আবাসিক মাদ্রাসার ভেতরে সুরক্ষিতই ছিল পিতৃহীন সামিউল ইসলাম সাব্বির। কিন্তু মোবাইল ফোনে মা সেজে কল করা এক নারীর অনুরোধে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ সামিউলকে তার সৎবাবা ফজলুল হকের সঙ্গে বাড়ি যাওয়ার অনুমতি দেন। তবে শিশুটির আর বাড়ি ফেরা হয়নি। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী সৎবাবা ফজলুল হক তাকে মাদ্রাসা থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে নিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। এরপর লাশটি একটি লাউয়ের ক্ষেতে ফেলে রেখে পালিয়ে যান তিনি।

নৃশংস ওই হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার মাদিকদিপা গ্রামে। ১৭ মে রাতে সংঘটিত ওই হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ ওইদিন রাতেই নিহত সামিউলের সৎবাবা ফজলুল হক (৪০) এবং অনিতা রাণী (৩৫) নামে তার এক সহযোগীকে গ্রেফতার করেছে।

বুধবার দুপুরে বগুড়ার পুলিশ সুপার সুদীপ কুমার চক্রবর্ত্তী নিজ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ওই হত্যাকাণ্ডের আদ্যোপান্ত তুলে ধরেন। ফজলুল হকের বাড়ি শাজাহানপুর উপজেলার খরনা কমলাচাপড় গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের মৃত আবুল হোসেনের ছেলে। আর অনিতা রাণী একই উপজেলার চেলো গ্রামের মৃত খিরদ চন্দ্র দেবনাথের মেয়ে। তারা দু’জন খোয়া ভাঙার কাজ করেন। মামলা দায়েরের পর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদেরকে রিমান্ডে নেওয়া হবে।

সংবাদ সম্মেলেন জানানো হয়, সামিউল ইসলাম সাব্বির শাজাহানপুর উপজেলার মাঝিড়া কাগজীপাড়া এলাকার জাহাঙ্গীর আলম ও সালেহা বেগম দম্পতির সন্তান। পড়ালেখার জন্য তাকে একই উপজেলার সাজাপুর পূর্ব দক্ষিণপাড়া তালিমুল কোরআন হাফেজিয়া আবাসিক মাদ্রাসায় ভর্তি করে দেওয়া হয়। ছুটির সময় ছাড়া সামিউল ওই মাদ্রাসাতেই অবস্থান করত।

পুলিশ সুপার সুদীপ কুমার চক্রবর্ত্তী জানান, স্বামী জাহাঙ্গীর আলম মাদকাসক্ত হয়ে পড়ায় সালেহা বেগম দেড় মাস পূর্বে তাকে তালাক দিয়ে ফজলুল হক নামে অন্য এক ব্যক্তিকে বিয়ে করেন। গত রমজানে মাদ্রাসা ছুটি হলে সামিউল মায়ের কাছে ফিরে আসে। কিন্তু সৎবাবা ফজলুল হক সামিউলের উপস্থিতি মেনে নিতে পারে না। বরং ছেলেটিকে তার নানি অথবা খালার বাড়িতে রেখে আসার জন্য স্ত্রীর ওপর চাপ দিত এবং শারীরিক নির্যাতন চালাত।

কিন্তু শত নির্যাতন সত্ত্বেও সালেহা ছেলেকে নিজের কাছে রাখার সিদ্ধান্তে অটল ছিল। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ফজলুল হক শিশু সামিউলকে প্রায়ই খাবার না দিয়ে অনাহারে রাখত। এমনকি রাতে ঘরের ভেতর ঘুমাতে পর্যন্ত দিত না। সর্বশেষ ৩ মে ঈদের দিন সামিউল তার মায়ের সঙ্গে বেড়াতে যেতে চাইলে ফজলুল হক শিশুটিকে মারপিট করে তার খালার বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। সন্তানের কষ্ট সইতে না পেরে সালেহা ১ মে ফজলুল হককে তালাক দেয়। এরপর ঈদের ছুটি শেষে সালেহা ১৪ মে তার ছেলেকে মাদ্রাসায় রেখে আসে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সালেহার কাছ থেকে তালাকের নোটিশ পেয়ে ফজলুল হক আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। সামিউলের কারণেই সালেহা তাকে তালাক দিয়েছে এমন ধারণা করে ফজলুল হক শিশুটিকে হত্যার পরিকল্পনা করে। এজন্য সে ১৬ মে সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে মাদ্রাসায় যায় এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক আবু মুছাকে বলে যে সালেহা তার সন্তান সামিউলকে নেওয়ার জন্য তাকে পাঠিয়েছে।

তখন ফজলুল হককে জানানো হয় যে, অভিভাবক হিসেবে মায়ের অনুমতি ছাড়া অন্য কারো কাছে সন্তানকে দেওয়ার নিয়ম নেই। তাই সামিউলকেও তার মায়ের অনুমতি ছাড়া দেওয়া যাবে না। এরপর কৌশলী ফজলুল হক তার সহযোগী অনিতা রাণীর মোবাইল ফোন নম্বর মাদ্রাসা শিক্ষক আবু মুছাকে দিয়ে বলে এটা সামিউলের মায়ের নম্বর আপনি তার সঙ্গে কথা বলুন।

এরপর মাদাসা শিক্ষক মুছা তার নিজের মোবাইল ফোন থেকে ফজলুল হকের দেওয়া সেই নম্বরে ফোন করলে অপর প্রান্ত থেকে অনিতা রাণী নিজেকে সামিউলের মা পরিচয় দিয়ে বলেন, ‘আমি সামিউলের মা, আপনি ছোলোক (ছেলেকে) দিয়ে দ্যান।’ একথা শোনার পর মুছা শিশু সামিউলকে ফজলুল হকের হাতে তুলে দেন।

শাজাহানপুর থানার ওসি আব্দুল্লাহ্ আল মামুন জানান, ফজলুল হক এর আগেও একাধিক বিয়ে করেছিল। একসঙ্গে ইট ভাঙার কাজ করার কারণে অনিতা রাণীর সঙ্গে ফজলুল হকের আগে থেকেই পরিচয় ছিল। সামিউলকে নিতে গেলে মায়ের অনুমতি ছাড়া মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ তাকে দেবে না- এটা ফজলুল হক জানত। তাই সে হয়তো আগেই অনিতা রাণীকে তার মা হিসেবে কথা বলার জন্য বলে রেখেছিল।

বগুড়ার পুলিশ সুপার সুদীপ কুমার চক্রবর্ত্তী জানান, ফোন কলটি আদৌ সামিউলের মায়ের ছিল কি না, সেটা নিশ্চিত না হয়েই মাদ্রাসা শিক্ষক আবু মুছা শিশুটিকে তার সৎবাবার হাতে তুলে দেন। যদি ওই মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের মোবাইল ফোন নম্বর সংরক্ষণ করা থাকত তাহলে হয়তো এভাবে প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া সম্ভব হতো না।

এক প্রশ্নের জবাবে সুদীপ কুমার চক্রবর্ত্তী বলেন, আগামীতে কেউ যেন এ ধরনের প্রতারণা আশ্রয় নিয়ে কোনো শিক্ষার্থীর ক্ষতি করতে না পারে সেজন্য প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিভাবকদের মোবাইল ফোন নম্বর সংরক্ষণের বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণের জন্য আমরা জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় বিষয়টি উত্থাপন করব।