ঈদের পরদিন বিকেলে ওষুধ কেনার কথা বলে পুরান ঢাকার চকবাজারের বাবার বাড়ি থেকে বের হন গৃহবধূ। এরপর আর খোঁজ মিলছিল না তার। পরে ওই নারীর বাবা ও স্বামী নিখোঁজের বিষয়টি পুলিশকে জানান। গৃহবধূকে খুঁজতে নেমে ধাপে ধাপে চমকপ্রদ তথ্য পায় পুলিশ। ওই ভুক্তভোগী নারী পড়েছিলেন সংঘবদ্ধ পাচারকারী চক্রের ফাঁদে। শেষ পর্যন্ত তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় রুদ্ধশ্বাস এক অভিযানে তাঁকে উদ্ধার করা হয়। ধরা পড়েন পাচারকারী চক্রের দুই সদস্য।

চকবাজার থানার ওসি এম এ কাইয়ুম বলেন, ভুক্তভোগী তরুণীর সঙ্গে এক বছর আগে ফেসবুকে পরিচয় হয় মো. রনি ও তাঁর বোন জেসমিন সুলতানার। ওই দু'জন বিশেষ উদ্দেশ্যে তরুণীর সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন। একপর্যায়ে তাঁকে প্রলুব্ধ করে সাতক্ষীরায় নেওয়া হয়। সেখানে তাঁকে আটকে রেখে ভারতে পাচারের প্রক্রিয়া চলছিল। এরমধ্যেই তার অবস্থান শনাক্ত করে গত ১০ মে অভিযান চালায় পুলিশ।

তদন্ত সূত্র জানায়, তরুণীর স্বামী ইন্টারনেট সংযোগের ব্যবসা করেন। স্বামীর সঙ্গে চলছিল তাঁর মনমালিন্য। এর জেরে গত ৪ মে ওই নারী বাবার বাড়িতে যান। ওই দিন বিকেলে ওষুধ কেনার কথা বলে বের হয়ে সময়মতো না ফেরায় তাঁর খোঁজ শুরু হয়। অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ তাঁর অবস্থান জানার চেষ্টা করে। প্রযুক্তিগত তদন্তে দেখা যায়, সাতক্ষীরার এক যুবকের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। ঘটনার দিন ওই যুবক সাতক্ষীরা থেকে আসেন এবং তরুণীকে সঙ্গে নিয়ে আবার ফিরে যান। এতে পুলিশ ধারণা করে, ফাঁদে ফেলে তাঁকে অপহরণ করা হয়েছে। সে অনুযায়ী শুরু হয় তদন্ত। এর মধ্যে ভুক্তভোগী তরুণী এক আসামির মোবাইল থেকে ফোন করে জানান, তাঁকে সাতক্ষীরা শহরের একটি বাসায় আটকে রাখা হয়েছে। দ্রুত উদ্ধার করা না হলে তাঁকে পাচার করে দেবে ওই চক্র।

উদ্ধার অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া চকবাজার থানার এসআই ওয়ালি উল্লাহ বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে জানতে পারি ভুক্তভোগীকে সাতক্ষীরা সদরের সুলতানপুর সাহাপাড়া এলাকার এক বাড়িতে রাখা হয়েছে। ১০ মে রাতে অভিযান চালানো হয়। ভুক্তভোগী চারতলা একটি বাড়িতে থাকার কথা জানিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে বেশ কয়েকটি চারতলা বাড়ি পাওয়া যায়। ফলে নির্দিষ্ট বাড়িটি শনাক্ত করতে বেগ পেতে হয়। এরমধ্যে ভুক্তভোগী জানিয়ে দেন, আসামিরা ঘুম থেকে জেগে উঠেছে। ফলে তাঁদের ফোন থেকে কথা বলতে পারবেন না। তখন আমি তাঁকে ফোন নিয়ে বাথরুমে যাওয়ার পরামর্শ দিই। সেইসঙ্গে আমি মোটরসাইকেল নিয়ে হর্ন বাজাতে বাজাতে ওই এলাকার চারতলা বাড়িগুলোর আশপাশে ঘোরাঘুরি করি।

একপর্যায়ে তরুণী হর্নের জোরালো আওয়াজ শুনতে পাওয়ার কথা জানালে বুঝতে পারি, কাঙ্ক্ষিত ভবনটির পাশে চলে এসেছি। তখন তাঁকে বাথরুমের আলো বারবার জ্বালিয়ে আবার নেভাতে বলি। তিনি নির্দেশ পালন করায় সহজেই বাড়িটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়। এরপর ভবনটির চতুর্থ তলায় অভিযান চালিয়ে জেসমিন সুলতানাকে গ্রেপ্তার করা হয়। উদ্ধার করা হয় ভুক্তভোগীকে। সেখানে সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদবির র‌্যাংকব্যাজসংবলিত এক সেট ইউনিফর্ম জব্দ করা হয়। সেটির গায়ে 'ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট' এবং নেমপ্লেটে 'জেসমিন' লেখা ছিল। তাঁর দেওয়া তথ্যে সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার উত্তর কুলিয়া গ্রাম থেকে রনিকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তদন্তসংশ্নিষ্টরা জানান, গ্রেপ্তার ভাই-বোন আন্তর্জাতিক নারী পাচারকারী চক্রের সদস্য। তাঁরা নানা কৌশলে নারীদের ফাঁদে ফেলে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ভারতে বিক্রি করে দেন। সেখানে নারীদের ঠাঁই হয় বিভিন্ন পতিতালয়ে। চক্রের সদস্যরা প্রতারণার সুবিধার্থে সেনাবাহিনী, বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তার নকল ইউনিফর্ম পরে মানুষকে বিভ্রান্ত করতেন। ঢাকার এই তরুণীকে ভালো চাকরি দেওয়া এবং বেড়ানোর নাম করে সাতক্ষীরায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। চক্রের অন্য সদস্যদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।