আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান এবং সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় ও ভুমি কমিশন গঠনসহ ১৬ দফা দাবি আদায়ে দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক কার্যালয় ঘেরাও করলো জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সদস্যরা।

 বুধবার দুপুরে দিনাজপুর শহরের সরকারি কলেজ মোড় থেকে এক বিক্ষোভ মিছিল জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে গিয়ে শেষ হয়। পরে জেলা প্রশাসক কার্যালয় ঘেরাও করে বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করে আদিবাসী নেতারা। বিক্ষোভ সমাবেশ শেষে জেলা প্রশাসক খালেদ মোহাম্মদ জাকির মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেন।

বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য রাখেন জাতীয় আদিবাসী পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল- জাসদের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ জেলা শাখার সহ-সভাপতি শিবানী উরাও, বাসদের দিনাজপুর সমন্বয়ক কিবরিয়া হোসেন প্রমুখ।

স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়- বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬টি জেলায় আদিবাসীর বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রায় ২০ লাখ মানুষের বসবাস। এর মধ্যে সাওতাল, মুন্ডা, রাজোয়ার, তুরি, কর্মকার, মালো, মাহাতো, মালপাহাড়িয়া, গন্ড, পাটনি, বাগদি, মাহালী, ডহরা, ভুমিজ, আঙ্গুয়ার রাজোয়াড, বেতিয়া, নুনিয়াহাড়ি, পাহাড়িয়া, ভুইয়া, বাগদী, রবিদাস, রাই, বেদিয়াসহ ৩৮টি জাতিসত্তা রয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে এ দেশের আদিবাসীদের বিশাল অবদান রয়েছে। এই দেশ স্বাধীনতা করতে অনেক আদিবাসী জীবন দিয়েছে। কিন্তু দেশ স্বাধীনের পর নিজ দেশে গিয়ে দেখেন আদিবাসীদের নিজের বাড়ী-ঘর, চাষের জমি, ভিটা-মাটি দখল হয়ে গেছে। যা আজ পর্যন্ত ফেরত পায়নি।

স্মারকলিপিতে আরও বলা হয়- বর্তমান সময়ে আদিবাসীদের জীবন সংকটাপূর্ণ হয়ে পড়েছে। তাদের মানবাধিকার পরিস্থিতি ক্রমাগতভাবে চরম অবনতি ঘটছে। আদিবাসীদের ভুমি সমস্যা দিনদিন আরো প্রকোপ আকার ধারণ করেছে। একশ্রেণির ভুমিদস্যু ও সন্ত্রাসীরা আদিবাসীদের উপর অত্যাচার, ভুমি থেকে উচ্ছেদ, জাল দলিল, হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, অগ্নিসংযোগ, মিথ্যা মামলা, লুটপাট, জবর দখল, দেশ ত্যাগে বাধ্যসহ নানা ধরনের নির্যাতন নিপীড়ণ চালিয়ে যাচ্ছে। ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে জাতীয় সংসদের নির্বাচনে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে আদিবাসীদের ভুমি অধিকার সুরক্ষা ও উন্নয়নে বিশেষ কার্যক্রম গ্রহণের ঘোষণা করেছিল। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে ধর্মীয় নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘুদের ওপর বৈষম্যমূলক আচরণ, মানবাধিকার লঙ্ঘন রোধ এবং তাদের ভুমি, বসতভিটা, বনভুমি, জলাভুমিসহ অন্যান্য সম্পত্তির পূর্ণ সংরক্ষা নিশ্চিত করার ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু তা এখনও পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি।

স্মারকলিপিতে ১৬ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হলে- আদিবাসীদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে, সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় ও ভুমি কমিশন গঠন, আদিবাসীদের ‘আদিবাসী’হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান, দখলি শর্তে খাস জমি, বসতভিটা, কবরস্থান, পুকুর আদিবাসীদের নামে প্রদান, বনায়নের নামে আদিবাসীদের জমি বনবিভাগের দখল ও মামলা-হয়রানি থেকে মুক্ত করা, আদিবাসীদের জমি আদিবাসীদের কাছে হস্তান্তরের রক্ষাকবচকে আরো কঠোর করাসহ বিনা পারমিশনে যে সব দলিল তৈরি হয়েছে তা বাতিল করা, সকল আদিবাসীদের নিজস্ব ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে এবং আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে কমপক্ষে একজন করে আদিবাসী শিক্ষক নিয়োগ করা, আদিবাসীদের জন্য উচ্চ শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে কোটা সংরক্ষণ করা, দিনাজপুর ও নওগাঁয় প্রতিষ্ঠিত আদিবাসী একাডেমিতে দ্রুত জনবল নিয়োগ করতে হবে এবং রাজশাহী বিভাগীয় আদিবাসী একাডেমীদে উপ-পরিচালক পদে আদিবাসীদের মধ্য থেকে নিয়োগ দিতে হবে, আদিবাসী ও সংখ্যালঘু কমিশন গঠন, জাতীয় সংসদে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ থেকে আদিবাসী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতের জন্য চারটি সংরক্ষিত নির্বাচনী এলাকা গঠনের জন্য আইন প্রণয়ন ও দুইটি সংরক্ষিত আদিবাসী নারী আসনের ব্যবস্থা করা, আদিবাসীদের মানবাধিকার লঙ্ঘণের ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের দেয়া নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করা, আদিবাসীদের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিক রক্ষা-চর্চার অনুকুল পরিবেশ, গবেষণার ক্ষেত্রে প্রস্তুতসহ আদিবাসী একাডেমি গঠন করা, সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মের ১৮৪২ দশমিক ৩০ একর সম্পত্তি প্রকৃত জমি মালিকদের ফিরিয়ে দিতে ও ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বরে পুলিশের গুলিতে নিহত তিন সাওতাল হত্যার বিচার এবং ক্ষতিপূরণ প্রদান, আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে কোন ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের পূর্বে সরকারকে আদিবাসীদেরর সাথে আলোচনা করতে হবে।