চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি বালুর মাঠ এখন সবুজ ঘাসে ভরপুর। মাঠের উত্তরে খালি জায়গায় তৈরি করা হয়েছে ঐতিহাসিক তথ্যসমৃদ্ধ মঞ্চ। সেই মঞ্চের নাম ছয় দফা মুক্তমঞ্চ। ১ হাজার ২৫০ বর্গফুটের দেয়ালে ১৮টি টেরাকোটার ম্যুরালে মহান মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন, গণঅভ্যুত্থান, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বাঙালির গৌরবের টুকরো টুকরো ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। পূর্ব পাশের পরিত্যক্ত আবর্জনার স্থানটি এখন শিশুদের মিনি পার্ক। দোলনা, রাইডসহ বহু কিছু রয়েছে সেখানে। মাঠের চার পাশে হাঁটার জন্য উন্নত ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। বসার জন্য রয়েছে টাইলস দিয়ে বানানো বেঞ্চ। মাঠে প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য দৃষ্টিনন্দন দুটি গেট। ঐতিহাসিক লালদীঘির মাঠ ঘিরে বাঙালির মুক্তি ও সংগ্রামের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে জীবন্ত তুলে ধরার পাশাপাশি প্রকৃতির সজীব অবয়ব দিয়ে ভিন্নভাবে সাজিয়ে তোলা হয়েছে। মাঠটিকে নয়নাভিরাম করতে রাতে সোলার প্যানেলের আলোকসজ্জার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

ইতিহাস জীবন্ত থাকে মানুষের স্মৃতিতে। গৌরবের ইতিহাস প্রজন্মের পর প্রজন্ম পর্যন্ত সজীব ও স্মরণীয় করার মূল্যবান দায়িত্বটি পালন করেছে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর। ছয় দফার স্মৃতিবিজড়িত মাঠটিকে নতুন করে সাজানোর পরিকল্পনা করেন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। শিগগির মাঠটি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

চট্টগ্রামের কোতোয়ালি আসনের সংসদ সদস্য শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন, দৃষ্টিনন্দনভাবে লালদীঘির মাঠের উন্নয়ন হয়েছে। সংস্কার কাজ শেষ করে প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনা নিয়ে শিগগির মাঠটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। এখানে আবার রাজনৈতিক কার্যক্রম হবে, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম হবে, খেলাধুলা হবে। মাঠে হাঁটার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এখানে একটি স্থায়ী ছয় দফার মুক্তমঞ্চও করে দেওয়া হয়েছে। এই মঞ্চে আমরা সব ধরনের অনুষ্ঠান, সভা-সমাবেশ করতে পারব।

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী জালাল উদ্দিন চৌধুরী বলেন, বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার জনসভার স্মৃতি ধরে রাখতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এতে ৫০ ফুট দৈর্ঘ্য এবং ২৫ ফুট প্রস্থের একটি ছয় দফা মুক্তমঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। মাঠের দীর্ঘ দেয়ালজুড়ে টেরাকোটার ম্যুরালে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনসহ বাঙালির গর্বের সব আন্দোলনের নানা ঘটনার সচিত্র ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর 'নগরীর লালদীঘি মাঠ সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধন' প্রকল্পের আওতায় প্রায় আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে নান্দনিক রূপে সাজিয়ে তোলা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের শহীদ স্মৃতি পাঠাগার চট্টগ্রামের  বিভাগীয় সভাপতি শওকত বাঙালি বলেন, লালদীঘির মাঠে ছয় দফার মুক্তমঞ্চ বাংলাদেশে এটিই প্রথম। উন্মুক্ত হলে লালদীঘি মাঠে গিয়ে নতুন প্রজন্মের একজন যুবক এক পলকেই বাঙালির অতীত ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবেন। বাঙালির মুক্তি ও সংগ্রামের ইতিহাস জীবন্ত করে তুলে ধরার কাজটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ।

মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয়ের মালিকানাধীন চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী লালদীঘি মাঠটি আড়াইশ বছর আগে ১৭৬১ সালে যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চট্টগ্রামের শাসনভার গ্রহণ করে মূলত তখন থেকেই আন্দোলন সংগ্রামের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহূত হয়ে আসছে। লালদীঘি মাঠের সঙ্গে ব্রিটিশ থেকে মুক্তিযুদ্ধের আন্দোলন-সংগ্রাম ও ইতিহাস-ঐতিহ্য যুক্ত। ১৯৬৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি লালদীঘি ময়দানের জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের স্বাধীনতার মূল মন্ত্র, বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ ঐতিহাসিক ছয় দফা ঘোষণা করেন।

প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই লালদীঘি মাঠ। তাই শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর মাঠটিকে ইতিহাস সমৃদ্ধ করে সাজিয়ে তুলেছে। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের চিত্র, পাকিস্তানি বাহিনীর অস্ত্র জমা দেওয়ার ছবি, মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের চিত্র, গণঅভ্যুথানের চিত্রসহ প্রতিটি গণআন্দোলনের চিত্র ম্যুরালে দেয়ালে শোভা পাচ্ছে। বিশাল মুক্তমঞ্চ ছাড়াও লালদীঘির চারপাশে সবুজ গাছ ও পুরো মাঠে সবুজ ঘাসে সাজিয়ে তোলা হয়েছে। দুটি ২০ ফুট প্রস্থের গেট, একটি ভিআইপি ফটক তৈরি করা হয়েছে। মাঠের চারদিকে ৩৪৮ মিটার দৈর্ঘ্যের ওয়াকওয়ের পাশে কিছু দূর পরপর একটি বেঞ্চ বসানো হয়েছে। মাঠ ঘিরে এরকম ৩৯টি বেঞ্চ রয়েছে। টাইলস বসানো প্রতিটি বেঞ্চে পাঁচজন মানুষ বসতে পারবেন।