ময়মনসিংহে মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে চৌদ্দ দিনের ব্যবধানে দুই রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। একজন চারতলার ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে মারা যান এবং অন্যজনের মরদেহ ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। মাদকের আসক্তি থেকে মুক্ত হয়ে সুস্থভাবে ফেরার জন্য সেখানে পাঠানো হলেও লাশ হয়ে পরিবারে ফেরত গেছেন তারা। এসব মৃত্যুর ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে নিরাময় কেন্দ্রগুলোর ব্যবস্থাপনা নিয়ে।

গত সোমবার নগরীর সানকিপাড়া ক্যান্টনমেন্ট মোড় এলাকায় কাজল টাওয়ারের দ্বিতীয় তলায় প্রাপ্তি মাদকাসক্ত পুনর্বাসন কেন্দ্র থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় যুবক অমিত দেবনাথের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। বিষয়টি দিনভর গোপন করা হলেও রাতে পুলিশের মাধ্যমে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা খবর পান। 

অন্যদিকে ২ মার্চ নগরীর ব্রা‏হ্মপল্লির শপথ মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রের ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে একজনের মৃত্যু হয়। বিষয়টি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর জানতেই পারেনি। এর মধ্যে শপথ কেন্দ্রটি এখনও অনুমোদন পায়নি। 

এদিকে মঙ্গলাবার রাত ৯টার দিকে অভিযান চালিয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শপথ কেন্দ্রটি সিলগালা এবং রোগীদের অন্য স্থানে সরানোর ব্যবস্থা করেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলায় অনুমোদিত মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে ১৭টি। অনুমোদনের জন্য আবেদন করে কার্যক্রম পরিচালনা করছে আরও তিনটি প্রতিষ্ঠান। এসব কেন্দ্র তদারকি করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। নগরীর বিভিন্ন বাসা ভাড়া নিয়ে গড়ে উঠেছে এসব নিরাময় কেন্দ্র। তবে সাম্প্রতিক ঘটনা সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। এর আগেও প্রাপ্তি কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে নগরীর কাঁচিঝুলি এলাকার অভি নামের এক যুবক ত্রিশাল বাসস্ট্যান্ড এলাকায় খুন হন। কেন্দ্রগুলোতে সঠিক কাউন্সেলিং, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবল না থাকা এবং রোগীদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। বেশিরভাগ কেন্দ্রই চলছে দায়সারাভাবে।

মঙ্গলবার সরেজমিন জানা যায়, ১৭ বেডের অনুমোদন থাকলেও প্রাপ্তি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে রোগী রয়েছেন ১২ জন। গত সোমবার সকালে কেন্দ্রটি থেকে এক রোগীর মরদেহ উদ্ধার করার পর এর চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান আত্মগোপনে চলে যান।

নিহত অমিতের বাড়ি জেলার গফরগাঁও উপজেলা সদরে। বাজারের প্রাচীন কাপড় ব্যবসায়ী চিত্তরঞ্জন দেবনাথের দুই মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে ছোট অমিত। অমিতের স্বজনরা জানান, গত বছরের ২২ নভেম্বর প্রতিষ্ঠানটিতে তৃতীয়বারের মতো ভর্তি হয়েছিল অমিত। একমাত্র ছেলে হারিয়ে বাবার মতো বাকরুদ্ধ মা অমিতা দেবনাথও। 

তিনি জানান, ছেলেকে ভালো হওয়ার জন্য পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু কীভাবে কী হয়ে গেল। অমিতের খালু অখিল দেবনাথের সঙ্গে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে কথা হয়। তিনি বলেন, ভালোর জন্য রেখে হয়েছে খারাপ। ভেতরে সঠিক তদারকি নেই।

শপথ মাদক নিরাময় কেন্দ্রে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার এক রোগীকে ভর্তি করা হয়। পরিবারের অনুরোধ থাকায় নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। ইয়াবার প্রতি আসক্ত ওই যুবককে কেন্দ্রটিতে ভর্তির তৃতীয় দিনের মাথায় লাশ হন। চার তলার ছাদ থেকে লাফ দিয়ে পাশের একটি বাড়িতে পড়েন।

মঙ্গলবার শপথ মাদক নিরাময় কেন্দ্রে গিয়ে কথা হয় প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসেন স্বপনের সঙ্গে। সার্বক্ষণিক এক চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও কোনো চিকিৎসক পাওয়া যায়নি সে সময়। তিনি জানান, মাস তিনেক হলো কেন্দ্র শুরু করেছেন। অনুমোদনের জন্য সব কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। সবাই যখন নামাজে ব্যস্ত ছিল, তখন রোগী তালা ভেঙে ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে।

‘জনউদ্যোগ’ ময়মনসিংহের আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম চুন্নু বলেন, এসব অনিয়ম। এর দায় সংশ্লিষ্টরা এড়াতে পারে না।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মানসিক রোগ বিভাগের প্রধান কাউসার আহমেদ বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনায় কোনো ত্রুটি ছিল কিনা তদন্তে বেরিয়ে আসবে। সঠিকভাবে মনিটর করলে এমন মৃত্যু এড়ানো যেত।

কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ শাহ কামাল আকন্দ বলেন, দুটি ঘটনায় পৃথক অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। ঘটনাগুলোতে কর্তৃপক্ষের তদারকির অভাব আছে কিনা তদন্ত চলছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ময়মনসিংহের উপপরিচালক মোহাম্মদ খোরশিদ আলম বলেন, এটি হত্যা, না আত্মহত্যা তা ময়নাতদন্তের পর বলা যাবে। যে প্রতিষ্ঠানগুলো অনুমোদিত, সেগুলো সঠিকভাবে যেন চলে, তার জন্য কঠোর মনিটরিংয়ের আওতায় রাখা হয়েছে।