'সাত একর জমির মুগডাল শ্যাষ। একটি ডালও ঘরে নেতে পারিনি। ডালগাছ তুলে ক্ষেতেই স্তূপ করা ছিল। বৃষ্টিতে সব ডাল নষ্ট হইয়া গ্যাছে।' গতকাল মঙ্গলবার কথাগুলো বলছিলেন পটুয়াখালীর কলাপাড়ার মাইটভাঙ্গা গ্রামের চাষি সত্তার মোল্লা। আর ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের ত্রিলোচনপুরের কৃষক ওমর ফারুক বললেন, 'দেড় বিঘা জমির কেটে রাখা ধান বৃষ্টির পানিতে ভাসছে।'

ঘূর্ণিঝড় 'আসানি'র প্রভাবে গত সোমবার থেকে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছে প্রায় সারাদেশে। এতে অনেক জেলার কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। সামনে আরও বড় ক্ষতি তাড়া করছে কৃষককে। অবশ্য আবহাওয়াবিদদের ধারণা, সমুদ্রেই বিলীন হয়ে যেতে পারে আসানি। তবে আগামী তিন দিন ভারি বৃষ্টিপাত হবে। আবহাওয়াবিদদের মতে, আজ বুধবার সকালে ঘূর্ণিঝড়টি ভারতের অল্প্রব্দ উপকূলে চলে যাবে। এরপর এটি উপকূল ধরে উত্তর-পূর্বদিকে এগোতে থাকবে। ক্রমেই এই প্রবল ঘূর্ণিঝড় শক্তি হারিয়ে সাধারণ ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হবে এবং পরে তা গভীর নিম্নচাপে পরিণত হবে। এর জেরে বাংলাদেশের উপকূলে প্রবল বৃষ্টি হতে পারে। এতে জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গতকাল সকাল থেকেই ঢাকার আকাশ ছিল মেঘলা। মাঝেমধ্যে হালকা বৃষ্টি ঝরেছে। বেলা ৩টার পর থেকে মেঘের আনাগোনা বেড়ে যায়। সাড়ে ৩টার দিকে চারপাশ অন্ধকার হয়ে যেন সন্ধ্যা নামে রাজধানীতে। এর পর থেকেই চলে তুমুল বৃষ্টি। সোমবার সকাল ৬টা থেকে গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৬টা পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ২০৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে পটুয়াখালীর খেপুপাড়ায়।

গতকাল আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষ বুলেটিনে বলা হয়েছে, পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত প্রবল ঘূর্ণিঝড়টি পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে একই এলাকায় অবস্থান করছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ২ নম্বর দূরবর্তী হুঁশিয়ারি সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।

গতকাল সচিবালয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ঘূর্ণিঝড়টি বাংলাদেশে আঘাত হানার আর কোনো আশঙ্কা নেই।
কানাডার সাসকাচুয়ান ইউনিভার্সিটির আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ সমকালকে বলেন, গত ১২ ঘণ্টায় ঘূর্ণিঝড় আসানি আবারও কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে। এটি আগামীকাল বৃহস্পতিবার গভীর নিম্নচাপে পরিণত হবে। পরবর্তী ছয় ঘণ্টায় আরও দুর্বল হয়ে এটি লঘুচাপে পরিণত হতে পারে। মেঘের কারণে আগামী ১৪ মে সকাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ বাংলাদেশের উপকূলে ভারি বৃষ্টিপাত হবে।

পশ্চিমবঙ্গের আলিপুর আবহাওয়া দপ্তরের অধিকর্তা সঞ্জীব বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, তীব্র ঘূর্ণিঝড় আসানি সন্ধ্যা ৬টায় বিশাখাপত্তনম থেকে ৩০০ কিলোমিটার দক্ষিণ দিকে রয়েছে। রাতে অল্প্রব্দপ্রদেশ উপকূলে পৌঁছেছে। তারপর ধীরে বাঁক নিয়ে এগোতে থাকবে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দুর্বল হয়ে তীব্র ঘূর্ণিঝড় থেকে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হবে। পরে এটি আরও দুর্বল হয়ে যাবে। ফলে পশ্চিমবঙ্গ বা বাংলাদেশের উপকূলে কোনো বিপদের শঙ্কা নেই।

কৃষির বড় ক্ষতি :এপ্রিল-মে দেশের কৃষির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাস। কিছু কিছু এলাকায় বোরোর পাকা ধান এখনও মাঠে। গত মাসেই উজান থেকে আসা ঢলের পানিতে একের পর এক বাঁধ ভেঙে ও উপচে হাওরের বোরো ধান তলিয়ে যায়। এপ্রিল থেকে বৃষ্টিপাতে এমনিতেই ফসলের ক্ষতি হয়েছে, তার ওপর ঘূর্ণিঝড় আসানির প্রভাবে বৃষ্টিতে কৃষকের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ আরও বেড়েছে। পরিমাণের দিক থেকে দেশের সবচেয়ে বেশি ফল পাকে মে মাসে। তরমুজ ও বাঙ্গি পেকে গড়াগড়ি খাচ্ছে। এপ্রিলের শেষ থেকে পাকা আম বাজারে আসবে। এ অবস্থায় দুশ্চিন্তা দানা বাঁধছে কৃষকের ঘরে ঘরে।

বিশেষ করে খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের জেলাগুলোয় আধাপাকা ধানগাছ নুইয়ে পড়েছে। অনেক এলাকায় মাঠে পানি জমে যাওয়ায় আমনের বীজতলাসহ শীতকালীন সবজি ও রবি ফসলের ক্ষতি হয়েছে।
কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, কৃষির এই সংকট নিয়ে তিনি নিজেও উদ্বিগ্ন। বর্তমান পরিস্থিতির কারণে যেসব কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, তাদের পুনর্বাসন ও প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হবে।