‘বিষাদ ছুঁয়েছে আজ, মন ভালো নেই, মন ভালো নেই/ ফাঁকা রাস্তা, শূন্য বারান্দা সারাদিন ডাকি সাড়া নেই, একবার ফিরেও চায় না কেউ/ পথ ভুল করে চলে যায়, এদিকে আসে না...।’ 

কবি মহাদেব সাহার এই পঙক্তিই যেন ভেসে বেড়ায় বৃদ্ধাশ্রমের বাতাসে। কারোই মন ভালো নেই। কখনো মন ভালো থাকে না। কোনো বিশেষ দিন এলে যেন এই প্রবীণদের মন আরও খারাপ হয়ে যায়। চরম বিষণ্নতার ভেতর দিয়েই তারা ঈদ কাটাচ্ছেন। পরিবার-পরিজন সন্তান, নাতি-নাতনির নানা স্মৃতিই ঈদের দিন বেশি করে মনে পড়ে। গাজীপুরের মুকুলের বৃদ্ধাশ্রমে ঠাঁই পাওয়া ১৬৫ জন প্রবীণের একই আর্তনাদ। সন্তান ও স্বজনদেরকে কাছে পাওয়ার আকুতি। এ সকল প্রবীণদের সঙ্গী এখন কেবলই দীর্ঘশ্বাস। তবুও ভালো আছেন জানালেন। কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন তাদেরকে ভালো রাখার। কিন্তু সব ফেলে আসা মানুষগুলো কি ভালো থাকতে পারেন? 

সব সময়ই তাদেরকে বিষাদ ঘিরে রাখে। আপনজনের সান্নিধ্য পাওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বছরের পর বছর তারা পথ চেয়ে থাকেন। কিন্তু কেউ ফিরেও তাকায় না, ভুল করে চলে যায়। অনিবার্য নিয়তির পথ চেয়ে বৃদ্ধাশ্রমে দিন কাটে ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে আসা মানুষগুলোর। বয়সের ভারে তারা নুয়ে পড়েছেন। জীবনের বোঝা বইতে বইতে এদের অনেকেই ঢের ক্লান্ত। ঘরের বাইরে এক ঘরে কাটছে তাদের জীবনের শেষ দিনগুলো। অথচ এই সময়টা স্ত্রী-সন্তান কিংবা স্বজনদের কাছে থাকার কথা ছিল। সেটা না হওয়ার জন্য ভাগ্যকেই দায়ী করছিলেন মুকুলের বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নেওয়া বেশি ভাগ হতভাগ্য প্রবীণ। 

গাজীপুর সদরের মণিপুরে শত বিঘা জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত মুকুলের এই বৃদ্ধাশ্রমে রয়েছেন দেড় শতাধিক প্রবীণ। কারও সাথে কারও রক্তের কোনো বন্ধন নেই। তবু যেন জন্মান্তরের আত্মীয়তায় বাঁধা পড়ে আছেন। 

বৃদ্ধাশ্রমে ঠাঁই নেওয়ার গল্প সবার ক্ষেত্রে এক রকম নয়। কেউ এসেছেন দেখভাল করার মতো কেউ নেই বলে, কেউ এসেছেন পরিবারে চরম অবহেলার শিকার হয়ে, কেউবা নতুন প্রজন্মের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছিলেন না বলে। 

গোলনাহার নামে আশি ছুঁই ছুঁই এক প্রবীণ অভিমান করে চলে এসেছেন বৃদ্ধাশ্রমে। বুকের ভেতর কষ্ট চেপে বলছেন, ‘আমার ঠিকানা আজ বৃদ্ধাশ্রম।’ বেদনা-ছাওয়া বুকের দীর্ঘশ্বাসে এই নারী নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলেন, ‘আমি এখানে  কেন?’ ছলছল  চোখ তার। প্রশ্নের উত্তর না পাওয়ার ব্যর্থতায়, না জীবনের জটিল সমীকরণ মেলাতে না পারার যন্ত্রণায়, বোঝা গেল না তা। তারপর চুপচাপ। এবার বলে উঠলেন, ‘সব যন্ত্রণার কথা, সব বেদনার কথা বলা যায় না।’ গোলনাহার গুনগুন করে  গেয়ে উঠলেন, ‘দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইলো না....।’ 

‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে। তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।’ আশ্রমে থাকা মানুষগুলো দুঃখ, মৃত্যুর মাঝেই শান্তি, আনন্দ খুঁজে নিতে শিখে গিয়েছেন। তাদের জীবন নিজের মতো করে বয়ে চলে। এ ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের গানই মনে পড়ে, ‘ওরে আয়/ আমায় নিয়ে যাবি কে রে/ দিন শেষের শেষ খেয়ায়।’ 

আশ্রমে তত্ত্বাবধায়ক মাহমুদা শিউলি বললেন, ‘ঈদের দিন তাদের মন ভালো রাখার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টাটাই আমরা করি।’

এই বৃদ্ধাশ্রমে সব হারানো বাবা-মায়ের সন্তান হয়ে এই প্রবীণদের বুকে আগলে রেখেছেন খতিব আবদুল জাহিদ মুকুল। প্রায় একশ বিঘা জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বৃদ্ধাশ্রমটি। পাবনার শ্রীপুর গ্রামের খতিব আবদুল হামিদের ছেলে খতিব আবদুল জাহিদ মুকুল ১৯৮৭ সালে উত্তরার আজমপুরে ১২টি কক্ষ ভাড়া নিয়ে প্রথমে শুরু করেন এই বৃদ্ধাশ্রম। পরে গাজীপুরের এই মণিপুর এলাকায় একশ বিঘা জমি কিনে গড়ে তোলেন আশ্রমটি। ১৯৯৫ সালের ২১ এপ্রিল শান্তিতে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত মাদার তেরেসা উদ্বোধন করেন এই বৃদ্ধাশ্রম।