বগুড়া বিএনপিতে তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সাইফুল ইসলামকেই কি আবারও সভাপতি পদের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে? প্রায় তিন বছর ধরে দলীয় কর্মকাণ্ডে নিষ্ফ্ক্রিয় থাকার পর হঠাৎই রাজনীতিতে তাঁর সক্রিয় হওয়ার চেষ্টায় প্রশ্নটি সামনে এসেছে। দলের জেলা সভাপতির পদ হারানোর পর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকা সাইফুল ইসলাম ৩ মে ঈদের রাতে তাঁর অনুসারীদের নিয়ে আকস্মিক দলীয় কার্যালয়ে হাজির হন। সেখানে নিয়মিত যাতায়াতের পাশাপাশি গত ১৪ মে কেন্দ্র ঘোষিত দলের বিক্ষোভ সমাবেশে অংশ নিয়ে তিনি 'জ্বালাময়ী' বক্তৃতাও করেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের উপস্থিতিতে বক্তৃতাকালে সাইফুল ইসলাম লন্ডনে নির্বাসিত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়ে বলেন, তারেক রহমানকে ফিরিয়ে না আনলে শুধু বক্তব্য দিয়ে সরকারের পতন ঘটানো যাবে না।
দলীয় সূত্র জানায়, বগুড়া জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি সাইফুল ইসলামকে হঠাৎ মাঠে সক্রিয় হতে দেখে দলে তাঁর বিরোধী পক্ষ বিশেষত আগামীতে জেলা কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশীরা রীতিমতো চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। কারণ সাইফুল ইসলামের অনুসারীরা প্রচার করছেন যে, লন্ডন থেকে সবুজ সংকেত পেয়েই তিনি সক্রিয় হয়েছেন। এছাড়া তাঁর একনিষ্ঠ ভক্ত হিসেবে পরিচিত জেলা যুবদল থেকে বহিস্কৃত সাবেক সভাপতি সিপার আল বখতিয়ার বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের আশায় বর্তমানে লন্ডনে রয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে নেতৃত্বপ্রত্যাশীদের মধ্যে চরম অস্বস্তি বিরাজ করছে। কেননা এর আগে সাইফুল ইসলামকে একবার বহিস্কার করা হলেও পরে ঠিকই তাঁকে আবার পর্যায়ক্রমে বগুড়ায় দলের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। এ জন্য এবার তাঁকে হাইকমান্ড থেকে নেতৃত্ব গ্রহণের বিষয়ে কোনো সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছে কিনা, তা জানার জন্য বিরোধী পক্ষ নানাভাবে তৎপরতাও চালিয়ে যাচ্ছে। তাঁদের কেউ কেউ দাবি করেছেন, আগামীতে সরকারবিরোধী আন্দোলনে ভেদাভেদ ভুলে সবাই যাতে রাজপথে সক্রিয় থাকেন, সে জন্য হাইকমান্ড থেকে সাইফুল ইসলামকে তাঁর অনুসারীদের নিয়ে দলীয় কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে বলা হয়েছে। তাঁকে নতুন কমিটিতে সভাপতির দায়িত্ব দেওয়ার কোনো আশ্বাস দেওয়া হয়নি।

বগুড়া বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগামীতে বগুড়া জেলা বিএনপিতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হতে আগ্রহী অনেকের মধ্যে ছয়জনের নাম বেশ জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে। তাঁরা হলেন- বগুড়া জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট এ কে এম মাহবুবুর রহমান, বিএনপি চেয়ারপারসনের আরেক উপদেষ্টা সাবেক সাংসদ হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু, বগুড়া জেলা বিএনপির আহ্বায়ক স্থানীয় পৌরসভার মেয়র রেজাউল করিম বাদশা, বগুড়া জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফজলুল বারী তালুকদার বেলাল, বগুড়া জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি আলী আজগর তালুকদার হেনা ও জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি বিএনপি নেতা এম আর ইসলাম স্বাধীন। সম্প্রতি সাইফুল ইসলামের নামও আলোচনায় এসেছে। তবে তাঁদের মধ্যে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক রেজাউল করিম বাদশার সভাপতির দায়িত্ব পাবেন কিনা, তা নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। কারণ ২০১৯ সালের ১৫ মে আহ্বায়ক কমিটি গঠনের প্রাক্কালে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান শর্ত দিয়েছিলেন যে, আহ্বায়ক ও যুগ্ম আহ্বায়কদের কেউ পরবর্তী সম্মেলনে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী হতে পারবেন না।

