নারায়ণগঞ্জের বন্দরে পুকুরে লাফিয়ে পড়ে নিলয় আহম্মেদ বাবু নামে এক যুবক নিহতের ঘটনায় নতুন বিতর্ক দেখা দিয়েছে। গত ৩০ এপ্রিল রাতে পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়ার চার দিন পর গত বুধবার বাবুর লাশ উদ্ধার হলে নিহতের পরিবার ও স্থানীয়রা জানিয়েছিল, পুলিশের ধাওয়ায় বাবু বাড়ির পাশের একটি পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ওই সময় পুলিশের সঙ্গে বাবুর প্রতিপক্ষের লোকজনও ছিল।

এদিকে ওই ঘটনার পর করা মামলা, পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিখোঁজের দু'দিন পর নিহতের মায়ের জিডি ও লাশ উদ্ধারের পর এক আসামিকে আদালতে সোপর্দ করার জন্য পুলিশের দাখিলকৃত প্রতিবেদনে গরমিল দেখা গেছে। এ ছাড়া বাবুর লাশ উদ্ধারের পর তার বিরুদ্ধে করা অভিযোগের তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রওশন ফেরদৌসকে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে পুলিশ লাইন্সে ক্লোজ করা হয়েছে। নিহতের মায়ের করা মামলা ও আসামির সঙ্গে আদালতে পাঠানো পুলিশের প্রতিবেদনে ঘটনার তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে ৩০ এপ্রিল রাত সাড়ে ১০টা। কিন্তু ঘটনার পর লাশ উদ্ধারের আগে ২ মে নিহতের মা লিলি বেগমের করা নিখোঁজের জিডিতে বাবু ১ মে রাত ১০টায় বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে নিখোঁজ হন বলে উল্লেখ করা হয়। ৩০ এপ্রিল রাতে পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিখোঁজ হলে তার মা লিলি কেন তার ছেলে ১ মে রাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ হয়েছেন উল্লেখ করে ২ মে বন্দর থানায় জিডি করলেন তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

গত বুধবার দুপুরে উপজেলার নবীগঞ্জ বাগবাড়ি এলাকার একটি পরিত্যক্ত ডোবা থেকে বাবুর লাশ উদ্ধার করেন দমকল বাহিনীর সদস্যরা। এরপর নিহত বাবুর মা লিলি বেগম গত বুধবার স্থানীয় কাউন্সিলর বিএনপি নেতা আবুল কাউসার আশাকে প্রধান আসামি করে ১০ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন। ওই মামলায় ইতোমধ্যে দু'জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

মামলায় লিলি বেগম উল্লেখ করেন, তার প্রতিবেশী ও মামলার ৩ নম্বর আসামি হাসিনা বেগম তার ছেলে বাবুর বিরুদ্ধে থানায় একটি অভিযোগ করেন। অভিযোগের তদন্ত করতে বেশ কয়েকবার থানার এসআই রওশন ফেরদৌস তাদের বাড়িতে যান। ঘটনাটি মীমাংসা করার দায়িত্ব নেন মহানগর বিএনপির ৩ নম্বর সাংগঠনিক সম্পাদক ও নাসিকের ২৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবুল কাউসার আশা। গত ৩০ এপ্রিল ঘটনার রাতে লিলি বেগম বাড়িতে ছিলেন না। ওই রাত সাড়ে ১০টায় কাউন্সিলর আশার নির্দেশে তার লোকজন ও হাসিনা বেগম তার লোকজন নিয়ে বাড়িতে এসে তার ছেলেকে খুঁজতে থাকে। তাদের দেখে বাবু দৌড়ে কয়েকটি বাড়ি পরে তার বন্ধুর বাড়িতে আশ্রয় নেন। সেখানেও আসামিরা হামলা চালালে বাবু পাশের মজা পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তখন কাউন্সিলর ও প্রতিপক্ষের লোকজন পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়া বাবুকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এতে বাবু মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে তলিয়ে গিয়ে মারা যান।

মামলা ও জিডিতে ঘটনার তারিখ ও বক্তব্যে গরমিল প্রসঙ্গে জানতে চাইলে লিলি বেগম বলেন, ঘটনার রাতে তিনি বাড়িতে এসে বিষয়টি জানতে পেরে ঘটনাস্থলে ছুটে যান। ওই সময় ওই বাড়িতে থাকা বাবুর বন্ধুর স্ত্রী তাকে জানায়, কিছু লোক তাকে ধাওয়া করেছিল। কিন্তু বাবু পুকুরে ঝাঁপ দিয়েছে কিনা সেটি তিনি নিশ্চিত নন। বরং ওই বাড়ির পাশে থাকা আরেকটি রাস্তা দেখিয়ে বাবুর বন্ধুর স্ত্রী আশ্বস্ত করেছিলেন, এ রাস্তা দিয়েই হয়তো বাবু নিরাপদে সরে গেছেন। তার এ কথায় বাড়ি ফিরে আসেন। কিন্তু ওই রাতে বাবু আর বাড়ি ফেরেননি। পরদিন বন্দর থানার এসআই রওশন ফেরদৌস তাদের বাড়িতে এসে বলেন, বাবু পুকুর থেকে উঠে বাসায় এসে কাপড় পরিবর্তন করে আবার পালিয়েছে বলে তাদের কাছে খবর রয়েছে। তখন লিলি বেগম বিষয়টি সঠিক নয় বলে এসআইকে জানান। ১ মে রাতেও বাবু বাড়ি ফিরে না আসায় পরদিন ২ মে তিনি বন্দর থানায় জিডি করতে যান। কিন্তু ডিউটি অফিসার জিডি নিতে চাচ্ছিলেন না। পরে জিডি দেন।

এদিকে ওই ঘটনায় ক্লোজ হওয়া পুলিশের এসআই রওশন ফেরদৌসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঘটনার ব্যাপারে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

মামলার ১ নম্বর আসামি ২৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবুল কাউসার আশার সঙ্গে অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে যোগাযোগ করা হলে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

বন্দর থানার ওসি দীপক চন্দ্র সাহা বলেন, বাবু নিহতের ঘটনায় তার মা বাদী হয়ে ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। ইতোমধ্যে এক নারীসহ দু'জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এসআই রওশন ফেরদৌসকে ওই ঘটনায় তার দায়িত্বে অবহেলার কারণে ক্লোজ করা হয়েছে। সবকিছু তদন্তাধীন রয়েছে। বাবুর নিখোঁজের জিডি ও মামলায় ঘটনার তারিখ এবং ঘটনা প্রসঙ্গে দেওয়া বক্তব্যে গরমিল প্রসঙ্গে ওসি বলেন, সবকিছু তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।