ঈদ সামনে রেখে দিনরাত কাজ করে চলেছেন লক্ষাধিক কারিগর। বাড়তি বিক্রির প্রস্তুতিও চলছে ভৈরবের পাদুকা শিল্প অঞ্চলে। তবে করোনার দুই বছরে কমেছে শ্রমিকের সংখ্যা। তাই বাড়তি উৎপাদনই এখন ব্যবসায়ীদের মাথাব্যথার কারণ। তার পরও সবকিছু ছাপিয়ে এবার ভৈরব থেকে ৪০০ কোটি টাকার জুতা বিক্রির আশা করা হচ্ছে।

নৌ ও সড়কপথের সুবিধার কারণে স্বাধীনতার পর মাছের আড়ত হিসেবে ভৈরবের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৮৯ সালে এ অঞ্চলে নতুন করে পাদুকা শিল্প গড়ে ওঠে। ব্যবসায়ীদের মধ্যে শতকরা ৬০ ভাগই তরুণ উদ্যোক্তা। ভৈরব উপজেলা পরিষদের এলাকাসহ আশপাশের ১০ কিলোমিটার এলাকাব্যাপী, অর্থাৎ প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১২ হাজার জুতার কারখানা রয়েছে। কারখানা ঘিরে ভৈরবে চারটি বড় বড় পাইকারি মার্কেট তৈরি হয়েছে। এগুলো হলো- মিজান কমপ্লেক্স, শহিদুল্লাহ কায়সার মার্কেট, কাঞ্চন মার্কেট ও বশির মার্কেট। ঈদ উপলক্ষে প্রতিটি মার্কেটে পাদুকা বেচাকেনার ধুম পড়েছে। এখানকার তৈরি জুতা ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, রাজশাহী, বরিশালসহ দেশের অধিকাংশ জেলা শহরে বাজারজাত করা হয়।

ডায়মন্ড পিউ ফুটওয়্যারের কর্ণধার বাহারুল আলম বাচ্চু বলেন, ঈদ ঘিরে ব্যবসায়ীদের চাওয়া-পাওয়া এবার বেশি। সেই অনুপাতে বিক্রিও হচ্ছে। আমাদের কারখানা থেকে প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার জোড়া জুতা বিক্রি হচ্ছে। প্রতি জোড়ার দাম ২২৫ থেকে ২৩০ টাকা পর্যন্ত। শ্রমিক রয়েছেন প্রায় ১০০। তবে ঈদের মৌসুমে ২০০ শ্রমিকের প্রয়োজন ছিল। অন্য কারখানা মালিকরা বলছেন, বর্তমানে শ্রমিক সংকট ছাড়াও এ শিল্পের সবচেয়ে বড় সমস্যা কাঁচামালের দামের ঊর্ধ্বগতি। পাদুকা তৈরির কাঁচামাল আমদানি করতে হয় চীন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে।

জসিমের 'সু সোল রিসাইক্লিং ইউনিট': নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকে পুরান ঢাকার মালিটোলায় ৫০ শ্রমিক নিয়ে জুতা তৈরি করতেন ভৈরবের মো. জসিম উদ্দিন। বঙ্গবাজারে ছিল খুচরা বিক্রির দোকানও। বিপত্তি বাধে ১৯৯৪ সালের দিকে। ৮-৯ চাঁদাবাজের দাবির ৫০ হাজার টাকা না দিয়ে উল্টো মারধর করে ঢাকা ছাড়েন তিনি। অভাব তখন তাকে গ্রাস করে ফেলে। কিন্তু পিছু হটেননি। নতুন উদ্যমে ভৈরবের কালিকাপ্রসাদের চকবাজারে শুরু করেন জুতার ব্যবসা। মূলত তিনি ঢাকা থেকে জুতার সোল কিনে এনে নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মেসার্স জব্বার এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে বিক্রি করতেন। পিকেএসএফের সহযোগী সংস্থা পিপলস ওরিয়েন্টেড প্রোগ্রাম ইমপ্লিমিন্টেশনের (পপি) পরামর্শ ও সহযোগিতায় ২০১৮ সালে তিনি রিসাইক্লিং ইউনিটের মাধ্যমে পাদুকা কারখানা থেকে উৎপাদিত বর্জ্য রিসাইকেল করে সোল তৈরির উদ্যোগ নেন। শুরুতে মাত্র এক সেট মেশিন নিয়ে সোল উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করলেও পরবর্তীতে সাসটেইনেবল এন্টারপ্রাইজ প্রজেক্টের (এসইপি) মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে সোল রিসাইক্লিং ইউনিটে আরও যন্ত্রাংশ সংযোজন করেন।

