ফরিদপুরের চরভদ্রাসনের চরাঞ্চলে সরকারি জমি দখল নিতে ভূমিহীন কৃষকদের নানা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। 

অভিযোগ উঠেছে, চর দখলদারদের অভিযোগ যাচাইবাছাই না করেই পুলিশ অসহায় কৃষকদের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করছে।

সম্প্রতি হাজিরা দিতে ফরিদপুর আদালতে থাকার সময় পদ্মা নদীর এক দুর্গম চরে মারামারি মামলার আসামি করা হয়েছে আজিজ খাঁ (৪৫) নামে এক ভূমিহীন কৃষককে। 

অভিযুক্ত আজিজ খাঁ (৪৫) চরভদ্রাসন উপজেলার চরশালেপুরের প্রয়াত সুরমান খাঁর ছেলে।

জানা যায়, গত ৬ মার্চ সকাল ১০টায় ফরিদপুরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট-২-এর আদালতে একটি মামলায় হাজিরা দিতে হাজির হন আজিজ খাঁ। 

শুকনো মৌসুমে দুর্গম চরশালেপুর হতে ফরিদপুরের আদালতে আসতে এক ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে। আবার আদালতে হাজিরা দিয়ে বাড়িতে ফিরতে তার দুপুর গড়িয়ে যায়।

আজিজ খাঁ যেদিন ফরিদপুর আদালতে হাজিরা দিতে বিচারকের কাঠগড়ায়, ঠিক সেদিনই বেলা সাড়ে ১১টায় চরশালেপুর গ্রামে একটি মারামারিতে অংশ নেওয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। 

এর সাতদিন পর ১৩ মার্চ চরভদ্রাসন থানায় মামলাটি রেকর্ড করা হয়। উপজেলার শালেপুর গ্রামের প্রয়াত সেরজান খানের ছেলে মোনায়েম খান (৬০) এ মামলার বাদী।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা চরভদ্রাসন থানার এসআই অমিয় মজুমদার তদন্ত শেষে ২১ এপ্রিল আদালতে চার্জশিট জমা দেন। চার্জশিটে আজিজ খাঁর বিরুদ্ধে পেনাল কোডের ১৪৩ ধারায় বেআইনি সমাবেশ, ৪৪৭ ধারার অপরাধে অনুপ্রবেশ, ৩২৩ ধারার স্বেচ্ছাকৃত আঘাত, ৪২৭ ধারার সম্পদের অনিষ্টসাধন ও ৫০৬ ধারার অপরাধজনক ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ উত্থাপিত হয়।

এ ব্যাপারে আজিজ খাঁ সমকালকে বলেন, ‘আমার মতো আরও অনেক ভূমিহীন কৃষককে মামলার আসামি করা হচ্ছে। সরকারিভাবে চরের জমি আমরা দখল পাওয়ার পর থেকে আমাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে হামলা ও মামলা করা হচ্ছে। ফসল কেটে নেওয়া হচ্ছে। একের পর এক মিথ্যা মামলা দায়ের করা হচ্ছে।’

গত ৬ মার্চ আজিজ খাঁদের বিরুদ্ধে তেমন একটি মামলা খারিজ করে দেন আদালত।

আজিজ খাঁ বলেন, ‘আমি যখন আদালতে হাজিরা দিচ্ছি, তখন আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আসে আমি নাকি মারামারি করছি চরে। ১১ মে আমার নামে নতুন করে মামলা হয়।’

চরশালেপুর গ্রামের আব্দুস সালাম খান বলেন, ‘২০১৭ সালে ভূমিহীনদের বন্দোবস্ত দেওয়ার পর থেকেই ওই জমির দখল নিতে একের পর এক একটি চক্র ভূমিহীনদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করে হয়রানি করছেন। আদালতে তারা দেওয়ানি মামলা করে হেরেছেন। এখন ফৌজদারি মামলা করছেন। ভূমিহীনদের ক্ষেতের ফসল জোর করে কেটে নিচ্ছেন।’

চরভদ্রাসনের চরহরিরামপুর ইউনিয়নের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা শেখ মো. ফরিদের দাখিলকৃত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ১৪ নম্বর চরশালেপুর মৌজায় নদী ভাঙ্গনে সিকস্তি-পয়স্তি হয়ে দিয়ারা রেকর্ডে বেশকিছু জমি সরকারের পক্ষে রেকর্ড হয়। ২০১৭ সালে কবুলিয়াত মূলে এবং বন্দোবস্ত কেসের মাধ্যমে প্রায় শতাধিক ভূমিহীন পরিবারকে ওই জমির দখল দেওয়া হয়। এরপর ওই জমির দখল নিতে একটি চক্র ভূমিহীনদের বিরুদ্ধে একের পর এক মিথ্যা মামলা দায়ের করে হয়রানি করছে।’

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা অমিয় মজুমদার বলেন, ‘আমি এই মামলার তদন্ত চলাকালে চরশালেপুর গেলে আসামিরা আমাকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন। তখন তাদের দাবির সপক্ষে তথ্যপ্রমাণ জমা দিতে বলেছিলাম। কিন্তু তারা সময়মতো সেগুলো জমা দিতে পারেননি। ফলে বাদীর এজাহার ও সাক্ষীদের জবানবন্দির ভিত্তিতে চার্জশিট তৈরি করে আদালতে দাখিল করেছি।’

ফরিদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) সুমন রঞ্জন সরকার বলেন, ‘যেহেতু চার্জশিট দেওয়া হয়েছে, নিশ্চয় তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতেই দেওয়া হয়েছে। এখন আদালত এটির সত্য-মিথ্যা যাচাই করে দেখবেন। যেহেতু এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তাই বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে দেখবো।’