দইয়ের জেলা নামে পরিচিত বগুড়ায় বছর পাঁচেক আগেও সরার (দইয়ের পাত্র) আকার ছিল বেশ বড়। সরা ভরতে এক কেজি দই লাগতো। দামও ছিল কম। তখন এক কেজির একটি সরার দই পাওয়া যেত ১১০ টাকায়। তবে সেই দিন এখন আর নেই। একই সরায় এখন মিলছে সর্বোচ্চ আধা কেজি দই। আবার সরার আকার বড় হলেও গভীরতা কমের কারণে সেখানেও আধা কেজির বেশি দই আঁটে না। একইভাবে দামও দ্বিগুণ হয়েছে। ২২০ টাকার নিচে নামিদামি প্রতিষ্ঠানের দই মেলে না। ব্যবসায়ীদের দাবি, দুধের দাম ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় সরা ছোট করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

জেলার অন্যতম মৃতশিল্প তৈরির এলাকা হিসেবে পরিচিত গাবতলীর কুমারপাড়ার বিধান কুমার বলেন, 'বাপ-দাদার আমল থেকে মাটি দিয়ে দইয়ের সরা তৈরির কাজ করে আসছি। আগে ভারে করে সরা বিক্রি করতে দই ব্যবসায়ীদের কাছে নিয়ে যেতে হতো। সরার মাপ ছিল এক কেজি দই রাখার মতো। কিন্তু পাঁচ-ছয় বছর হলো দই ব্যবসায়ীদের লোকেরা আমাদের বাড়ি এসে সরার অর্ডার দিয়ে যান। তারা সরার ওজন (৬০০ গ্রাম) ঠিক রেখে আকার ছোট করে দিতে বলেন। এতে আধা কেজির বেশি দই আঁটে না।'

দইয়ের নিয়মিত ক্রেতা শহরের সূত্রাপুর এলাকার বাসিন্দা মহিউদ্দিন বলেন, পাঁচ বছর আগেও একটি সরার দই ১১০ টাকায় কিনে ১০ জন মিলে খেতে পেরেছি, এখন ২২০ টাকায় কিনে পাঁচজনের বেশি হয় না।

দইয়ের অন্যতম কারিগর শেরপুর উপজেলার ছনকার জামাল মিয়া বলেন, ৩০ বছর ধরে দই তৈরি করে আসছি। কিন্তু দইয়ের গুণগত মান আগের মতো ঠিক নেই।

এমনও অভিযোগ আছে, কিছু দই ব্যবসায়ী আরও ছোট আকারে সরা তৈরি করে নেন, তাতে দই আঁটে ৪০০ গ্রাম। আবার কেউ কেউ ক্রেতার মন জোগাতে সরার আকার বড় করে তৈরি করে নিলেও তাতে দই ৫০০ গ্রামের বেশি আঁটে না। কারণ, ওই সরার গভীরতা নেই। এমন নানা কৌশলে সরা তৈরি করে নেন ব্যবসায়ীরা।

নানা বাহারি নাম দিয়ে দই বিক্রি করা হচ্ছে। এর মধ্যে আছে শাহী দই ও স্পেশাল দই। শাহী দই বিক্রি করা হচ্ছে প্রতি সরা ২৬০ টাকায়। স্পেশাল দই ২৪০ টাকায়। সাধারণ দই বিক্রি হচ্ছে ২২০ টাকায়। রোজার সময়ে এসে দইয়ের দাম বেড়ে গেছে। বগুড়ায় হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের দইয়ের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। আকবরিয়া দই, এশিয়া দই, ফুড ভিলেজ দই, দইঘর, শ্যামলী দই, রফাত দই, মরহম আলী দই, গৌরগোপাল, শেরপুর দই, সাউদিয়া দই ইত্যাদি। বিশেষ করে বাইরের জেলার মানুষদের কাছে এ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের দইয়ের কদর একটু বেশি। এ ছাড়া নানা নামে নানা দামে সহস্রাধিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি উদ্যোগে দই বিক্রি করা হচ্ছে।

যেমন চড়া দামে দই বিক্রি হয় আবার তেমনি নিম্ন দামেও দই মেলে। সর্বনিম্ন ১২০ টাকায়ও দই পাওয়া যায়। দইয়ের ওজন এবং গুণগত মানের ওপর মূল্য হেরফের হয়। মজার বিষয় হলো- ক্রেতারা দইয়ের ওজনের কথা জানতে চান না, শুধু দামের কথা শোনেন এবং মান ভালো কিনা তা জানতে চান। ফলে কেজি হিসাব ধরেই দই কিনে ঠকছেন ক্রেতা। তবে ব্যবসায়ীরা স্বীকার করছেন দইয়ের ওজন এখন আর আগের মতো নেই। দুধের দাম বৃদ্ধি ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় দইয়ের ওজন কমাতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানান রফাত দইয়ের মালিক আমির হোসেন।

আকবরিয়ার দই শীতের মধ্যে লন্ডন, মালয়েশিয়া, সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশেও যায় দাবি করেন আকবরিয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান হাসান আলী আলাল। তিনি বলেন, গরমের মধ্যে না যাওয়ার কারণ দই দু-তিন দিনের বেশি থাকে না, আর শীতের মধ্যে পাঁচ-ছয় দিন ভালো থাকে। উৎপাদন খরচ বাড়ায় দইয়ের দাম বেড়েছে বলে জানান তিনি।

বিএসটিআইর অনুমোদন ছাড়াও দই বিক্রি করছেন অনেকে। এ জন্য দুই দোকান মালিককে জরিমানাও করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। বিশেষ করে বাস টার্মিনাল এলাকায় ক্রেতারা বেশি ঠকছেন।

বিএসটিআইর বগুড়ার পরিদর্শক প্রকৌশলী জোনায়েদ আহম্মেদ বলেন, অনেকেই নিম্নমানের দই বিক্রি এবং ওজনে কম দিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযান চলবে।

সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযান (সুপ্র) বগুড়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক কেজিএম ফারুক বলেন, দইয়ের বাজার ধরে রাখতে হলে মান ও ওজন সঠিক দিতে হবে। নইলে সাময়িক লাভ করতে গিয়ে বড় ক্ষতি হয়ে যাবে।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বগুড়ার সহকারী পরিচালক ইফতেখারুল আলম রিজভী বলেন, দই নিয়ে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত রোববার শেরপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অভিযান চালিয়ে সাতটি দোকানকে জরিমানা করা হয়েছে।