বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) দেশি প্রজাতির মাছের প্রজনন ও চাষাবাদের ওপর একের পর এক সফলতা অর্জনের পর এবার এসেছে শোল মাছ। বিজ্ঞানীরা হ্যাচারিতে দেশে প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ শোল মাছের কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদনে সফলতা অর্জন করেছেন। চলতি এপ্রিল মাসে ইনস্টিটিউটের ময়মনসিংহস্থ স্বাদুপানি কেন্দ্রে এ সফলতা অর্জিত হয়।

বিএফআরআই সূত্র জানায়, বাংলাদেশে মিঠাপানির দেশীয় প্রজাতির মাছের মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় মাছ শোল। এ মাছটি খেতে সুস্বাদু এবং পুষ্টিগুণ সম্পন্ন হওয়ায় বাজারে এর প্রচুর চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়াও চীন, শ্রীলঙ্কা, ভারত, নেপাল, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ পূর্ব-এশিয়ায় এ মাছ পাওয়া যায়। শোল মাছে মানব দেহের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও মিনারেল রয়েছে। প্রতি ১০০ গ্রাম ভক্ষণ যোগ্য মাছে প্রোটিন ১৬ দশমিক ২ গ্রাম, আয়রন শূন্য দশমিক ৫৪ মিলিগ্রাম, ক্যালসিয়াম ৯৫ মিলিগ্রাম, ফসফরাস শূন্য দশমিক ১৯ মিলিগ্রাম, জিংক ১ হাজার ৮০ মাইক্রোগ্রাম। খাল-বিল, হাওড়-বাওড়, স্রোতহীন জলধারা ও প্লাবনভূমিতে এক সময় শোল মাছ প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত। বর্তমানে জলাশয় সংকোচন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, পানি দূষণ এবং অতি আহরনের ফলে মাছটির বিচরণ ও প্রজননক্ষেত্র বিনষ্ট হওয়ায় এর প্রাপ্যতা সাম্প্রতিক সময়ে অনেক হ্রাস পেয়েছে। এ মাছটিকে হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে এবং চাষের জন্য পোনার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে এর কৃত্রিম প্রজনন, পোনা উৎপাদন ও চাষ ব্যবস্থাপনা কৌশল উদ্ভাবনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের ময়মনসিংহস্থ স্বাদুপানি কেন্দ্রে এ মাছের কৃত্রিম প্রজনন ও পোনা উৎপাদন নিয়ে গবেষণা শুরু করা হয়। গবেষণার মাধ্যমে দেশে প্রথমবারের মতো হ্যাচারিতে চলতি এপ্রিল মাসে দেশীয় শোল মাছের কৃত্রিম প্রজনন ও পোনা উৎপাদনে সফলতা অর্জিত হয়। পোনা উৎপাদনে সফলতা অর্জিত হওয়ায় দেশে শোল মাছ চাষে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে এবং মাছটি আকারে বড় হওয়ায় দেশে মোট মৎস্য উৎপাদনে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বিএফআরআই বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, একটি শোল মাছের দৈর্ঘ্য সর্বোচ্চ ১ মিটার এবং ওজনে ৫ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। শোল মাছ সাধারণত কর্দমাক্ত ও জলাবদ্ধ স্থান এবং যেখানে জলজ আগাছা রয়েছে এমন স্থানে বেশি পাওয়া যায়। এ মাছের প্রধান আবাসস্থল খাল-বিল ও হাওড়-বাওড়। এ মাছ সাধারণত জলাশয়ের নিচের স্তরে বসবাস করে; কিন্তু উপরের স্তরের খাবার গ্রহণ করে। শোল মাছ মাংশাসী শ্রেণির। এরা জুপ্লাংটন, পোকামাকড়, ছোট মাছ, ব্যাঙ, মশার শূককীট এবং জলজ কীটপতঙ্গ শিকার করে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে থাকে। বাজারে বড় এক কেজি শোল মাছের দাম ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা।

বিএফআরআই থেকে পরিচালিত গবেষণায় উঠে এসেছে, এ মাছের প্রজননকাল সাধারণত এপ্রিল মাস থেকে শুরু হয়ে অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত হলেও এপ্রিল-আগষ্ট এদের সর্বোচ্চ প্রজনন মৌসুম। পুরুষ মাছের তুলনায় স্ত্রী মাছ আকারে অপেক্ষাকৃত বড় হয়। এ মাছের ডিম্বাশয় এপ্রিল মাস থেকে পরিপক্ক হতে শুরু করে। এপ্রিল মাসে স্ত্রী মাছের জিএসআই মান গড়ে ৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং ফেকান্ডিটি (ডিম ধারণ ক্ষমতা) ১৩০০০-২১০০০। প্রতি গ্রাম স্ত্রী মাছে গড়ে ৮০-৯০টি ডিম পাওয়া যায়।