সরেজমিন দেখা গেল, ঈদ উপলক্ষে চাহিদা বাড়ায় সকাল ৭টা থেকে তার কারখানায় মোট পাঁচটি ইনজেকশন মোল্ডিং মেশিন, তিনটি মিক্সার মেশিন, এবং দুটি গ্রাইন্ডিং মেশিনে অনবরত কাজ করছেন ৫০ জন শ্রমিক। তাদের মধ্যে নারী শ্রমিকের সংখ্যা ১০। এ কারখানায় দৈনিক গড়ে ১ থেকে ১ দশমিক ৫ টন অর্থাৎ মাসে ৩৫-৪০ টন পুনঃব্যবহারযোগ্য বর্জ্য কাঁচামাল হিসেবে রিসাইকেল করা হচ্ছে। অবশ্য চাহিদার ভিত্তিতে এই পরিমাণ ওঠানামা করে।

জসিম উদ্দিন বলেন, রিসাইক্লিং ইউনিটে দৈনিক গড়ে ৬০০ ডজন সোল তেরি হয়। এখানে উৎপাদিত সোল প্রতি ডজন ৮০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হয়। এসব সোল ভৈরবের বিভিন্ন পাদুকা উদ্যোক্তা সরাসরি কেনেন। ভৈরব ছাড়াও এই রিসাইক্লিং ইউনিটে তৈরিকৃত সোল রংপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলার পাদুকা তৈরির কারখানায় সরবরাহ করা হয়। তিনি আরও বলেন, ঈদ উপলক্ষে প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই লাখ টাকার সোল বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া গত চার-মাস আগে নিজ ভবনের দ্বিতীয় তলায় স্থাপন করেছেন জুতা তৈরির কারখানাও। উৎপাদনের চাহিদা মেটাতে এ কারখানায় ৯০ জন শ্রমিক দিনরাত পর্যায়ক্রমে কাজ করছেন। তাদের মধ্যে ৭০ জনই নারী।

চাপ বেড়েছে সু ক্রাফট কমন সার্ভিসেও: সাধারণত এক জোড়া জুতা তৈরি হয় পর্যায়ক্রমে আপার, কাটিং, পেস্টি, সোল, ফিটিং, ফিনিশিং, স্ট্ক্রিন প্রিন্ট, কালারসহ আটটি ধাপে। তবে ভৈরবের ২০ থেকে ২৫ জন বড় ব্যবসায়ীর ছাড়া বেশিরভাগ কারখানাতেই নেই অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি। ফলে বড় কারখানাগুলোর দ্বারস্থ হতে হয় এসব ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার। সোহেল, শামীম, সানজিদাসহ বেশ কয়েকজন উদ্যোক্তা বলেন, মন্দা মৌসুমে ওই সব কারখানায় টাকা দিয়েই কাটিং ও ফিটিং করানো হয়। কিন্তু ঈদ বা উৎসবে তাদের কাছ থেকে সহযোগিতা পাওয়া যায় না। উৎপাদন বাড়াতে তারাই রাতদিন কাজ করেন। এ অবস্থায় ভৈরবের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহযোগিতায় বিশ্বব্যাংক এবং পিকেএসএফের যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন সাসটেইনেবল এন্টারপ্রাইজ প্রজেক্টের (এসইপি) মাধ্যমে গড়ে তুলেছে 'সু ক্রাফট কমন সার্ভিস'। সোমবার ভৈরব হাইওয়ে থানা সংলগ্ন এ সেন্টারে গিয়ে দেখা গেল, দূরদূরান্ত থেকে উদ্যোক্তারা ছুটে আসছেন এখানে। কেউ আসছেন কাটিং করাতে। কেউ আসছেন ডিজাইন করাতে। এ প্রজেক্টের ম্যানেজার মো. বাবুল হোসেন বলেন, 'এই সার্ভিস সেন্টারে বিভিন্ন ধরনের কাটিং (নাইফ, বিম ও লেজার) করা হয়। এ ছাড়া সুয়িং, সোল স্ট্রেচিং, এমবোশিং ও ডিবোসিং, এমব্রয়ডারি ও আপারে বিভিন্ন ধরনের ডেকোরেশন, পাথর, পুঁথি বসানোর কাজ হয়। যেসব উদ্যোক্তার এসব মেশিন নেই, তারা সাধারণত এখান থেকে সেবা নিয়ে থাকেন।

ভৈরবে পাদুকা শিল্পের উন্নয়ন প্রসঙ্গে উন্নয়ন সংস্থা পিএকএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. নমিতা হালদার এনডিসি বলেন, এসইপি প্রকল্পের আওতায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের স্বল্প পরিমাণ উৎপাদনের দুষ্টুচক্র থেকে বের করে আনা হচ্ছে। এ ছাড়া এসইপির আওতাধীন সব উপপ্রকল্প এলাকায় নারীদের জন্য শোভন কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করতে পিকেএসএফ কাজ করছে।

বিষয় : পাদুকা শিল্প অঞ্চল ভৈরবের পাদুকা শিল্প পাদুকা শিল্প

মন্তব্য করুন