গুটি আম নামানো দিয়ে গতকাল শুক্রবার শুরু হয়েছে রাজশাহীর আম নামানোর মৌসুম। আগামী ২০ মে জনপ্রিয় আম গোপালভোগ, ২৮ মে রাজশাহীর বিখ্যাত হিমসাগর বা ক্ষীরশাপাতি, ৬ জুন আমের রাজা ল্যাংড়া আসছে। এবার প্রায় ৮০০ কোটি টাকার আম বিক্রির আশা করা হচ্ছে। চাষিরা জানিয়েছেন, এখনও অধিকাংশ এলাকার গুটি আম পরিপকস্ফ হয়নি। গুটি আম পাকতে অন্তত আরও এক সপ্তাহ লাগবে। অন্যান্য আম পাকতেও নির্ধারিত সময়ের অন্তত এক সপ্তাহ বেশি সময় লাগবে।

গত বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসনের এক সভায় আম নামানোর সম্ভাব্য এই সময় প্রকাশ করা হয়। সভায় ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক শরীফুল হক জানান, ১৩ মে শুক্রবার গুটি আম, গোপালভোগ ২০ মে, লক্ষ্মণভোগ ২৫ মে, রানীপছন্দ ২৫ মে, হিমসাগর ২৮ মে, ল্যাংড়া ৬ জুন, আম্রপালি ও ফজলি ১৫ জুন, আশ্বিনা ও বারি-৪ ১০ জুলাই, গৌড়মতি ১৫ জুলাই ও ইলামতি আম ২০ আগস্টে নামানো যাবে।

রাজশাহীর চারঘাটের ঝিকরা গ্রামের আমচাষি বিপদ বিশ্বাস বলেন, তার বাগানের বেশকিছু গুটি আম পাকা শুরু হয়েছে। সরকার নির্ধারিত সময়েই তিনি আম নামানো শুরু করেছেন। কৃষি বিভাগ তার বাগান থেকে বেশকিছু পাকা আম নমুনা হিসেবে সংগ্রহ করেছে।

বাঘার আমচাষি শফিকুল ইসলাম বলেন, দুই বছর ধরে একই সময় আম নামানোর জন্য নির্ধারণ করা হচ্ছে। এই সময়টা ঠিক আছে। তবে এবার আমের উৎপাদন খুবই কম। রাজশাহীর চাষিরা এবার অপরিপকস্ফ আম নামাবেন না। কারণ এবার বাজারদর ভালো থাকবে আশা করছি।

রাজশাহীর বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণাগারের বাগানের মৌসুমি ক্রেতা প্রদীপ কুমার বলেন, এবার আমের উৎপাদন কম। তবে যেসব আম আছে, তা দেশবাসী খেতে পারবেন। দামটা এবার ভালো পাওয়া যাবে।

৮০০ কোটি টাকার বাণিজ্য হবে: রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোজদার হোসেন বলেন, এবার ৭০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকার আম বিক্রি হবে। তবে এবার সব জিনিসের দামই বেড়েছে। আমের দামও বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে এবার উৎপাদন কিছু কম হলেও ভালো দাম পাবেন চাষিরা। রাজশাহী অঞ্চলের প্রায় সব চাষিরই কিছু আমগাছ রয়েছে। এই আম বিক্রি করে প্রায় সব চাষির ঘরেই কিছু অর্থ আসে। এতে তাঁরা পরিবার নিয়ে কিছুদিন সচ্ছলভাবে সংসার চালাতে পারেন।

তিনি বলেন, এবার ১৮ হাজার ৫১৫ হেক্টর জমিতে আমচাষ হয়েছে। এতে ফলনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ১৭ হাজার টন। তবে এবার কম মুকুল আসায় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলেও কাছাকাছি থাকবে। কারণ এবার কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঝড়, শিলাবৃষ্টি হয়নি। গাছে কম আম থাকায় আকার বড় হয়েছে। বড় গাছে আম কম এলেও ছোট গাছে প্রচুর আম রয়েছে। দেশের মানুষ এবার ভালোভাবেই রাজশাহীর আম খেতে পারবেন।

রাজশাহীর সর্ববৃহৎ হাট বসবে কলেজ মাঠে: এবারও রাজশাহীর সর্ববৃহৎ আমের হাট বসবে পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর কলেজ মাঠে। হাটে জায়গা সংকুলান না হওয়ায় কয়েক বছর ধরে হাটটি বসত রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়কের ওপরে। তবে দুই বছর ধরে রাস্তার যানজট নিরসনে হাটটি বসছে কলেজ মাঠে। পুঠিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুরুল হাই আনাছ বলেন, আমচাষি ও ব্যবসায়ীরা যেন সুষ্ঠুভাবে আম বেচাকেনা করতে পারেন, সে জন্য প্রশাসন তৎপর রয়েছে। বানেশ্বর কলেজ মাঠে এবারও হাটটি বসানো হবে। এজন্য কলেজ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়া হয়েছে।

বন্ধ হচ্ছে না ঢলনপ্রথা: ৪০ কেজিতে মণ হলেও রাজশাহীর অঞ্চলের আমের মণ ধরা হয় ৪৮ থেকে ৫২ কেজিতে। এতে লোকসানের শিকার হন চাষিরা। গত বছর পুঠিয়া উপজেলা প্রশাসন এই ঢলনপ্রথা বন্ধের জন্য তৎপর হলেও ব্যর্থ হয়। পুঠিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুরুল হাই আনাছ বলেন, একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কাছে চাষিরা জিম্মি। ৪০ কেজিতে মণ হলেও চাষিদের ৮ থেকে ১০ কেজি বেশি আম নিয়ে নেয় মধ্যস্বত্বভোগীরা। গত বছর বানেশ্বর হাটে ঢলনপ্রথা বন্ধের চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু স্থানীয়ভাবে এটি বন্ধ করা সম্ভব নয়। এটি বন্ধ করতে হলে সম্মিলিতভাবে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। নইলে চাষিদের শোষণ বন্ধ হবে না।

কেমিক্যাল ব্যবহাররোধে কঠোর থাকবে প্রশাসন: রাজশাহীর ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক শরিফুল হক বলেন, বরাবরই প্রশাসন কেমিক্যাল ব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে থাকে। এবারও এর ব্যতিক্রম হবে না। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা তৎপর থাকবেন। আমে কেমিক্যাল ব্যবহার হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কেমিক্যাল বন্ধের জন্যই মূলত আম নামানোর সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। যেন অপরিপকস্ফ আম নামানো থেকে চাষিরা বিরত থাকেন।

তবে চাষিরা বলছেন, তাঁরা কেউই আমে কেমিক্যাল ব্যবহার করেন না। তাঁরা বাগান থেকে আম নামিয়ে হাটে এনে বিক্রি করেন। কেমিক্যাল ব্যবহারের কোনো প্রয়োজন চাষির হয় না।