রাজধানীর মহাখালীর জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটে দায়িত্ব পালন করেন আনসার সদস্য এছাহাক আলী। তাঁর কাছে এক রোগী ভর্তির জন্য সহায়তা চেয়েছিলেন মোশারফ হোসেন। ওই সময়ে নিজেকে সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তা পরিচয় দেন মোশারফ। আনসার সদস্য রোগী ভর্তিতে সহায়তা করায় তার উপকারে কিছু করতেও চান। এছাহাকের ছেলেকে চাকরি দিতে চান। সে অনুযায়ী এছাহাকের ছেলে ও ভাগ্নেকে ৩ লাখ টাকার চুক্তিতে চাকরির নিয়োগপত্রও দেন তিনি! কিন্তু যোগদানের আগে জানা যায়, ওই নিয়োগপত্র ভুয়া, মোশারফের পরিচয়ও ভুয়া।

শুধু আনসার সদস্য এছাহাক আলীই নন; ওই প্রতারক টাকার বিনিময়ে চাকরি দেওয়ার নাম করে ভুয়া নিয়োগপত্র দিয়ে শত শত মানুষকে পথে বসিয়েছেন। গত আড়াই বছরে হাতিয়েছেন লাখ লাখ টাকা। গত সোমবার রাজধানীর মিরপুর এলাকা থেকে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা (ডিবি) সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ মোশারফ ও তার সহযোগী জিয়া উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে। জিয়া বড় কর্মকর্তা সেজে চাকরি প্রার্থীদের ফোন দিতেন।

সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের সংঘবদ্ধ অপরাধ তদন্ত টিমের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. নাজমুল হক সমকালকে বলেন, মোশারফ তাঁর প্রতারণার সবকিছু একটি ডায়েরিতে লিখে রাখতেন। কাকে কাকে চাকরি দেবেন, তার টার্গেট কারা, কার কাছ থেকে কত টাকা নিয়েছেন- সবকিছুই সেখানে লেখা রয়েছে। তাতে দেখা যায়, সপ্তাহে অন্তত ৬০ জন তাঁর টার্গেটে থাকে। ওই ব্যক্তিদের চাকরি দেওয়ার নাম করে ভুয়া নিয়োগপত্র দিয়ে টাকা হাতিয়ে নেন তিনি।

পুলিশ কর্মকর্তা নাজমুল হক বলেন, উদ্ধার ডায়েরি ঘেঁটে এবং প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদে তিন শতাধিক মানুষের নাম ও ফোন নম্বরসহ নানা তথ্য পাওয়া গেছে। তালিকায় থাকা ব্যক্তিরা প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তবে টাকা দিয়ে চাকরি নেওয়া অপরাধ হওয়ায় তাঁরা আইনের আশ্রয় নেননি। আনসার সদস্য এছাহাক আলী প্রতারণার শিকার হয়ে গত মার্চে বনানী থানায় মামলা করেন। ওই মামলার ছায়াতদন্ত করতে গিয়েই সন্ধান মেলে প্রতারক মোশারফের।

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি সংগ্রহের মাধ্যমে প্রতারণা শুরু

ডিবি-সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ তারেক বিন রশিদ জানান, বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকা এবং চাকরির সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলো থেকে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি সংগ্রহ করেন মোশারফ। এরপর বিভিন্ন আনসার সদস্য, নিরাপত্তাকর্মী, নিচের পদে চাকরি করেন এমন মানুষের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। একেকজনের কাছে নিজেকে একেক পদের বড় সরকারি কর্মকর্তা পরিচয় দেন। এরপর তাঁদের উপকারে আসতে পারলে ভালো লাগবে- এমন কথা বলেন। কোনো চাকরির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি এলে নিজে থেকেই তা ওই পরিচিত লোকদের পাঠিয়ে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। চাকরিপ্রত্যাশীরা রাজি হলে টাকার বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়ার চুক্তি করেন।

মোশারফের লোক হওয়ায় পরীক্ষা ছাড়াই মেলে নিয়োগপত্র :ডিবি কর্মকর্তারা জানান, চুক্তি অনুযায়ী চাকরিপ্রার্থীর বায়োডাটা নেন মোশারফ। সে অনুযায়ী পরীক্ষার প্রবেশপত্রও তৈরি করেন। এরপর তা প্রার্থীর ই-মেইলে পাঠিয়ে দেন। মাঝে পরীক্ষার তারিখও জানিয়ে দেন। পরীক্ষায় কী ধরনের প্রশ্ন আসবে- একপর্যায়ে তাও তিনি প্রার্থীকে বলে দেন। কয়েকদিন পর ফের বলেন, তিনি সব ব্যবস্থা করে ফেলেছেন, পরীক্ষা দেওয়া লাগবে না। শিগগিরই নিয়োগপত্র হয়ে যাবে।

কিউআর কোডে বিশ্বাস স্থাপন

চাকরিপ্রত্যাশীর বায়োডাটা দেখে কাঙ্ক্ষিত চাকরির নিয়োগপত্রও তৈরি করে ফেলেন মোশারফের লোকজন। এরপর জিয়া নিজেকে সংশ্নিষ্ট অফিসের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে প্রার্থীকে তাঁর নিয়োগপত্র প্রস্তুত রয়েছে জানিয়ে ফোন করেন। এর পরই প্রার্থীর কাছ থেকে চুক্তি অনুযায়ী টাকা হাতিয়ে নেন এই প্রতারক। চাকরিপ্রার্থীর ই-মেইলে চলে আসে নিয়োগপত্রও। তবে সেটি সঠিক কিনা, নিয়োগপত্রে থাকা কিউআর কোডের মাধ্যমে তা যাচাই করতে বলেন মোশারফ।

ডিবি কর্মকর্তা নাজমুল হক বলেন, মোশারফের চক্র প্রার্থীর কাছে বিশ্বাস স্থাপনে কিউআর কোড জেনারেটর সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রার্থীর নাম-ঠিকানা সংবলিত একটি কিউআর কোড তৈরি করে ভুয়া নিয়োগপত্রে দিয়ে দেন। প্রার্থী যখন তাঁর মোবাইলের কিউআর কোড স্ক্যানার দিয়ে যাচাই করেন, তখন সেখানে নিজের ছবিসহ সব তথ্য দেখায়।

প্রতারণার শিকার আনসার সদস্য এছাহাক আলী জানান, তাঁর ছেলে ও ভাগ্নেকে স্টোর কিপার পদে চাকরি দেওয়ার জন্য মোশারফের সঙ্গে ৩ লাখ টাকায় চুক্তি হয়। পরীক্ষার প্রবেশপত্র পেয়ে তিনি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ২০ হাজার টাকা পাঠান মোশারফকে। এর কয়েকদিন পর দু'জনের নিয়োগপত্র এলে চুক্তির টাকা চান ওই প্রতারক। তিনি নিয়োগপত্রগুলো জানাশোনা লোকদের দেখালে তাঁরা জানান এগুলো ভুয়া। এর পরই তিনি আইনের আশ্রয় নেন।