এরশাদ কবির চয়ন। ৭ মার্চ নাসায় প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দিয়েছেন নীলফামারীর এই তরুণ। নীলফামারী জেলা শহরের কলেজপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. খতিব উদ্দিন সরকারের ছেলে চয়ন। তথ্যবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী চয়ন যুক্তরাষ্ট্রের বিমান চালনা বিদ্যা ও মহাকাশ সম্পর্কিত এই গবেষণা সংস্থার আরলিংটন ভার্জিনিয়ায় তথ্য প্রকৗশলী বা ডাটা ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ শুরু করেছেন।

নীলফামারী থেকে বোস্টন: এরশাদ কবির চয়ন ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে তথ্য বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০০১ সালে সাত বছর বয়সে চয়ন মায়ের সঙ্গে নীলফামারী জেলা শহরের কলেজপাড়া এলাকা থেকে পাড়ি দেন আমেরিকায়। তারও আগে ডাইভারসিটি ভিসা বা ডিভি পেয়ে আমেরিকার পেনসিলভেনিয়ায় পাড়ি জমান তার বাবা মো. খতিব উদ্দিন। পরে তিনিই ছেলে চয়ন ও স্ত্রী অফিজা খাতুনকে নিয়ে যান আমেরিকায়। সেখানে নিয়ে পেনসিলভেনিয়ার বেনসালেম শহরের এক এলিমেন্টারি স্কুলে ভর্তি করান চয়নকে।

৬০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে দশম: শুরু থেকেই নিজের মেধার পরিচয় দেন চয়ন। স্কুল গ্র্যাজুয়েশনে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ৬০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে নিজের অবস্থান করে নেন দশম স্থানে। এরপর চয়ন আর্কেডিয়া ইউনিভার্সিটি ইন ফিলাডেলফিয়া থেকে ২০১৬ সালে বিজ্ঞানে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পড়াশোনার পাশাপাশি এডুকেয়ার নামে একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে এরিয়া ম্যানেজার হিসেবেও কাজ করেন চয়ন। পড়াশোনার মতো মেধার স্বাক্ষর রাখেন সেখানেও। কেননা চয়ন বিশ্বাস করেন, পরিশ্রম, মেধা আর সততাকে এক বিন্দুতে মেলাতে পারলে সফলতা আসবেই!

মেডিকেল থেকে ইঞ্জিনিয়ার: এরশাদের বাবা খতিব উদ্দিন সরকার বরাবরই ছেলেকে সাপোর্ট দিয়ে আসছেন। তার ভাষায়, 'ছোটবেলা থেকেই চয়ন অনেক মেধাবী। স্কুল গ্র্যাজুয়েশনের সময় স্কলারশিপে কম খরচে লেখাপড়া করেছে সে। তবে তার স্বপ্ন ছিল সে ইঞ্জিনিয়ার হবে। কিন্তু আমি তাকে মেডিকেলে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলাম। তাতে ভালো কিছু হয়নি। যদিও এক বছরের মতো সে মেডিকেলে ক্লাসও করেছে। এক বছর পর ভালো না লাগায় সে আর্কেডিয়া ইউনিভার্সিটি ইন ফিলাডেলফিয়া থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক এবং বোস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর করে। মানে সে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে পড়াশোনা শেষ করে। তারপর নাসার মতো এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ পায়। তার এই অর্জন নিশ্চয়ই অনেক গর্বের। আর আনন্দ লাগছে এই ভেবে যে, সে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবে।'

যেভাবে চাকরি পাওয়া যায় নাসায়: নাসায় যারা কাজ করে তাদের বেতন নির্ধারিত হয় আমেরিকার সরকারের বেতন রেখা অনুসারে। কারণ নাসা একটি সরকারি সংস্থা। প্রতি বছর আমেরিকা সরকারের অর্থ সাহায্যের দ্বারা পরিচালিত হয় এই সংস্থা। যারা নাসায় কাজ করেন তারা আমেরিকান সরকারের কর্মচারী এবং প্রত্যেকে আমেরিকান। তার মানে, নাসায় কাজ করতে গেলে আপনার থাকতে হবে আমেরিকার নাগরিকত্ব। বিদেশিরা সরাসরি নাসায় কাজ করতে পারে না। তাই বলে হাল ছাড়লে চলবে না। কারণ প্রতি বছর ইঞ্জিনিয়ার, টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্টসহ বিভিন্ন শূন্যপদে লোক নিয়োগ দেয় নাসা। এসব অস্থায়ী পদে আবেদন করতে পারেন আপনিও। তবে এসব পদে কাজের সুযোগ পেলে এই সময়ের মধ্যে আমেরিকার নাগরিকত্বের আবেদন করার সুযোগ পাওয়া যায়। এতে পরবর্তীতে স্থায়ীভাবে নাসায় কাজ করা যায়।


নাসায় চাকরির যোগ্যতা: নাসায় চাকরি করতে চাইলে সর্বনিম্ন যে যোগ্যতা প্রয়োজন তা হচ্ছে বিজ্ঞান শাখায় ডিগ্রি। বিজ্ঞান বিভাগের মধ্যে গণিত, ফিজিক্স, কেমেস্ট্রি ইত্যাদি বিভাগে গ্র্যাজুয়েশন করলেও আবেদন করা যাবে। এ ছাড়াও শূন্যপদ অনুযায়ী প্রতিটি বিভাগের যোগ্যতা ভিন্ন হয়। গ্র্যাজুয়েশনের পাশাপাশি কম পক্ষে ২ বছরের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়। প্রতিটি দেশেরই নিজস্ব সুরক্ষা ব্যবস্থা আছে। মহাকাশ গবেষণায় নথি বা ডাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, নাসার প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর কাছে তাই তারা তাদের গুপ্তচর কর্মচারী নিয়োগ করতে পারে এসব তথ্য সরানোর জন্য। বিশেষত এ কারণেই নাসায় বিদেশিরা সরাসরি বা স্থায়ী কাজ করতে পারেন না।

কে কেমন বেতন পেয়ে থাকেন: নাসার কর্মচারী ও ইঞ্জিনিয়ারদের বেতন কাঠামোর দিকে চোখ রাখলে তা কপালে ঠেকে! শুরুতে ইঞ্জিনিয়ারদের বেতনে চোখ রাখি- কন্ট্রোলস ইঞ্জিনিয়ার পান ৯৮ হাজার মার্কিন ডলার। ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ার ৯৯ হাজার, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ৯৫ হাজার, প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ার ৭৯ হাজার, প্রসেস ইঞ্জিনিয়ার ৮৯ হাজার ও ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার এবং সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়াররা ১ লাখ মার্কিন ডলার বেতন পেয়ে থাকেন। আর পরিচালনা বিভাগের সুরক্ষা ইঞ্জিনিয়ার ১ লাখ ৩৬ হাজার মার্কিন ডলার, প্রযুক্তিগত পরিচালক ১ লাখ ৩৯ হাজার, বিভাগীয় প্রধান ১ লাখ ৭৯ হাজার, উপ-পরিচালক ১ লাখ ৮১ হাজার, তথ্য বিশেষজ্ঞ ৮৬ হাজার ও চুক্তি বিশেষজ্ঞ ৮৩ হাজার মার্কিন ডলার বেতন পেয়ে থাকেন। সুযোগ আছে আপনারও। পাড়ি দিতে পারেন স্বপ্নের পথে।