দেশে বছরে জ্বালানি তেলের গড় চাহিদা কমবেশি ৬০ লাখ টন। এর মধ্যে কেবল ঢাকা বিভাগেই ব্যবহার হয় ৪২ শতাংশ! আর এই তেলের পুরোটাই যায় চট্টগ্রাম থেকে। এত দিন এ তেল চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থেকে নারায়ণগঞ্জ ও চাঁদপুর হয়ে ঢাকায় পৌঁছলেও চলতি বছর থেকে তা পৌঁছবে সরাসরি।
চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় তেল সরবরাহে বসানো হচ্ছে ২৫০ কিলোমিটার পাইপলাইন। ৩ হাজার ১৭১ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্পের আওতায় এই পাইপলাইন বসানোর কাজ চলছে। এরই মধ্যে এ প্রকল্পের ৬০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। চলতি বছরের মধ্যেই অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করতে চায় প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা বিপিসি।

বর্তমানে পতেঙ্গার গুপ্তখাল এলাকায় বিপিসির তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর মূল স্থাপনা থেকে নদীপথে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল, ফতুল্লা ও চাঁদপুর ডিপোতে তেল নেওয়ার পর সড়ক পথে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে নেওয়া হয়। এতে খরচ হয় দুইশ কোটি টাকারও বেশি। এভাবে পরিবহনের ফলে শুধু তেলের অপচয়ই হয় না, পথে চুরিও হয়। এ ছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ, হরতাল-অবরোধসহ নানা কারণে সমস্যায় পড়ে তেল পরিবহন। আবার নৌরুটে নাব্য সংকটেও তেল পরিবহনে বিঘ্ন ঘটে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) পক্ষে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন তদারকি করছে সংস্থাটির অন্যতম তেল বিপণন কোম্পানি পদ্মা অয়েল। 'চট্টগ্রাম হতে ঢাকা পর্যন্ত পাইপলাইনে জ্বালানি তেল পরিবহন' নামে প্রকল্পটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে সেনাবাহিনীর ২৪তম ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড (ইসিবি)।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২৫০ কিলোমিটার পাইপলাইনের মধ্যে এরই মধ্যে ২০০ কিলোমিটার এলাকায় পাইপ বসানোর কাজ শেষ হয়েছে। এর মধ্যে ১৬৫ কিলোমিটার এলাকায় পাইপে ওয়েল্ডিংও করা হয়েছে। অবশিষ্ট পাইপলাইন স্থাপনসহ আনুষঙ্গিক কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা হচ্ছে। সংশ্নিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে দেশে জ্বালানি তেল সরবরাহে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।

সেনাবাহিনীর ২৪তম ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের (ইসিবি) কর্নেল ও সেনাবাহিনী পক্ষের প্রকল্প পরিচালক কর্নেল মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, 'চলতি বছরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করতে আসন্ন বর্ষা মৌসুমেও প্রকল্পের মাঠ পর্যায়ের কাজ অব্যাহত রাখা হবে। আগামী দুই মাসের মধ্যে সব পাইপ বসে যাবে। টার্মিনাল এবং স্টেশন নির্মাণের কাজও সমানতালে চলছে। নির্ধারিত সময়েই কাজ শেষ করা যাবে, আশা করছি।'

তবে বিপিসির পক্ষে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করা পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (প্রকল্প) প্রকৌশলী আমিনুল হক বলেন, 'এখন যেভাবে কাজ চলছে, তাতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সাম্প্রতিক বিশ্ব পরিস্থিতি ভালো নয়। যদিও বিদেশি উৎস থেকে যেসব মালপত্র আসার কথা, সেগুলো আসার দিনক্ষণ এখনও ঠিক রয়েছে। বড় কোনো সমস্যা না হলে প্রকল্পের কাজ সময়মতো শেষ হবে।'
প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রামের পতেঙ্গার গুপ্তখাল থেকে কুমিল্লা হয়ে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত পাইপলাইন স্থাপন করা হচ্ছে প্রায় ২৪১ কিলোমিটার। এই অংশটিতে বসানো হচ্ছে ১৬ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপ। আর নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল থেকে ফতুল্লা পর্যন্ত বসানো হচ্ছে প্রায় ৯ কিলোমিটার পাইপলাইন। এই অংশটিতে বসানো হচ্ছে ১০ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপ। সমতল ভূমির পাশাপাশি পতেঙ্গা থেকে ফতুল্লা পর্যন্ত পাইপলাইন যাবে ২২টি নদীর তলদেশ ছুঁয়ে। পথে থাকবে ৯টি স্টেশন। কুমিল্লার বরুড়ায় স্থাপন হবে নতুন করে একটি ডিপো। এই পাইপলাইন দিয়ে বছরে ৩০ লাখ টন তেল সরবরাহ করা যাবে।