দেশের কৃষকদের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে সরকার ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ ঘোষণার পর থেকেই বেড়েছে পেঁয়াজের ঝাঁজ। দেশের ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে হুহু করেই বাড়ছে পণ্যটির দাম। কয়েকদিনের ব্যবধানে খাতুনগঞ্জে 'হাফ সেঞ্চুরি' করার অপেক্ষায় রয়েছে পেঁয়াজ। হঠাৎ করে দাম এত বেশি বাড়ার পেছনে সিন্ডিকেটের কারসাজিকে দায়ী করছেন ক্যাবসহ সংশ্নিষ্টরা। তবে ভিন্ন কথা বলছেন খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা। তাঁদের মতে, বিভিন্ন স্থলবন্দরের আমদানিকারকরা পেঁয়াজ মজুত করে কারসাজি করতে পারে। বিগত কয়েক বছর পেঁয়াজের অনেক বেশি দাম বাড়ার পেছনের কারণ খুঁজতে গিয়ে খাতুনগঞ্জ ও স্থলবন্দরের বেশকিছু প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকের জড়িত থাকার প্রমাণ পায় খোদ প্রশাসন।

সংকট নাকি কারসাজি- এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. জাহাঙ্গীর আলম সমকালকে বলেন, 'খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজ নিয়ে কারসাজি করার কোনো সুযোগ নেই। কেননা এখানে পেঁয়াজ মজুতের কোনো ব্যবস্থা নেই। তবে দেশের বিভিন্ন স্থলবন্দরে পেঁয়াজের সংরক্ষণাগার থাকায় সেখানকার কিছু আমদানিকারক পেঁয়াজ মজুত করে সিন্ডিকেট করে কারসাজি করার সুযোগ পান। কয়েক পয়সা কিংবা দুই-এক টাকা লাভে এখানকার ব্যবসায়ীরা কমিশন ভিত্তিতে ব্যবসা করেন। খাতুনগঞ্জের পেঁয়াজের বাজার পুরোপুরি ভারতনির্ভর। সরকার ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ ঘোষণা করার পর থেকেই খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজের সরবরাহের স্বাভাবিক গতি অনেক কমে গেছে। গত কয়েকদিন ধরেই চাহিদার মাত্র এক অংশ পেঁয়াজ পাচ্ছেন এখানকার ব্যবসায়ীরা।'

তবে ভিন্ন কথা বললেন ক্যাবের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে সমকালকে বলেন, 'অসাধু ব্যবসায়ীরা সবসময় সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ করে দিলেই রাতারাতি দাম বেড়ে যায় দেশের বাজারে। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, ভারত থেকে এতদিন যেসব পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছিল সেগুলো কোথায় গেল? কিছু ব্যবসায়ী-আমদানিকারক সুযোগকে পুঁজি করে বাজারে সংকট দেখিয়ে বাড়তি মুনাফা লাভের অপচেষ্টা করছেন। এরই অংশ হিসেবে কয়েকদিনের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম অনেক বেড়েছে। এটি পরিকল্পিত কারসাজি ছাড়া আর কিছুই নয়।'

দাম বাড়ার পেছনে কারসাজির প্রমাণ মিলেছে বহুবার: ভারত সরকার ২০১৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর পেঁয়াজের রপ্তানিমূল্য ৮৫০ ডলার বেঁধে দেয়। এর পর থেকে বাজারে শুরু হয় অস্থিরতা। ২৯ সেপ্টেম্বর একেবারে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ ঘোষণার পর কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম পার করে সেঞ্চুরি। দাম ঠেকে ১১০ থেকে ১২০ টাকায়। বাজার নিয়ন্ত্রণে দিশেহারা হয়ে পড়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসন। এক পর্যায়ে মাঠে নামতে বাধ্য হন জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ টিম। সেবার পেঁয়াজের কারসাজিতে জড়িত চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের ১৩ জনের সম্পৃক্ততা থাকার প্রমাণ পায় জেলা প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থা। এসব আমদানিকারকের যোগসাজশে পেঁয়াজের বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিরা। এদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের কাছে চিঠিও দেয় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন।

পেঁয়াজের আকাশচুম্বী দামের কারণ খুঁজতে গিয়ে গত কয়েক বছর খাতুনগঞ্জে কারসাজির অহরহ প্রমাণ পায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি সংস্থা। খাতুনগঞ্জে একাধিক অভিযান পরিচালনা করা চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বর্তমানে এনডিসির দায়িত্বে থাকা মো. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, পেঁয়াজের দাম বাড়ার কারণ খুঁজতে গিয়ে একাধিকবার খাতুনগঞ্জে অভিযান চালিয়ে ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের কারসাজি ও জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছি। তার পরও তাঁরা সুযোগ পেলেই কারসাজি করে বাড়তি মুনাফা লাভের অপচেষ্টা করেন।

আরেক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উমর ফারুক বলেন, বিভিন্ন স্থলবন্দর থেকে খাতুনগঞ্জের পেঁয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে কিছু আমদানিকারক। আমদানিকারকের এক ফোনেই দাম ওঠানামার অনেক তথ্য প্রমাণ অতীতে পেয়েছি আমরা। তাদের ফোনের মাধ্যমে দাম নির্ধারণ করে খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা।

খাতুনগঞ্জে প্রধানত হিলি স্থলবন্দর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনা মসজিদ ও ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য আসে। এসব বন্দর দিয়ে পণ্য আসার সময় তার দাম নির্ধারণ করে দেয় সেখানকার কিছু আমদানিকারক। আমদানিকারকরা প্রথমে বাড়তি দাম বেঁধে দেয়। পরে খাতুনগঞ্জের কিছু ব্যবসায়ী ও আড়তদার এর সঙ্গে যোগ করেন আরও কয়েক টাকা। এভাবে খাতুনগঞ্জে আসতে আসতে কয়েক হাত বদল হয়ে দাম বেড়ে যায় কয়েকগুণ।

কমিশনের ভিত্তিতে খাতুনগঞ্জে ব্যবসা করা এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমকালকে বলেন, স্থলবন্দরের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ও আমদানিকারকরাই মূলত কারসাজির সঙ্গে বেশি জড়িত। বাড়তি মুনাফা আদায় করতে তারা ইচ্ছামতো দাম নির্ধারণ করে দেয় খাতুনগঞ্জের আড়তদারদের। তাদের কাছে অনেকেই একপ্রকার জিম্মি। আরেক ব্যবসায়ী জাহেদ ইকবাল সমকালকে বলেন, আমদানি বন্ধ থাকলেও আগে কেনা অনেক পেঁয়াজ বিভিন্ন স্থলবন্দরে আটকে আছে। সেগুলো দ্রুত খালাস করে বাজারে আনা গেলে সরবরাহ কিছুটা হলেও বাড়বে।