'শুনলাম আবার নাকি ঝড় আসপে। মাইকে কয়ে গেল সাবধান থাকতি হবে। আমাগের আর সাবধানের কী আছে। ঝড় আসলি তো বান (বাঁধ) ভাঙবে, আর বান ভাঙলি তো ঘর সরাতি হবে। ঘর ভাঙলি যে কত কষ্ট তা বুঝবে কিডা। প্রত্যেক বছর এই সময়ডা আসলি ভয়ে থাকি- এই বুঝি সংকেত আসলো। সংকেত শুনলি পরানডা আপনা-আপনিই কাঁইপে ওঠে।' স্বেচ্ছাসেবকদের হ্যান্ডমাইকে ঘূর্ণিঝড় 'আসানি'র আগাম সতর্ক সংকেত শুনে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন খুলনার কয়রা উপজেলার মদিনাবাদ গ্রামের তালেব ঢালী। গত দুই বছরে ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও ইয়াসে দু'বার তার ঘর ভেঙেছে। অনেক কষ্টে তা সামাল দিয়ে নতুন করে ঘর তুলে বাঁধের পাশে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন। আবারও ঝড়ের সংকেত শুনে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন তিনি।

কপোতাক্ষ নদ তীরবর্তী মদিনাবাদ গ্রামের বাসিন্দা আব্দুস সামাদ ঢালীসহ অনেকেই গতকাল রোববার সকাল থেকে তাদের বাড়ির পাশের বাঁধে মাটি দিয়ে উঁচু করার চেষ্টা করেন। তিনি জানান, ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের সময়ও বাঁধের এ অংশটি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। সে সময় তারা গ্রামের মানুষ মিলে অনেক পরিশ্রম করে বাঁধটি টিকিয়ে রেখেছিলেন। পরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা সেখানে পরিদর্শন করে মেরামতের আশ্বাস দেন। কিন্তু গত এক বছরেও সেখানে কাজ হয়নি। এবার আরও ঝুঁকিতে রয়েছে বাঁধটি।

শুধু তালেব ঢালী ও আবদুস সামাদ-ই নন; তাদের মতো উপকূলীয় তিন জেলা খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের অসংখ্য মানুষ ঘূর্ণিঝড় 'আসানি' নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। বিশেষ করে জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ নিয়েই তাদের উৎকণ্ঠা বেশি। গত কয়েক বছর ধরে প্রায় প্রতিবছরই এক-দু'বার ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসে দুর্বল বেড়িবাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা লবণ পানিতে প্লাবিত হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) খুলনা সার্কেল সূত্রে জানা যায়, উপকূলীয় তিন জেলার ১ হাজার ৮৫৪ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে ১৫৭ কিলোমিটারের অবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ। ঝড়-জলোচ্ছ্বাস বা উঁচু জোয়ারে এসব বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে খুলনা জেলার ৭১০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে ৩৫ কিলোমিটার, সাতক্ষীরার ৮০৬ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে ১০৪ কিলোমিটার এবং বাগেরহাটের ৩৩৮ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে ১৮ কিলোমিটার ঝুঁকিতে রয়েছে।

পাউবোর খুলনা সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. শফি উদ্দিন সমকালকে বলেন, কিছু কিছু জায়গায় জরুরি ভিত্তিতে বেড়িবাঁধ মেরামত করা হচ্ছে। তবে ঝুঁকিপূর্ণ সব বেড়িবাঁধ দ্রুত মেরামত করা সম্ভব নয়। কারণ তাদের সেই অর্থ বরাদ্দ নেই।

খুলনা আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ আমিরুল আজাদ জানান, এখন পর্যন্ত পূর্বাভাস অনুযায়ী ঘূর্ণিঝড় 'আসানি' ভারতে আঘাত হানবে। তবে এর প্রভাবে খুলনার উপকূলেও কিছুটা ঝড়-বৃষ্টি হতে পারে। তবে 'আসানি' আঘাতের দিক পরিবর্তন করে কিনা, তা এখনই বলা যাচ্ছে না।

কয়রা উপজেলার কপোতাক্ষ ও শাকবাড়িয়া নদী-তীরবর্তী যেসব এলাকায় এখনও টেকসই বেড়িবাঁধ হয়নি, সেসব গ্রামে বসবাসকারী পরিবারগুলোর মাঝে 'আসানি' নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। তাদের অধিকাংশেরই নেই দুর্যোগ সহনীয় বাড়িঘর। ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও ইয়াসে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ২০ হাজার পরিবারের অনেকেই এখনও মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেননি। এর মধ্যে আরেকটি দুর্যোগের সতর্ক সংকেত তাদের ভাবিয়ে তুলেছে।

গতকাল সকালে কয়রা উপজেলার কয়েকটি এলাকা ঘুরে সেখানকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, অন্যান্য দুর্যোগের মতো এবারও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে এলাকাবাসীকে সতর্ক থাকতে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এমন সতর্ক সংকেত শুনে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে আগাম প্রস্তুতি নিতেও দেখা গেছে। যেসব এলাকার বাঁধ অধিক দুর্বল, সেখানকার মানুষ তা মেরামতের চেষ্টা করছেন। গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ারও প্রস্তুতি নিতে দেখা গেছে।

পাউবো সূত্রে জানা যায়, কয়রা উপজেলার ১৪/১ ও ১৩-১৪/২ নম্বর পোল্ডারের মদিনবাদ তহশিল অফিসের পার্শ্ববর্তী বাঁধের প্রায় ৬০০ মিটার ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে। এ ছাড়া দশহালিয়া মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় ৩০০ মিটার, আংটিহারা স্লুইস গেট থেকে পুলিশ ক্যাম্প পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার মিটার, জোড়শিং থেকে বীণাপাণি পর্যন্ত এক হাজার মিটার, ঘাটাখালী এলাকায় ৩০০ মিটার, মঠবাড়ি, তেঁতুলতলার চর, নয়ানি ও শাকবাড়িয়া এলাকায় প্রায় ৩ কিলোমিটার বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে।

পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী মশিউল আবেদীন সমকালকে বলেন, কয়রা উপজেলার দুটি পোল্ডারের প্রায় ২৫ কিলোমিটার বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে নদীতে জোয়ারের উচ্চতা বাড়লে এসব এলাকার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী শামীম হাসনাইন মাহমুদ বলেন, এ মুহূর্তে বাঁধের দুর্বল অংশে মেরামত কাজ চলমান। তা ছাড়া দুর্যোগে বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেখানে তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুতি রয়েছে।

কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অনিমেষ বিশ্বাস জানান, সতর্কতামূলক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রাখা, দুর্যোগকালীন ক্ষতিগ্রস্তদের খাদ্য ও পানীয়ের ব্যবস্থাসহ সামগ্রিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বেচ্ছাসেবক টিম গঠন করা হয়েছে।

খুলনার জেলা প্রশাসক মো. মনিরুজ্জামান তালুকদার জানান, সার্বিক পরিস্থিতি তারা পর্যবেক্ষণ করছেন। একই সঙ্গে দুর্যোগ মোকাবিলারও প্রস্তুতি নিচ্ছেন।