টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেটের নদ-নদীগুলোর পানি বেড়েই চলেছে। প্রধান দুই নদী সুরমা ও কুশিয়ারায় প্রায় সবক'টি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে ভাঙন দেখা দিয়েছে। নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। তলিয়ে গেছে ফসলি জমি, হুমকিতে রয়েছে মৎস্য খামার।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, গতকাল রোববার সুরমার পানি কানাইঘাট পয়েন্টে বিপৎসীমার ১ দশমিক ২২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। সিলেট পয়েন্টে পানি বেড়ে হয়েছে ১০ দশমিক ৬২ সেন্টিমিটার। কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমার ৯৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল আমলশিদ পয়েন্টে। গোয়াইনঘাটের সারি নদীর পানিও বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

এ অবস্থায় গতকাল নগরীর বর্ধিত অংশে জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি পরিদর্শন করেছেন সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) ভারপ্রাপ্ত মেয়র তৌফিক বক্স লিপন। এ সময় মেয়র বলেন, বিভিন্ন জায়গায় পানি স্বাভাবিক চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। এগুলো চিহ্নিত করে পানি চলাচলে সুযোগ করে দিতে হবে। এ ছাড়া সিসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিধায়ক রায় চৌধুরীও সুরমা নদীর ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করেছেন।

জকিগঞ্জে সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় তলিয়ে গেছে প্রধান ডাকঘর, প্রাণিসম্পদ অফিস, স্থল শুল্ক্ক স্টেশন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাস্তাঘাট। বারহাল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোস্তাক আহমদ জানান, সুরমার ডাইক ভেঙে তলিয়ে গেছে প্রায় এক হাজার হেক্টর বোরো ধান। কয়েকটি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

ইউএনও পল্লব হোম দাস বলেন, বর্ষণ অব্যাহত থাকলে জকিগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে। উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

বিয়ানীবাজার উপজেলার চারখাই ইউনিয়নের ছয়টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন হাজারো মানুষ। গতকাল রোববার সুরমা নদীর বাঁধ ভেঙে এবং কয়েকটি স্থানে ডাইকের ওপর দিয়ে পানি ঢুকে এসব এলাকা প্লাবিত হয়। বাড়িঘর, পুকুর ও চলাচলের রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। বিয়ানীবাজারের ইউএনও আশিক নূর গতকাল বিকেলে প্লাবিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। ইউএনও বলেন, নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে দুর্গত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করা হবে।

এদিকে সুনামগঞ্জের ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলায় সুরমা, চেলা ও ইছামতী নদীর পানি বাড়ছে। এতে কয়েকটি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বন্যার পানি উঠছে। হুমকির মুখে রয়েছে স্থানীয় অর্ধশতাধিক মৎস্য খামার। এ ছাড়া দোয়ারাবাজারের দক্ষিণ বড়বন গ্রামের একটি বাঁধ ভেঙে ভেসে গেছে ১১টি বসতঘর। এসব পরিবারের সদস্যরা খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছেন।

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের কেওলার হাওরসহ নিম্নাঞ্চল তলিয়ে যাওয়ায় ধানক্ষেতের ক্ষতি হয়েছে। কৃষকরা পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধান কেটে ঘরে তোলার চেষ্টা করছেন। কৃষি কর্মকর্তা জনি খান বলেন, বৃষ্টি ও ঢলে কিছু এলাকায় বোরো ধানের ক্ষেত আংশিক নিমজ্জিত হলেও দ্রুত পানি নেমে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে বাদামচাষিরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। পানিতে বাদামগাছ নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক এলাকার বাদাম ক্ষেতের ওপর দিয়ে ঢলের পানি প্রবাহিত হচ্ছে। কৃষি অফিস জানিয়েছে, তাহিরপুরে প্রায় এক হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে বাদাম চাষ হয়েছে। এর বিরাট অংশ বাদাম পানিতে নষ্ট হয়েছে।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসের উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন, কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা নির্ণয় করতে কৃষি অফিস কাজ করছে। কৃষি কর্মকর্তা হাসান-উদ-দৌলা বলেন, মেঘালয়ে প্রচুর বৃষ্টিপাতের কারণে পাহাড়ি ঢল নেমে এসে এই ক্ষতি হয়েছে।