শ্রম, মেধা, ত্যাগ ও নিষ্ঠার সঙ্গে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ছাত্রদলের শিখরে পৌঁছেছেন বরিশালের সন্তান সাইফ মাহমুদ জুয়েল। রোববার ঘোষিত জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। খুশি হয়ে রোববার রাতেই শোলক ইউনিয়ন বিএনপির তিন চারশ নেতাকর্মী নিয়ে সেখানে আনন্দ মিছিল করেছেন। কিন্তু গ্রামের একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের শেকড় থেকে কীভাবে রাজনীতির কেন্দ্রে পৌঁছালেন মাহমুদ জুয়েল?

তার রাজনীতির শুরু গ্রাম থেকেই। সেই ২০০৩ সালের দিকে এইচএসসি প্রথমবর্ষে পড়ার সময়ই ছাত্রদলের সঙ্গে যুক্ত হন মাহমুদ জুয়েল। ওই সময় ধামুরা ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সভাপতি নির্বাচিত হন। এরপর শুরু হয় তার কত শত বাধা পেরোনোর পালা।

বরিশালের উজিরপুর উপজেলার শোলক ইউনিয়নের ধামুরা গ্রামের মৃত পল্লী চিকিৎসক শাহজাহান হাওলাদারের কনিষ্ঠ ছেলে মাহমুদ জুয়েল ধামুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এবং ধামুরা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। উচ্চ মাধ্যমিক ঢাকা কলেজে ভর্তি হলেও বিশেষ কারণে এইচএসসি পরীক্ষা দিতে হয়েছে ধামুরা ডিগ্রি কলেজ থেকে। ২০০২ সালে বিজ্ঞান বিভাগে ৪ দশমিক ৩৮ পয়েন্ট পেয়ে এসএসসি এবং ২০০৪ সালে ৪ দশমিক ৩০ পয়েন্ট পেয়ে মানবিক বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ পরে ২০০৫-৬ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যে সম্মান শ্রেণিতে ভর্তি হন তিনি।

মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান মাহমুদ জুয়েলের মা মমতাজ বেগম (৬৫) ধামুরার বাড়িতেই থাকেন। বড় ভাই মো. মনিরুজ্জামান সেলিম ধামুরা বাজারের ওষুধ ব্যবসায়ী। মেঝো ভাই মো. সোহান হোসেন ডালিম ব্যবসায়ী হলেও তিনি বরিশাল দক্ষিণ জেলা যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। সেঝো ভাই মো. দুর্জয় হাওলাদার সোহেল সরকারি চাকরি করেন। চার ভাইয়ের সবার ছোট একমাত্র বোন মোনালিসা তানিয়া থাকেন স্বামীর সঙ্গে পটুয়াখালীর দুমকীতে।

মাহমুদ জুয়েলের বড় ভাই মনিরুজ্জামান সেলিম বলেন, ধামুরা ডিগ্রি কলেজে এইচএসসি প্রথমবর্ষে পড়ার সময় ছাত্রদলের সঙ্গে যুক্ত হয় জুয়েল। ওই সময় ধামুরা ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সভাপতি নির্বাচিত হয় সে। দ্বিতীয় বর্ষে গিয়ে ধামুরা কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদক হয়।

খবর নিয়ে জানা গেছে, মাহমুদ জুয়েলের বাবা মরহুম শাহজাহান হাওলাদার পল্লী চিকিৎসক হওয়ার কারণে গ্রামের মানুষের অত্যন্ত আপনজন ছিলেন। ২০২০ সালের ১৪ জানুয়ারি তিনি মারা যান। শাহজাহান হাওলাদার কখনও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, যেখানে জুয়েল উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হওয়ার পরপরই ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। এ জন্য পরিবার থেকে তাকে কখনও বাঁধাও দেওয়া হয়নি।

প্রতিবেশী এবং মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী অ্যাডভোকেট মোর্শেদা পারভীন বলেন, রাজনীতির বাইরে গিয়ে যদি কথা বলি, তাহলে বলতে হয় জুয়েলদের পরিবার অত্যন্ত সামাজিক। গ্রামের সবার সঙ্গে তাদের সখ্যতা আছে। জুয়েল নিজেও মেধাবী এবং ভদ্র ছেলে।

অপর এক প্রতিবেশী ব্যবসায়ী কাওসার মজুমদার বলেন, জুয়েল তৃণমূল থেকে উঠে আসা নেতা। শ্রম, মেধা ও ত্যাগের বিনিময়ে রাজনীতিতে সে সফলতা পেয়েছে। আমি জুয়েলের সাফল্য কামনা করছি।

ধামুরা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক জহিরুল ইসলাম বলেন, জুয়েল পড়াশোনায় যেমন মেধাবী তেমন তার সাংগঠনিক যোগ্যতাও প্রখর। নেতৃত্ব দেওয়ার মতো সক্ষমতা তার আছে।

এ পর্যন্ত চার বার কারাবরণ করেছেন মাহমুদ জুয়েল। ২০১২ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার পর একনাগারে সর্বোচ্চ চার মাস কারাগারে ছিলেন। এখনও মাথার ওপর ঝুলছে ২২টি মামলার খড়গ।

এ প্রসঙ্গে বড় ভাই মনিরুজ্জামান সেলিম বলেন, প্রথমবার যখন জুয়েলকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হয়, সেদিন খুব কেঁদেছি। কারণ জুয়েল আমাদের চার ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট, ওকে সন্তানের চোখে দেখি।

মাহমুদ জুয়েল সমকালকে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর রাজনৈতিক প্রতিকূলতার কারণে ছাত্রদলের বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা হল শাখার কমিটি হয়নি ১২ বছর। পরে ২০১৬ সালে আমি ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হই।

২০১৯ সালে তিনি কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। বাংলা সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে এখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ কল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে সান্ধ্য কোর্সে স্নাতকোত্তর করছেন।

মাহমুদ জুয়েল বলেন, বাংলাদেশের ছাত্র সমাজের প্রিয় সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হতে পেরে গৌরব বোধ করছি। এবার দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে গণতন্ত্র উদ্ধার ও ভোটের অধিকার নিশ্চিত করতে ছাত্রদল রাজপথে কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলবে। দেশের সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে সবসময় সক্রিয় থাকবে ছাত্রদল।