বগুড়া জেলা বিএনপির সর্বশেষ সম্মেলন হয় ২০১১ সালে। দুই বছর পর পর সম্মেলন হওয়ার কথা থাকলেও দীর্ঘ ৮ বছরেও তা করা হয়নি। এতে অভ্যন্তরীণ বিরোধ তুঙ্গে ওঠে। পরিস্থিতি সামাল দিতে তৎকালীন জেলা বিএনপির সভাপতি সাইফুল ইসলাম ২০১৯ সালের ২৯ এপ্রিল তাঁর অনুসারীদের নিয়ে একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করেন। একই দিন বগুড়া জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট এ কে এম মাহবুবুর রহমানের নেতৃত্বে পাল্টা আরেকটি আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হয়। এভাবে নিজ জেলায় দলের অভ্যন্তরে দুটি পক্ষকে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যাওয়ায় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ক্ষুব্ধ হন। পরে তাঁর নির্দেশে ২০১৯ সালের ১৫ মে বগুড়া-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য (পরে বগুড়া-৬ আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন) গোলাম মোহাম্মদ সিরাজকে প্রধান করে ৩১ সদস্যবিশিষ্ট বগুড়া জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি করা হয়। তবে সাইফুল ইসলাম সেই কমিটিকে মেনে নিতে পারেননি। বরং ওই কমিটি বাতিলের দাবিতে তাঁর অনুসারীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং দলীয় কার্যালয়ে তালাও ঝুলিয়ে দেন। পাল্টা হিসেবে সাইফুল ইসলামের বাড়িতে হামলা চালানো হয়। তবে দলীয় কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার ওই ঘটনায় বিএনপি, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের ১৬ নেতার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সাইফুল ইসলামের অনুগত হিসেবে পরিচিত ওই ১৬ জনের মধ্যে ৮ জনকে পরে ক্ষমা করা হয়। কিন্তু তার পরও আহ্বায়ক কমিটির সদস্য হিসেবে বগুড়া জেলা বিএনপির কোনো কর্মসূচিতে সাইফুল ইসলামকে অংশ নিতে দেখা যায়নি। আর সেই সুযোগে দলে তাঁর বিরোধী পক্ষ সরব হয়ে ওঠে। তাঁদের অনেকে আগামীতে দলের জেলা কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদের প্রার্থী হিসেবে নেতাকর্মীদের সমর্থন চাইতে থাকেন। তবে দীর্ঘদিন নিষ্ফ্ক্রিয় থাকার পর হঠাৎ দলীয় কর্মসূচিতে সক্রিয় হওয়া প্রসঙ্গে কোনো মন্তব্য করতে চাননি সাইফুল ইসলাম। আগামীতে বগুড়া জেলা বিএনপির নেতৃত্ব পেতে যাচ্ছেন কিনা, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বিএনপির রাজনীতি আমার রক্তে মিশে আছে। বিএনপি ছাড়া আমার কোনো অস্তিত্ব নেই।

জেলা কমিটির সম্মেলন কবে :২০১৯ সালের ১ মে আহ্বায়ক কমিটি গঠনের পর সেপ্টেম্বরে দল পুনর্গঠন শুরু হয়। এ পর্যন্ত ১০৯টি ইউনিয়নের মধ্যে ১০৩টিতে সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠিত হয়েছে। এ ছাড়া উপজেলা এবং পৌরসভা মিলিয়ে ২৪টি সাংগঠনিক ইউনিটের মধ্যে ১২টিতে সম্মেলন শেষ হয়েছে। বগুড়া জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও স্থানীয় পৌরসভার মেয়র রেজাউল করিম বাদশা জানিয়েছেন, আগামী জুলাই মাসের মধ্যে সম্মেলনের মাধ্যমে বগুড়ায় নতুন কমিটি গঠন করা হবে। নিজেকে দলের সভাপতি পদের প্রার্থী হিসেবেও উল্লেখ করেন তিনি। তবে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, বিশেষ ক্ষেত্রে প্রার্থী হওয়া যায়। অনেক স্থানেই হয়েছে। সাইফুল ইসলামের হঠাৎ দলীয় কর্মসূচিতে সক্রিয় হওয়ায় পদপ্রত্যাশী অনেকে অস্বস্তিতে পড়েছেন কিনা, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বিএনপি একটি বিশাল সংগঠন। এখানে নেতৃত্ব নিয়ে প্রতিযোগিতা থাকবে- এটাই স্বাভাবিক। তিনি আহ্বায়ক কমিটির সদস্যের পাশাপাশি দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটিরও সদস্য। তিনি চাইলে নেতৃত্ব নির্বাচনে অংশ নিতেই পারেন।