প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম শুরু হলেই সিলেটের পাহাড়-টিলাকে কেন্দ্র করে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের মধ্যে বাড়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। অতি বর্ষণে টিলা ও পাহাড় ধসে প্রাণহানি হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বৃষ্টি মৌসুম শুরুর পর গত শনিবার সিলেটের গোলাপগঞ্জে টিলা ধসে মারা গেছেন এক এনজিও কর্মী। এ নিয়ে গত ১০ বছরে মারা গেছেন অন্তত ১৭ জন। অথচ বছরের পর বছর ধরে সিলেটের প্রায় ৪শ পাহাড়-টিলাকে ঘিরে ১০ সহস্রাধিক পরিবার বসবাস করে এলেও তাদের সরিয়ে নেওয়া হয় না। কিংবা সরতে চান না বসবাসকারীরাও। শুধু ধস শুরু হলে নির্দেশনা ও মাইকিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে প্রশাসনের কার্যক্রম। গত শনিবার টিলা ধসে মৃত্যুর পর সিলেটের বিভিন্ন স্থানে সতর্কতামূলক মাইকিং করেছে প্রশাসন। পাশাপাশি গোলাপগঞ্জে নিহতের পরিবারকে ১০ হাজার টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছে।

সিলেট নগরী ও সদর উপজেলাসহ জেলার গোলাপগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ, জৈন্তাপুর ও গোয়াইনঘাট উপজেলায় প্রায় ৪শ পাহাড়-টিলা রয়েছে। যদিও এ-সংক্রান্ত কোনো পরিসংখ্যান জেলা প্রশাসনের কাছে নেই। কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) সিলেট নগরী ও বিভিন্ন উপজেলায় টিলার একটি পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। বেলার সিলেটের বিভাগীয় সমন্বয়ক শাহ শাহেদা আখতার জানান, নগরী ও সিলেট সদর উপজেলায় ২শ টিলা রয়েছে। বিভিন্ন উপজেলায় আরও দুইশর ওপরে টিলা আছে। এসব টিলার মধ্যে অনেক টিলাই সম্পূর্ণ এবং অধিকাংশ টিলা অর্ধেক ও আংশিকভাবে কেটে ফেলা হয়েছে। টিলা কেটে ফেলার কারণে ও কাটা অব্যাহত থাকায় দিনদিন ঝুঁকি বাড়ছে।

বেলা ও বিভিন্ন মাধ্যমের তথ্যমতে, সিলেট নগরী ও উপকণ্ঠের ব্রাহ্মণশাসন টিলা, মজুমদার টিলা, মুক্তিযোদ্ধা টিলা, জাহাঙ্গীরনগর টিলাসহ আশপাশের দুসকি, নালিয়া, ভাটা, তারাপুর চা বাগান, বালুচর, শাহপরান ও খাদিমপাড়া এলাকায় দুইশর মতো টিলা রয়েছে। এসব টিলায় কম হলেও ৮-৯ হাজার লোক বসবাস করছে। চূড়াসহ টিলার বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে গত ১৫-২০ বছর ধরে লোকজন সেখানে বাস করে আসছে। দিন দিন তাদের সংখ্যা বাড়ছেই। বালুচর, ব্রাহ্মণশাসন ও জাহাঙ্গীরনগর টিলা পরিদর্শনকালে দেখা যায়, অনেক টিলাই ৬০ থেকে ৭০ ফুট উঁচু। এসব টিলায় বসবাসকারীদের অধিকাংশই স্বল্প আয়ের মানুষ। কেউবা টিলার জায়গা কিনে আবার কেউ ভাড়া হিসেবে বসবাস করছেন।

যদিও টিলা বা পাহাড় ইজারা ও বিক্রির কোনো বিধান নেই। স্থানীয় প্রভাবশালীরা অনেক টিলার মালিকানা ও দখল দাবি করে মাটি বিক্রি এমনকি জায়গাও বিক্রি করে আসছে। টিলাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ওইসব বাড়ির মধ্যে অধিকাংশই কাঁচা ও খুপরি ঘর। মাঝেমধ্যে আধাপাকা বাড়িও রয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর টিলার ওপর বসবাসকারী সুনামগঞ্জের বাসিন্দা আলী হোসেন জানান, তিনি সেখানে ২০ হাজার টাকায় জায়গা কিনে ১০ বছর ধরে বাস করছেন। টিলার মালিক কে তা জানাতে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন।

নগরী ও উপকণ্ঠ ছাড়াও গোলাপগঞ্জ, জৈন্তাপুর ও গোয়াইনঘাট উপজেলায় ২ হাজারের মতো পরিবার ঝুঁকি নিয়েই বসবাস করছে। এর মধ্যে গোলাপগঞ্জের ধারাবহর, শিলঘাট, নালিউড়ী, খানিশাইল, ফুলশাইন ও চক্রবর্তীপাড়ার টিলাতে প্রায় একশ পরিবার বাস করছে। এর মধ্যে শনিবার ভোররাতে টিলা ধসে মারা যান চক্রবর্ত্তীপাড়া গ্রামের নকুল রুদ্র পালের ছেলে এনজিওকর্মী অপূর্ব পাল। আহত হন তার পরিবারের আরও চারজন।

সিলেট সদরের খাদিমপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান আফছর আহমদ জানিয়েছেন, প্রতিবছরই ঝুঁকি নিয়ে বসবাসকারীদের নিরাপদে সরে যাওয়ার জন্য বলা হয়। অনেক সময় মাইকিংও করা হয়। কিন্তু কেউ টিলা ছাড়তে চায় না। পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেট বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ এমরান হোসেন বলেন, ঝুঁকি নিয়ে টিলা বা টিলার পাদদেশে বসবাসের বিষয়টি জেলা ও উপজেলা প্রশাসন দেখে। আমরা প্রতিবছরই টিলাকাটার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করি।

সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. মজিবর রহমান জানিয়েছেন, যারা ঝুঁকিপূর্ণভাবে টিলা বা টিলার পাদদেশে বসবাস করছেন তাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। এ জন্য মাইকিং করা হচ্ছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদেরও সে বিষয়ে বলা হয়েছে। তিনি ঝুঁকিপূর্ণ টিলাগুলো পরিদর্শন করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান।