রাজধানীর বনানীর ট্রাম্পস ক্লাবে রাতভর চলত অসামাজিক কার্যকলাপ। সেখানে আখড়া ছিল আন্ডারওয়ার্ল্ডের 'ডন' আজিজ মোহাম্মদ ভাই, শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনসহ অনেকের। এর পাশেই ছিল বনানী জামে মসজিদ। সেই মসজিদের কমিটির হয়ে ক্লাবটিতে অসামাজিক কাজ বন্ধে সরব হয়েছিলেন চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী।

এ নিয়ে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের সঙ্গে হাতাহাতিতেও জড়ান তিনি। এতে আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডনদের শত্রুতে পরিণত হন তিনি। 'উচিত শিক্ষা' দিতে শেষ পর্যন্ত তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

চাঞ্চল্যকর ওই হত্যাকাণ্ডের প্রায় দুই যুগ পর 'পলাতক' আসামি আশীষ রায় চৌধুরী ওরফে বোতল চৌধুরীকে গ্রেপ্তারের পর এসব তথ্য জানিয়েছে র‌্যাব। সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, আশীষ রায় চৌধুরী প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে এসব কারণ জানিয়েছেন।

গত মঙ্গলবার রাতে র‌্যাব সদস্যরা গুলশানের একটি বাড়ি ঘিরে ফেলেন। পরে ওই বাড়ির একটি ফ্ল্যাট থেকে গ্রেপ্তার করা হয় অন্যতম ওই আসামিকে।

বুধবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির কর্মকর্তারা জানান, ওই ফ্ল্যাট থেকে ২২ বোতল বিদেশি মদ, ১৪ বোতল সোডা ওয়াটার, একটি আইপ্যাড, বিভিন্ন ব্যাংকের ১৬টি ক্রেডিট কার্ড, দুটি আইফোন ও নগদ দুই লাখ টাকা জব্দ করা হয়েছে।

১৯৯৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাতে ট্রাম্পস ক্লাবের নিচে সোহেল চৌধুরীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় তার বড় ভাই তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরী বাদী হয়ে গুলশান থানায় মামলা করেছিলেন। ওই মামলার তদন্ত শেষে ১৯৯৯ সালের ৩০ জুলাই ডিবি পুলিশ ৯ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট জমা দেয়। চার্জশিটভুক্ত আসামিরা হলেন- আশীষ রায় চৌধুরী ওরফে বোতল চৌধুরী, আদনান সিদ্দিকী, ট্রাম্পস ক্লাবের মালিক আফাকুল ইসলাম ওরফে বান্টি ইসলাম, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই ওরফে আবদুল আজিজ, তারেক সাঈদ মামুন, সেলিম খান, হারুন অর রশীদ ওরফে লেদার লিটন ওরফে বস লিটন, ফারুক আব্বাসী ও সানজিদুল ইসলাম ইমন।

সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, আসামিদের অনুপস্থিতির কারণে আদালত গত ২৮ মার্চ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। এর পর থেকেই র‌্যাব ওই মামলার পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে গোয়েন্দা নজরদারি শুরু করে। অন্যতম পলাতক আসামি আশীষ রায় চৌধুরী কানাডায় পালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন- এমন তথ্য নিশ্চিত হয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তার আসামির দেওয়া তথ্য উদ্ধৃত করে র‌্যাব মুখপাত্র কমান্ডার আল মঈন বলেন, ১৯৯৬ সালে বনানীর আবেদীন টাওয়ারে আশীষ রায় চৌধুরী ও আসাদুল ইসলাম ওরফে বান্টি ইসলামের যৌথ মালিকানায় ট্রাম্পস ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয়। সেখানে সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত অসামাজিক কাজ হতো। ধীরে ধীরে ওই ক্লাবে আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন ও গ্যাং লিডারদের একটি বিশেষ আখড়ায় পরিণত হয়। সেখানে সবচেয়ে বেশি যাতায়াত ছিল আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের। আজিজ মোহাম্মদ ভাই মূলত ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের চক্রগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের মিটিং বা তাদের পরিচালনা করার জন্য সেই ক্লাবে নিয়মিত যাতায়াত করত এবং এটি ব্যবহার করত। এতে ক্লাব মালিক বান্টি ও আশীষের সঙ্গে সখ্য তৈরি হয়।

তিনি আরও বলেন, ট্রাম্পস ক্লাবের ঠিক পাশেই ছিল ওই সময়কার বনানীর সবচেয়ে বড় মসজিদ বা বনানী জামে মসজিদ। এর পাশে ক্লাবে অসামাজিক কাজ হওয়ায় চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী বনানী মসজিদের কমিটি নিয়ে বারবার ওই ক্লাবে এ ধরনের অশ্নীলতা বন্ধের চেষ্টা করেন। এতে ক্লাবের দুই মালিক ক্ষিপ্ত হন। অন্যদিকে আজিজ মোহাম্মদ ভাই যেহেতু এই ক্লাব ব্যবহার করেন, এতে তার স্বার্থেও আঘাত লাগে। আবার ইমনের মতো শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সেখানে যাতায়াত থাকায় ক্লাবটি বন্ধ হয়ে গেলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ত। এসব কারণে এই ব্যক্তিদের চক্ষুশূলে পরিণত হন সোহেল চৌধুরী। ক্লাব বন্ধের উদ্যোগ নেওয়ার জেরে ১৯৯৮ সালের ২৪ জুলাই আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের সঙ্গে সোহেল চৌধুরীর তর্কাতর্কি ও হাতাহাতি হয়।

র‌্যাব কর্মকর্তারা বলেছেন, ট্রাম্পস ক্লাবে সবার সামনে আজিজ মোহাম্মদ ভাইকে অপমানের প্রতিশোধ নিতে বান্টি ও আশীষ রায় পরিকল্পনা করতে থাকেন। তখন বান্টি, আশীষ ও আজিজ মোহাম্মদ ভাই মিলে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনকে দায়িত্ব দেন, সোহেল চৌধুরীকে সরিয়ে দিতে। এরপর তাকে ওই ক্লাবেই গুলি করে হত্যা করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আশীষ রায় একটি এয়ারলাইন্সের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন। পরে সে দেশের একটি নামকরা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বেশ কয়েকবার কানাডায় যান তিনি। কানাডায় পলাতক বান্টি ইসলাম, থাইল্যান্ডে পলাতক আজিজ মোহাম্মদ ভাই ও মেডিকেল সার্টিফিকেট দেখিয়ে আমেরিকায় পালিয়ে যাওয়া আদনান সিদ্দিকীর সঙ্গেও তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। নতুন করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা হলে তিনি আতঙ্কিত হয়ে নিজের বাসা ছেড়ে পাঁচতারকা একটি হোটেলের এমডির ভাড়া করা গুলশানের বাসায় আত্মগোপন করেন। মাদক উদ্ধারের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে পৃথক মামলা হবে।

মামলার জব্দ করা আলামত উপস্থাপনের নির্দেশ :এদিকে, সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলার জব্দ করা আলামত আগামী ১৭ এপ্রিলের মধ্যে উপস্থাপন করতে আইজিপিকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে কেস ডায়েরি দাখিল করতে বলা হয়েছে। গতকাল বুধবার ঢাকা ২ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. জাকির হোসেন এ আদেশ দেন।