জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে ঐতিহ্যবাহী গোপীনাথপুর দোল পূর্ণিমার মেলায় জমে উঠেছে ঘোড়ার হাট। বিজলি, কিরণমালা, রানী, সুইটি, ভারতীয় তাজীসহ আরও অনেক বাহারি নামের ঘোড়া পাওয়া যাচ্ছে এই হাটে। মেলায় ঘোড়া দেখতে ভিড় করছেন নানা বয়সের মানুষ।

গত বৃহস্পতিবার দোল পূর্ণিমার পর থেকে মেলায় অবস্থান নিয়েছেন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ঘোড়া ব্যবসায়ীরা। ময়মনসিংহ, জামালপুর, টাঙ্গাইল, বগুড়া, দিনাজপুর, রংপুর, গাইবান্ধা, পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঘোড়া ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য এসেছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা। ঘোড়া ছাড়াও মহিষ, গরু, ভেড়া ও ছাগল কেনাবেচা হয় এ মেলায়। ক্রেতা-বিক্রেতা ও দর্শনার্থীদের পদচারণায় এখন মুখরিত ঐতিহ্যবাহী গোপীনাথপুর মেলার ঘোড়ার হাট। দরদাম ঠিকঠাকের পর একটি খেলার মাঠে ঘোড়া নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ক্রেতাকে দেখানো হয় ঘোড়ার দৌড়। সেখান থেকে ক্রেতারা চলার গতি দেখে পছন্দ করে কেনেন ঘোড়া।

আয়োজকরা জানান, সারা বাংলাদেশের মধ্যে একমাত্র ঘোড়া বেচাকেনার হাট এই গোপিনাথপুর দোলের মেলা। প্রতি বছর দোল পূর্ণিমা উপলক্ষে মাসব্যাপী চলে এ মেলা। সবকিছু মিলে এ মেলা এক মাস চললেও পশুর মেলা হয় প্রথম ১০দিন।

দোল পূর্ণিমা মেলা কমিটি আয়োজকরা জানান, ৫১৩ বছরের পুরনো এ মেলা শুরু থেকেই ঘোড়া ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য ছিল প্রসিদ্ধ। স্বাধীনতার পরও মেলায় নেপাল, ভুটান, ভারত, পাকিস্তানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে উন্নত জাতের ঘোড়া আসত । এখনও এসব দেশ থেকে বিভিন্ন অঞ্চলের ঘোড় সওয়ারি ও ঘোড়া মালিকরা এ মেলায় ঘোড়া নিয়ে আসেন। এই মেলাকে কেন্দ্র করে আশেপাশের গ্রামে গ্রামে চলে উৎসবের আমেজ। তবে করোনা ভাইরাস আতঙ্কের কারণে এবার মেলায় বিনোদনমুলক অনুষ্ঠান  বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন।

রংপুরের পিরগঞ্জ উপজেলার চডরা গ্রামের আব্দুল গোফ্ফার ঘোড়া কিনতে এসেছেন এ মেলায়। তিনি জানান, একটি ঘোড়া পছন্দ হয়েছে। বিক্রেতা দাম হাঁকিয়েছেন দুই লাখ ৫৫ হাজার টাকা। আরও ২/১টি দেখার পর তিনি কোনটি কিনবেন সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন বলেও জানান তিনি।

নওগাঁর আত্রাই উপজেলার মধুগোড়নই গ্রামের শামিম হোসেন জানান, ২৫ বছর ধরে ঘোড়া নিয়ে তিনি এ মেলায় আসেন। এবারও তিনটি ঘোড়া এনেছেন। সব মিলিয়ে এক লাখ ৯৫ হাজার টাকায় ঘোড়াগুলি বিক্রি করেছেন।  তবে ক্রয়-বিক্রয়ের ছাপ (টোল আদায়ের রশিদ) বাহির হবে আগামী মঙ্গলবার। তার আগ পর্যন্ত মেলায় অবস্থান করতে হবে তাদের।  

এবার মেলায় সর্বোচ্চ দাম হাকা হয়েছে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা দামের একটি ঘোড়ার। এই ঘোড়ার মালিক মজিবুর রহমান ঘোড়াটির বয়স সাড়ে চার বছর। এটি ভারতীয় তাজী ঘোড়া। দ্রুত দৌড়াতে পারে। লাল-সাদা ডোরাকাটা ঘোড়াটির যত্ন নিতেন তিনি নিজেই।

ঘোড় সওয়ারি ও ক্রেতা-বিক্রেতারা জানান,তাদের বাপ-দাদারাও এ মেলায় ঘোড়া কেনাবেচা করতেন। পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রাখতে তারাও ঘোড়া কেনাবেচা করছেন। আগে ঘোড়ার হাট ও ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে ঘোরদৌড়ের বিস্তীর্ণ মাঠ থাকলেও বর্তমানে সে স্থানটি সংকুচিত করা হয়েছে। ঘোড়া বেচাকেনায় এখন কিছুটা সমস্যাও হচ্ছে।

গোপীনাথপুর মেলা কমিটির সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান জানান, ঘোড়ার মেলা হলেও গ্রামীণ মেলার সব আয়োজনই পাওয়া যাবে এখানে। এত বড় মেলা উত্তরবঙ্গের কোথাও নেই। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনও বিনোদনের একমাত্র উৎস সার্কাস ও যাত্রাপালার অনুমতি পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় পুরোহিত প্রনব কুমার চক্রবর্তী জানান, সম্প্রীতির বিরল দৃষ্টান্ত প্রায় ৫১৩ বছরের পুরনো এই গোপীনাথপুর মেলা।

আক্কেলপুর থানার ওসি সাইদুর রহমান জানান, মেলা উপলক্ষে বিপুল মানুষের সমাগম হয়েছে গোপিনাথপুরে। তাদের নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক পুলিশের পাশাপাশি আনসার মোতায়েন করা হয়েছে।