হ্যাচারিতে কৃত্রিম প্রজননের উদ্দেশে সুস্থ-সবল দেশি শোল মাছ নেত্রকোণা ও হাওড় অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করে গবেষণা কেন্দ্রের পুকুরে প্রতি শতাংশে ১০-১২টি হারে মজুদ করা হয়। মজুদকৃত পুকুরে জলজ আগাছা (কচুরিপানা, কলমি লতা, ডালপালা) দেওয়া হয়। মজুদকৃত মাছকে দৈহিক ওজনের ৬-৩শতাংশ হারে খাবার দেওয়া হয়। প্রায় ১ বছর পুকুরে লালন পালনের পর কৃত্রিম প্রজননের জন্য এপ্রিল মাসের শুরুতে এর জিএসআই মান দেখে পরিপক্ক স্ত্রী ও পুরুষ মাছ নির্বাচন করে পুকুর থেকে সংগ্রহ করা হয়। কৃত্রিম প্রজননের ৬-৭ ঘণ্টা পূর্বেই স্ত্রী ও পুরুষ মাছ পুকুর থেকে সংগ্রহ করে ৬ জোড়া মাছকে হরমোন ইনজেকশন প্রয়োগ করা হয়। ইনজেকশন দেওয়ার পর স্ত্রী ও পুরুষ মাছ ১ অনুপাত ১ দশমিক ৫ অনুপাতে হ্যাচারিতে রাখা হয়। ইনজেকশন দেয়ার ৩৫-৪০ ঘণ্টা পরে স্ত্রী শোল মাছ ডিম দেয়। এ মাছের ডিম পানির উপরের দিকে ভেসে থাকে। শোল মাছ স্বজাতিভোজী হওয়ায় ডিম দেয়ার পর ব্রুড মাছ দ্রুত সরিয়ে ফেলতে হয় এবং অক্সিজেনের সরবরাহ বৃদ্ধি করা হয়। ডিম দেওয়ার ৩০-৩২ ঘণ্টার মধ্যে নিষিক্ত ডিম হতে রেণু বের হয়ে আসে। ডিম থেকে রেণু বের হওয়ার পর হাঁপাতে ৪৮-৭২ ঘণ্টা রাখতে হয়। রেণুর ডিম্বথলি ৬০-৭০ ঘণ্টার মধ্যে নিঃশেষিত হওয়ার পর প্রতিদিন ৪-৫ বার মুরগির সিদ্ধ ডিমের কুসুম খাবার হিসেবে হাঁপায় সরবরাহ করা হয়। এ মাছের স্বগোত্রভোজী স্বভাব থাকায় ডিমের কুসুম সিদ্ধ ৪-৫ ঘণ্টা পর পর দিতে হবে। হাঁপাতে রেণু পোনাকে এভাবে ৩-৪ দিন রাখার পর নার্সারি পুকুরে স্থানান্তর করা হয়। গবেষণায় পোনা বেঁচে থাকার সর্বোচ্চ হার ছিল শতকরা ৮৫-৯০ ভাগ।

ইনস্টিটিউট সূত্র আরও জানায়, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডে শোল মাছের নিবিড় চাষ করা হয়। কিন্তু দেশে দেশিয় শোল মাছের পোনা না থাকায় এ মাছটিকে চাষের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছিল না। ব্যক্তিগত খামারিদের উদ্যোগে চাষের জন্য ২০১১ সালে  ভিয়েতনামী শোল মাছের পোনা দেশে আমদানী করা হয় এবং চাষাবাদ শুরু করা হয়। কিন্তু বিদেশি এ মাছটি দেশে তেমন জনপ্রিয়তা পায়নি। আগামী ১-২ বছরের মধ্যে দেশিয় শোল মাছের পোনা উৎপাদন প্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ে হস্তান্তর করা হবে। চাষের মাধ্যমে এ মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি করে দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় এ মাছটি রপ্তানি করা যাবে।

গবেষক দলের প্রধান ড. মো. শাহাআলী জানান, শোল মাছের প্রজনন ও চাষ অন্যান্য মাছের তুলনায় অপেক্ষাকৃত জটিল। এরা অন্যান্য মাছের মত খৈল/কুঁড়া জাতীয় খাবার খেতে অভ্যস্ত নয়। ফলে পোনা তৈরির জন্য মা-বাবা অর্থাৎ ব্রুড মাছ তৈরি করা খুব কষ্টকর বিষয় ছিল। প্রথমে এদেরকে প্রোটিন সমৃদ্ধ দেশিয় একটি খাবারে অভ্যস্ত করা হয়। এরপর ব্রুড তৈরি করে হরমোন ইনজেকশনের মাধ্যমে পোনা তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া এ মাছটি স্বজাতিভোজী হওয়ায় একটি আরেকটিকে ধরে ধরে খায়। ফলে পোনা বাঁচিয়ে রাখাও ছিল আরেকটি চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ বলেন, দেশীয় শোল মাছের কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদন করা ছিল ইনস্টিটিউটের জন্য একটি অন্যতম চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘ গবেষণার পর সফলতা আসে। শোল মাছসহ ইনস্টিটিউট এ পর্যন্ত ৩৪ প্রজাতির দেশীয় ও বিপন্ন প্রজাতির মাছের প্রজনন ও চাষাবাদ কৌশল উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছে। চলতি বছরে দেশি শোল মাছের পোনা উৎপাদন কৌশল উদ্ভাবন হওয়ায় এ মাছ চাষের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উম্মোচিত হবে।