সাধারণ প্যাডেলচালিত রিকশার গ্যারেজ, সিএনজি অটোরিকশার গ্যারেজ, বিভিন্ন ধরনের ওয়ার্কশপ, আলমারিসহ স্টিলের ফার্নিচার তৈরির দোকানগুলোয় এক টুকরো রেলবিট থাকেই। লোহা ও স্টিলকে বাঁকানোর কাজে রেলবিট ব্যবহার করা হয়। এর দৈর্ঘ্য সাধারণত এক ফুট থেকে সাত ফুট পর্যন্ত হয়ে থাকে। কিন্তু আইনানুগভাবে রেলবিট ব্যবহার ও সংরক্ষণের সুযোগ নেই। আর সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে 'টাকা আয়ের মওকা' বানিয়ে নিয়েছেন রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর একজন ইন্সপেক্টর। তার নাম মো. সালামত উল্লাহ। আরএনবি চট্টগ্রামের (জেনারেল) নিরাপত্তা চৌকির অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন।

আরএনবি চট্টগ্রামের (জেনারেল) নিরাপত্তা চৌকির ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগে চট্টগ্রামের কালুরঘাট, বহদ্দারহাট, মরাদপুর, মোগলটুলী, কদমতলী, আগ্রাবাদ, বড়পোল, বায়েজিদ, পাহাড়তলী, অলঙ্কার, সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাট, মিরসরাইয়ের চিনকি আস্তানা পর্যন্ত রেলের অবৈধ সম্পদ খোঁজার নামে রেলবিট খোঁজেন সালামাত উল্লাহ। এ নিয়ে ভুক্তভোগী চট্টগ্রাম নগরীর আগ্রাবাদ এলাকার লিটন মিয়া নামে এক ব্যক্তি রেলপথমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজনের কাছে লিখিত অভিযোগও করেছেন। এতে তার বিরুদ্ধে বিভিন্নভাবে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ করা হয়।

নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে আরএনবি সংশ্নিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে রেলবিট অকশনে দেওয়া হয়। অকশনে পাওয়া সেই রেলবিট তৃতীয়পক্ষের কাছে বিক্রি কিংবা হস্তান্তরের সুযোগ নেই। আবার সেই রেলবিটকে ৯০ দিনের মধ্যে গলিয়ে রূপ পরিবর্তন করে ফেলার বাধ্যবাধকতা থাকে। কিন্তু বিভিন্ন গ্যারেজ ও ওয়ার্কশপগুলো নানাভাবে এক টুকরো রেলবিট সংগ্রহ করে তাদের কাজ চালায়। এই ধরনের রেলবিট পাওয়া গেলে পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনায় হয়তো আইনগত ব্যবস্থা নিতে হয়, নতুবা এড়িয়ে যেতে হয়। ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে রেলওয়ে সম্পত্তি (অবৈধ দখল উদ্ধার) আইন- ২০১৬ এর ৪, ৫ ও ১০ নম্বর ধারায় মামলা করা হয়। তবে রেলবিট পাওয়া গেলে সমন জারি করার পর তা আবার প্রত্যাহারের সুযোগ নেই। নিষ্পত্তির জন্য এটা আদালতের এখতিয়ারে চলে যায়। তবে কোনো কোনো অসাধু কর্মকর্তা এই আইনের অপব্যবহার করে 'ধান্দা' করছেন। ছোটখাটো গ্যারেজ ও ওয়ার্কশপ মালিককে ভয় দেখিয়ে সুবিধা আদায়ের বিষয়টি দুঃখজনক।

নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে স্টিলের আলমারি তৈরির একাধিক প্রতিষ্ঠানের মালিকরা জানান, একটি কার নিয়ে প্রায় সময় ঘুরে বেড়ান সালামত। সালাম দিয়ে প্রতিষ্ঠানে ঢুকে কেবলই রেলবিটের সন্ধান করেন। এরপর এক টুকরো পেলেই কাজ শেষ! টাকা ছাড়া আর রেহাই নেই। টাকা না দিলে সমন, মামলার ভয় দেখান তিনি।

