ক্যাম্পাসের সবাই জানতেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) মেধাবী ছাত্রী অঙ্কন বিশ্বাসের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে সাবেক ছাত্র শাকিল আহমেদের। এরই মধ্যে শাকিলের সঙ্গে আরেক তরুণীর 'প্রেমের সম্পর্কে' দূরত্ব সৃষ্টি হয় দু'জনের মধ্যে। শেষ পর্যন্ত ২৪ এপ্রিল অঙ্কন শাকিলের বাসায় গিয়ে বিষপান করেন। এর ১৫ দিন পর গত শনিবার রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় তার।

ঘটনার পর শাকিল পলাতক থাকলেও এখন জানা যাচ্ছে, কেবল প্রেম নয়, বিয়েই করেছিলেন শাকিল-অঙ্কন। কিন্তু এক মাসের মাথায় কেন তাকে জীবন দিতে হলো সে প্রশ্নের উত্তর পাচ্ছেন না অঙ্কনের সহপাঠীরা। তারা বিচার চাইছেন শাকিলের। তবে আতঙ্কে নিশ্চুপ মেয়েটির পরিবার।

নিহত ছাত্রী অঙ্কন বিশ্বাস জবির ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি স্নাতকে প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করেন। পলাতক শাকিল আহমেদ একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক ছাত্র।

অঙ্কন বিশ্বাস জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটির সদস্য এবং ক্যাম্পাসে নামকরা বিতার্কিক ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে একাধিক পুরস্কারও পান তিনি। বিতার্কিক হওয়ার সুবাদে প্রেমে জড়িয়ে পড়েন বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটির সাবেক সভাপতি শাকিলের সঙ্গে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অঙ্কনের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু জানান, ধর্ম বিভেদ ভুলে অঙ্কন শাকিলের সঙ্গে সংসার করতে চেয়েছিলেন। শাকিলের মীরহাজিরবাগের বাসাতেও অঙ্কনের নিয়মিত যাতায়াত ছিল। কিন্তু কয়েক মাস আগে শাকিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য মেয়ের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান। নোটারি পাবলিক করে আদালতে তারা গোপনে বিয়ে করলেও 'অন্য ধর্মের' হওয়ায় অঙ্কনকে ঘরে তুুলতে অস্বীকৃতি জানিয়ে এড়িয়ে চলতে থাকেন তিনি।

ঘটনার দিন সকালে অঙ্কন শাকিলের বাসায় যান। সেখানে তাদের কথাকাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে অঙ্কন বিষপান করে অজ্ঞান হয়ে পড়লে তাকে শাকিল ও তার ছোট ভাই হিমেল পুরান ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে শাকিল কখনও ভাই, কখনও বন্ধু পরিচয়ে ভর্তি করাতে চাইলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অস্বীকৃতি জানায়। পরে স্বামী পরিচয়ে তাকে ভর্তি করান।

অঙ্কনের অপর এক বন্ধু মুকিত চৌধুরী সানী জানান, ২৪ এপ্রিল দুপুর দেড়টার দিকে বেসরকারি আজগর আলী হাসপাতাল থেকে 'অঙ্কন অসুস্থ' বলে তাকে ফোন দেন শাকিল। পরে সেখানে গিয়ে অঙ্কনকে জরুরি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দেখতে পান তিনি। ঘটনা জানতে চাইলে শাকিল প্রথমে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন; পরে দাবি করেন অঙ্কন বাসা থেকে হয়তো কিছু খেয়ে তার বাসায় এসেছিল। কথা বলার এক পর্যায়ে সে অসুস্থ হয়ে পড়েছে।

সানী জানান, পরিস্থিতি দেখে তিনি সেখান থেকে অঙ্কনের পরিবারকে ঘটনা জানান। এরই মধ্যে চিকিৎসকরা বলেন, বিষক্রিয়ায় অঙ্কন হার্ট অ্যাটাক ও পরে ব্রেনস্ট্রোকের শিকার। অঙ্কনের আত্মীয়স্বজন হাসপাতালে গেলে শাকিল পালিয়ে যান।

আজগর আলী হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, শাকিল আহমেদ স্বামী পরিচয়ে অঙ্কন বিশ্বাসকে হাসপাতালে ভর্তি করান। পরে ওই রোগীর বাবা তপন কুমার বিশ্বাস গত ১ মে তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে নিয়ে যান।

গেণ্ডারিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ আবু সাঈদ আল মামুন বলেন, জবি ছাত্রী অঙ্কনকে ভর্তির পর হাসপাতাল থেকে বিষয়টি থানায় জানানো হয়। এরপর আর কেউ যোগাযোগ করেনি। ছাত্রীর পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ দিলে তা আমলে নেওয়া হবে।

অঙ্কন তার বাবা-মা ও ভাইয়ের সঙ্গে পুরান ঢাকার স্বামীবাগ এলাকায় থাকতেন। স্বজনরা তার মরদেহ নিয়ে গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় গেছেন। ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে অঙ্কনের বাবা তপন কুমার বিশ্বাস সমকালকে বলেন, তার মেয়ে সেদিন বাসা থেকে ক্যাম্পাসে যাওয়ার কথা বলে সুস্থ অবস্থায় বের হয়েছিল। এরপর মেয়েকে অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে পান। অনেকে অনেক কথা বললেও তিনি শাকিল নামে কাউকে চেনেন না। বিয়ের বিষয়েও জানতেন না।

মেয়ের মৃত্যু স্বাভাবিক নয় জানিয়ে এই বাবা বলেন, তার আর্থিক বা শারীরিক সক্ষমতা নেই যে বিচার চেয়ে দৌড়াদৌড়ি করবেন। নিজের আরেক সন্তান রয়েছে, ছোট্ট চাকরি রয়েছে। তা নিয়েই থাকতে চান। তবে মেয়ের চিকিৎসায় সহপাঠীরা আর্থিক সহায়তা করায় তিনি কৃতজ্ঞতা জানান।

এ বিষয়ে শা‌কিল আহমেদ সমকালকে বলেন, আমরা বিয়ের পর আলাদা বাসায় থাকতাম। আমার স‌ঙ্গে কো‌নো ঝা‌মেলা ছিল না। কিন্তু নানা কার‌ণে সে ডি‌প্রেশনে ছিল। ওই দিন আমার বাসায় দেখা করতে এসে  অসুস্থ হয়ে পড়লে আ‌মি নিজেই তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। আমার পালানোর প্রশ্নই উঠে না।  অঙ্ক‌নের প‌রিবারের স‌ঙ্গেও আমার সার্বক্ষ‌ণিক যোগা‌যোগ ছিল। আমরা ভালোবেসে দুই মাসও হয়‌নি বিয়ে করেছি। অন‌্য মেয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্কের অ‌ভিযোগ একেবারেই ভি‌ত্তিহীন।

সোমবার রাতে শাকিলের আইনজীবী মিরাজ আকন বিয়ের নোটারি পাবলিকের কাগজ পাঠান গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের কাছে। ওই আইনজীবী অঙ্কনের মৃত্যু নিয়ে কিছু জানেন না বলেও জানান।

এদিকে অঙ্কনের মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছেন তার সহপাঠী ও বিভাগের শিক্ষার্থীরা। এ মৃত্যুকে 'পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড' উল্লেখ করে বিচার দাবি করছেন।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর ড. মোস্তফা কামালের সঙ্গে কথা বললে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে বক্তব্য দেবেন।