এগুলো খুব পড়ে এখন। আর এই ধরনের বই চলেও বেশি।'

এই প্রকাশনীর বিক্রেতা সাহল আবদুল্লাহ বলেন, 'মোটিভেশনাল বা তরুণদের উৎসাহিত করার অন্তত ২০০ বই রয়েছে বিভিন্ন স্টলে। এসব বই গল্প-উপন্যাসের চেয়ে কিন্তু কম বিক্রি হয় না!'

বাতিঘর থেকে প্রকাশিত একাধিক বইয়ের দিকে এবারও নজর পাঠকদের। হরিশংকর জলদাসের 'জলপুত্র' বইটি এখনও বিক্রির শীর্ষে রয়েছে।

বই মেলাকে ঘিরে তরুণ লেখকদের উচ্ছ্বাসের কমতি নেই। শুধু ৪০টি স্টল ঘুরেই জানা গেল, এবার চট্টগ্রামের বইমেলায় অন্তত সাড়ে ৩০০ নতুন লেখকের বই এনেছে তারা। প্রতিটি প্রকাশনী থেকে গড়ে ১০-২০ জন করে নতুন লেখকের বই প্রকাশিত হয়েছে। যারা প্রথমবার বইমেলায় লেখকের খাতায় নাম লিখিয়েছেন। চন্দ্রবিন্দু স্টলে পাওয়া গেল চট্টগ্রামের তরুণ লেখক তানভীর পিয়ালকে। তিনি 'লিখেছেন সিনেমা দেখার চোখ' বইটি। বলেন, 'আমি ভীষণ উচ্ছ্বসিত। যারা সিনেমা ভালোবাসে তাদের জন্য বইটি। বইটিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখি।'

ঢাকার বিখ্যাত তরুণ লেখক সাদাত হোসাইনের 'প্রিয়তম অসুখ সে' বইটিও বেশ সাড়া ফেলেছে পাঠকদের ভেতর। মেলায় ছোটদের বইয়েরও পাঠকও কম নয়। যদিও তারা নন, তাদের অভিভাবকরাই আসছেন বই কিনতে! যার ভেতর রয়েছে : ভূতের রাজ্যে সাতদিন, ঈশপের গল্প, শিবা, মোটু-পাতলু, ঠাকুরমারঝুলি আর কতো কী! তবে অনেকখানি কমে গেছে শিক্ষণীয় মীনা কার্টুনের গল্পের বই।

বইয়ের সঙ্গে গাছ উপহার: বিদ্যানন্দ প্রকাশনীর স্টলে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে একটি বইয়ের সঙ্গে একটি গাছ উপহার হিসেবে দিচ্ছেন স্টল কর্তৃপক্ষ। স্টলের দায়িত্বে থাকা মিজানুর রহমানের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, সামাজিক বনায়ন, সবুজ বাংলাদেশ আর সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্য থেকেই এই ধরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলজ-বনজ সব ধরণের গাছই উপহার হিসেবে দিচ্ছি আমরা। একজন পাঠক যতগুলো বই কিনবেন, ততগুলো গাছ উপহার হিসেবে পাবেন বলে জানান তিনি।

এই স্টলে বই কিনতে আসা গৃহিণী মরিয়ম নূর বলেন, চমৎকার উদ্যোগ। সব প্রকাশনীর উচিত এমন উদ্যোগ নেওয়া। আমার শিশু সন্তান এই আয়োজনে খুব খুশি হয়েছে।

মেলায় সিআরবি রক্ষার জন্য আলাদা স্টলও ঠাঁই পেয়েছে। সেখানে সব বয়সী মানুষদের ভিড় করতে দেখা যায়।

সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান:বই মেলার দক্ষিণ পাশে প্রতিদিনই সন্ধ্যায় আয়োজিত হচ্ছে লোকগান, কবিতা আর নৃত্য। আসছেন দেশের প্রখ্যাত-কবি সাহিত্যিকরা। দর্শকরাও উপভোগ করছেন অনুষ্ঠান। কেউ কেউ মেলা ঘুরে দেখছেন। আবার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও উপভোগ করছেন অনেকে।

২৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় কথা হয় লেখক আনিসুল হকের সঙ্গে। তিনি সমকালকে বলেন, চমৎকার আয়োজন। চট্টগ্রামে এই ধরণের উদ্যোগ অনেকখানি প্রমাণ করে মানুষ এখনও বইমেলাকে কতো ভালোবাসে। আগামী ১০ মার্চ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে চট্টগ্রামের এই অমর একুশে বইমেলা। তৃতীয়বারের মতো আয়োজন করা হয়েছে এই মেলার।