রেলপথমন্ত্রীর কাছে অভিযোগ করা লিটন মিয়া চট্টগ্রাম নগরীর আগ্রাবাদ কমার্স কলেজ রোডের রেহেনা মেটালের মালিক। গত ৮ জানুয়ারি তাকে একটি সমন জারি করেন সালামত উল্লাহ। তাতে রেলওয়ে সম্পত্তি (অবৈধ দখল উদ্ধার) আইন- ২০১৬ এর ৪ ও ৫ নম্বর ধারায় অভিযোগ আনা হয়। অভিযোগে বলা হয়, সরেজমিন তদন্তে রেহেনা মেটালে 'বিপুল পরিমাণ অবৈধ রেলবিট (রেলওয়ে সম্পদ)' ব্যবহার করা হচ্ছে বলে সত্যতা পাওয়া গেছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে লিটন মিয়াকে ১০ জানুয়ারি আরএনবির চট্টগ্রাম চৌকিতে যোগাযোগের জন্য বলা হয়। অন্যথায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। পরবর্তীতে গত ১৫ জানুয়ারি রেহেনা মেটালের প্যাডে লিটন মিয়া সমনের জবাব দেন। তাতে বলা হয়, হোসেন স্টিল নামে একটি প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি একটি ভ্যান মেশিন (ভাঁজ মেশিন) ক্রয় করেন। সেই মেশিনের সঙ্গে ছয় ফুটের দুই টুকরো রেলবিট দেয় ওই প্রতিষ্ঠান। এতে কোনো দায়ভার থাকলে তা হোসেন স্টিলের। অভিযোগ রয়েছে, 'বোধগম্য লেনদেনের' মাধ্যমে লিটন মিয়াকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেন ওসি সালামত। পরবর্তীতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি হোসেন স্টিলের বিরুদ্ধে। গত ১৩ জানুয়ারি চট্টগ্রাম নগরীর চান্দগাঁওয়ের বাহির সিগন্যাল এলাকায় মনিরিয়া মেটাল নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠানকে একই ধরনের একটি সমন জারি করেন তিনি। এতে একই ধরনের অভিযোগ আনা হয়। এভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে সরেজমিন বিপুল পরিমাণ রেলবিট থাকার সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করে সমন জারি করছেন তিনি। যদিও এসব সমন আবার নিজেই প্রত্যহার করে নিচ্ছেন আরএনবির এই কর্মকর্তা।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি মো. সালামত উল্লাহ সমন দেওয়া ও নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আইনের ব্যত্যয় হওয়ার বিষয়টি সমকালের কাছে স্বীকার করেন। তিনি বলেন, কারও কাছে রেলবিট পাওয়া গেলে আরএনবি সমন দিতে পারে। আবার রেলবিট থাকার স্বপক্ষে কাগজপত্র দেখাতে পারলে সমন প্রত্যাহারও করা যায়। আমিও তাই করেছি। তবে দু-একটি ক্ষেত্রে হয়তো ভুল হয়েছে। ছোটখাটো গ্যারেজ কিংবা ওয়ার্কশপ কী করে আন্তর্জাতিকভাবে অকশনে দেওয়া রেলবিটের কাগজপত্র দেখাতে পারে জানতে চাইলে উত্তর দিতে পারেননি আরএনবির এই কর্মকর্তা। তিনি অর্থ লেনদেনের মাধ্যমের সমন প্রত্যাহারের বিষয়টি অস্বীকার করেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আরএনবি চট্টগ্রামের কমান্ডেন্ট শফিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, সমন দেওয়ার সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধিতে এই প্রক্রিয়ার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। আরএনবি ইন্সপেক্টরও সমন জারি করতে পারেন। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থাও নিতে পারেন। আবার তথ্য-প্রমাণ পাওয়া না গেলে অব্যাহতিও দিতে পারেন। আদালতের মাধ্যমেও বিষয়টি নিষ্পত্তি করা যায়। তবে ইন্সপেক্টর সালামত উল্লাহ বিরুদ্ধে এই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করার যে অভিযোগ উঠেছে তা অবশ্যই খতিয়ে দেখা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কমান্ডেন্ট অফিসকে না জানিয়ে তিনি যাতে আর কোনো সমন জারি করতে না পারেন, সেই বিষয়টিও নিশ্চিত করা হবে।


বিষয় : রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী সালামতের 'সালামে' মেলে টাকা

মন্তব্য করুন