ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অর্থ পাঠানো বেড়েছে। ঈদের আগের মাস এপ্রিলে রেমিট্যান্স আবার ২ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করেছে। গত মাসে প্রবাসীরা মোট ২ দশমিক শূন্য ১ বিলিয়ন বা ২০১ কোটি ডলার সমপরিমাণ অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন, যা গত ১১ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। যদিও চলতি অর্থবছরের ১০ মাসের হিসাবে এখনও আগের অর্থবছরের তুলনায় রেমিট্যান্স কম এসেছে। তবে যে হারে কমছিল সেখান থেকে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্নেষণে দেখা গেছে, রেমিট্যান্সের কমে যাওয়ার যে প্রবণতা ছিল তা থেকে গত কয়েক মাসে কিছুটা উন্নতি হচ্ছে। তবে এখনও রেমিট্যান্স আগের অর্থবছরের একই পর্যায়ে আসেনি। গেল এপ্রিল মাসেও যে পরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছে তা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় প্রায় ৬ কোটি ডলার কম। আর এপ্রিল পর্যন্ত চলতি অর্থবছরের ১০ মাসে কম রয়েছে ৩৩৬ কোটি ডলার বা ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশ। জুলাই-এপ্রিল সময়ে প্রবাসীরা মোট এক হাজার ৭৩১ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। গত অর্থবছরের একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৬৭ কোটি ডলার। গত মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে রেমিট্যান্স ২১ দশমিক ৫৭ শতাংশ কম ছিল।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রবাসী বাংলাদেশিরা ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠিয়ে প্রতি ডলারে ৮৫ টাকা ৪০ পয়সার মতো পাচ্ছেন। এখান থেকে সার্ভিস চার্জ কাটা হচ্ছে। তবে সরকার আড়াই শতাংশ হারে প্রণোদনা দিচ্ছে। প্রণোদনা যোগ করে এবং সব খরচ বাদে হয়তো একজন রেমিট্যান্স গ্রহীতা ৮৫ থেকে ৮৬ টাকার মতো পান। অথচ সোনালী ব্যাংকই এখন নগদ ডলার বিক্রি করছে ৯২ টাকা। খোলাবাজারে এমন বা এর বেশি দরে ডলার বেচাকেনা হচ্ছে। এসব কারণে অনেকে অবৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত হন। আন্তঃব্যাংকে এখন ডলার বিক্রি হচ্ছে ৮৬ টাকা ৪৫ পয়সা দরে। আমদানিকারকদের দায় পরিশোধে খরচ করতে হচ্ছে ৮৬ টাকা ৫০ পয়সা। রপ্তানিকারকরা পাচ্ছেন ৮৫ টাকা ৫০ পয়সা।

সংশ্নিষ্টরা জানান, করোনা শুরুর পর রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি ছিল কিছুটা অস্বাভাবিক। ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রবাসীরা মোট ২ হাজার ৪৭৮ কোটি ডলার অর্থ পাঠিয়েছিলেন। ২০১৯-২০ অর্থবছরের তুলনায় যা ছিল ৬৫৭ কোটি ডলার বা ৩৬ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি। ওই সময় এতো বেশি রেমিট্যান্স বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে হুন্ডি কমে যাওয়াকেই বিবেচনা করা হয়। এখন হুন্ডি বাড়ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সাধারণভাবে রেমিটারদের থেকে একটি চক্র বৈদেশিক মুদ্রা কিনে নিয়ে সমপরিমাণ টাকা বাংলাদেশি সুবিধাভোগীর হাতে পৌঁছে দেয়। এ প্রবণতা হুন্ডি হিসেবে পরিচিত।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের মধ্যে এককভাবে সবচেয়ে বেশি আসে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের মাধ্যমে। গত এপ্রিল মাসে এই ব্যাংকটির মাধ্যমে প্রায় ৪৩ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। মোট রেমিট্যান্সের যা ২১ দশমিক ৩৭ শতাংশ। সব সরকারি ব্যাংক মিলে যেখানে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল ৩৯ কোটি ডলার। আর বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ১৬১ কোটি ডলার। বিদেশি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ৭৩ লাখ ডলার।

জানতে চাইলে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ মুনিরুল মওলা সমকালকে বলেন, ঈদ ও রমজানকে কেন্দ্র করে রেমিট্যান্স সব সময় বাড়ে। এবারও বেড়েছে। আগামী ঈদুল আজহা পর্যন্ত হয়তো এ ধারা অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, ২০২০-২১ অর্থবছরের রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি ছিল অস্বাভাবিক। অবৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স বন্ধ হলে এবারও হয়তো ওই হারে বাড়বে। এ ছাড়া করোনা শুরুর পর তখন অনেকে বিদেশ থেকে জমানো অর্থ নিয়ে দেশে ফিরেছেন। ফলে ২০১৯-২০ অর্থবছরের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে এবারও রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি আছে। সবাইকে ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানো উৎসাহিত করতে ব্যাংকার ও সরকার সব পক্ষকে বিভিন্নভাবে প্রচার চালাতে হবে। অবশ্য বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স বাড়াতে সরকার প্রণোদনার হার ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ইতোমধ্যে আড়াই শতাংশ করেছে।

ব্যাংকাররা জানান, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স এভাবে বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে চাপ কিছুটা কমবে। কেননা দেশের আমদানি হু হু করে বাড়ছে। রপ্তানিতে ভালো প্রবৃদ্ধি হলেও তা দিয়ে কুলিয়ে ওঠা যাচ্ছে না। চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৮ মাসে আমদানিতে ব্যয় হয়েছে পাঁচ হাজার ৮৭৭ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় যা ৪৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বেশি। আর রপ্তানি আয় হয়েছে তিন হাজার ৩৮৪ কোটি ডলার যা ৩০ দশমিক ৮৬ শতাংশ বেশি। এর মানে আমদানি-রপ্তানির মধ্যে দুই হাজার ৪৯৩ কোটি ডলারের পার্থক্য রয়েছে।

এ পরিস্থিতে আমদানি দায় মেটাতে কেউ যেন সমস্যায় না পড়ে সে জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে ডলার বিক্রি করছে। চলতি অর্থবছর এরই মধ্যে ৪৬০ কোটি ডলারের মতো বিক্রি করেছে। যে কারণে গত আগস্টে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ওপরে উঠে যাওয়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গত ৩০ এপ্রিল শেষে ৪৪ দশমিক শূন্য ৮ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে।