কুমিল্লা (দক্ষিণ) জেলা বিএনপির যুগ্মসাধারণ সম্পাদক ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের (কুসিক) দুইবারের মেয়র মনিরুল হক সাক্কু 'স্বতন্ত্র' প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করলে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হবে- এমন খবর ইতোমধ্যে গণমাধ্যমে এসেছে। কিন্তু বহিষ্কারের এমন 'হুমকি' পাত্তা দিচ্ছেন না সাক্কু। উল্টো তিনি বলছেন, 'প্রধানমন্ত্রী আমাকে নগরীর উন্নয়নে অনেক টাকা দিয়েছেন। তবে কাজই শুরু করতে পারিনি। ২৭টি ওয়ার্ডের লোকজন, দলীয় নেতাকর্মী, সমর্থক ও লাখো মানুষ চায় আমি নির্বাচনী লড়াইয়ে থাকি। তাই অবশ্যই নির্বাচন করব।' আগামী ১৭ মে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিনে তিনি রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র দাখিল করবেন বলে গতকাল শনিবার বিকেলে সমকালকে নিশ্চিত করেছেন। অপরদিকে কুসিকে নৌকার মনোনয়ন পেয়েছেন সদর আসনের এমপি হাজী আ ক ম বাহাউদ্দিনের অনুসারী মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আরফানুল হক রিফাত। তিনি মহানগরীতে বিরাজমান দলীয় কোন্দল নিরসন ও নৌকার মনোনয়নপ্রত্যাশী অপর ১৩ জনকে নিয়ে প্রচার চালিয়ে নৌকার বিজয় নিশ্চিত করতে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

২০১২ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত কুসিকের প্রথম নির্বাচনে বিএনপি থেকে পদত্যাগ করে নাগরিক কমিটির ব্যানারে নির্বাচন করে নৌকার প্রার্থী অধ্যক্ষ আফজল খানকে হারিয়ে প্রথম মেয়র নির্বাচিত হন মনিরুল হক সাক্কু। ২০১৭ সালের ৩০ মার্চ বিএনপির মনোনয়নে সাক্কু নৌকার প্রার্থী আঞ্জুম সুলতানা সীমাকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো কুসিকের মেয়র হন। কিন্তু এবার কুসিকের তৃতীয় নির্বাচনে নৌকার মনোনয়ন পেয়েছেন এমপি বাহারের অনুসারী আরফানুল হক রিফাত। মহানগরীতে এমপি বাহার ও মেয়র সাক্কুর 'ঘনিষ্ঠতা' রয়েছে। তাই রিফাতের নৌকার মনোনয়ন লাভের খবরে সাক্কু নির্বাচনী মাঠে থাকছেন না এমন খবর চাউর হতে শুরু করে। যদিও শুক্রবার রাত থেকে সাক্কুর অনুসারীরা ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁর নির্বাচনী মাঠে থাকা, প্রার্থী হওয়া ও বিজয়ের বিষয়ে আশাবাদী বলে প্রচার চালান। অপরদিকে মনোনয়নপত্র দাখিল করলে তিনি বিএনপি থেকে বহিস্কৃত হবেন এমন প্রচারও চলছে জোরেশোরে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের কয়েকজন প্রবীণ নেতা বলেন, নির্বাচনী মাঠে সাক্কুর মতো একজন হেভিওয়েট প্রার্থীকে পরাজিত করে নৌকাকে তীরে ভেড়াতে এমপি বাহার ও রিফাতকে অনেক ঘাম ঝরাতে হবে। তবে গতকাল বিকেলে নৌকার প্রার্থী রিফাত সমকালকে বলেন, যারা নৌকার মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন সবাইকে নিয়ে কাজ করব। তারা যেন নৌকার প্রচারে অংশ নেয় সেই আহ্বানও জানাব। তিনি বলেন, কোন্দল ও মান-অভিমান ভুলে আশা করি সবাই নৌকার বিজয়ের জন্য কাজ করবে। নৌকার মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সংরক্ষিত আসনের এমপি ও প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা অধ্যক্ষ আফজল খানের মেয়ে আঞ্জুম সুলতানা সীমা। সদর আসনের এমপির সঙ্গে তাদের পরিবারের রাজনৈতিক বিরোধ দীর্ঘদিনের। তাই নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়ে সীমা সমকালকে বলেন, নেত্রী এ মনোনয়ন দিয়েছেন। আমরা নেত্রীর সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারি না, যাবও না। তাই নৌকার বাইরে গিয়ে অন্য কাউকে সমর্থন করার প্রশ্ন আসবে কেন?

দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে মনিরুল হক সমকালকে বলেন, আমি দুইবারের নির্বাচিত মেয়র। ২৭টি ওয়ার্ডে আমার অনেক নেতাকর্মী, সমর্থক রয়েছে। এ ছাড়া লাখো মানুষ আমাকে ভালোবাসে। তারা চায় আমি নির্বাচন করি। নগরীর অনেক সমস্যার সমাধান এখনও করতে পারিনি। তাই নির্বাচিত হয়ে এসব সমস্যা সমাধান করতে চাই। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ কেন- এমন প্রশ্নে সাক্কু বলেন, সিটি নির্বাচন স্থানীয় সরকারের নির্বাচন। এটা তো জাতীয় নির্বাচন নয়, এখানে স্বতন্ত্র প্রতীকে আমি নির্বাচন করতেই পারি। এর আগেও আমাকে কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্যের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এখন যদি জেলা বিএনপি থেকেও বহিষ্কার করে তাহলে কী করব, আমার তো কিছুই করার নেই। সুষ্ঠু নির্বাচনের বিষয়ে তিনি বলেন, নতুন নির্বাচন কমিশন তো সুষ্ঠু নির্বাচনের বিষয়ে কঠোর বার্তা দিচ্ছে। নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হলে আমিই বিজয়ী হবো। এদিকে সাক্কু ছাড়াও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতে যাচ্ছেন জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি নিজাম উদ্দিন কায়সার। তিনি দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাজী আমিন উর রশিদ ইয়াছিনের শ্যালক। নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে কায়সার জানান, তাঁর অনুসারী নেতাকর্মীদের অনুরোধে তিনি প্রার্থী হতে যাচ্ছেন। ১৭ মে মনোনয়নপত্র দাখিল করবেন।

জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাজী আমিন উর রশিদ ইয়াছিন বলেন, এ সরকারের অধীনে আমরা কোনো নির্বাচনেই যাচ্ছি না। কেউ দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে অংশ নিলে বিষয়টি দলের হাইকমান্ড থেকেই সিদ্ধান্ত আসবে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সমকালকে বলেন, এই সরকারের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে না। এটা দলের নীতিগত সিদ্ধান্ত। এটার কোনো পরিবর্তন হবে না। বিএনপির কোনো নেতাকর্মী এই নির্বাচনে স্বতন্ত্রভাবেও অংশ নিতে পারবে না।

কুসিকের দায়িত্ব পাচ্ছেন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা: কুসিক মেয়র মনিরুল হক সাক্কুর নেতৃত্বাধীন বর্তমান পরিষদের মেয়াদ শেষ হচ্ছে ১৬ মে। এ বিষয়ে এক অফিস আদেশ জারি করেছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ, সিটি করপোরেশন-১ শাখা। গত ১১ মে এ অফিস আদেশ জারি করা হয়। উপসচিব মোহাম্মদ শামছুল ইসলাম স্বাক্ষরিত আদেশে বলা হয়, 'স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) (সংশোধন) আইন, ২০০৯ এর ধারা ৬ অনুযায়ী কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের বর্তমান পরিষদের মেয়াদ আগামী ১৬ মে-২০২২ তারিখে উত্তীর্ণ হবে। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ইতোমধ্যে উক্ত সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) (সংশোধন) আইন, ২০১১ এবং স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) (সংশোধন) আইন, ২০১২ এর ধারা ২৫ অনুযায়ী নির্বাচিত মেয়র কর্তৃক দায়িত্ব গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত সিটি করপোরেশনের সকল প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, কুমিল্লা সিটি করপোরেশনকে অর্পণ করা হলো। এ আদেশ আগামী ১৭ মে ২০২২ হতে কার্যকর হবে।'