ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ধারেই টঙ্গীর স্টেশন রোড বাসস্ট্যান্ড। সামনে পা ফেললে মিলগেট। পূর্বদিকে শহীদ সুন্দর আলী সড়কের দু'পাশটা নানা শিল্পকারখানায় ভরা; বড় বড় দালানের বাঁকে বাঁকে টং দোকানের পসরা। এই পথে সোজা এক কিলোমিটার হাঁটলেই নিশাতনগর। এ এলাকায় কারখানার বিষাক্ত ঝাঁজে পুড়ছে গাছগাছালি। তারপরও দালানের ফাঁক গলে এখনও দেয় কিছু সবুজ উঁকি। নিউ অলিম্পিয়া টেক্সটাইল মিলসের উল্টো পাশটায় মঙ্গলের বস্তি। বস্তির নাম 'মঙ্গল' হলেও চারপাশ যেন অমঙ্গলের হাতছানি। মঙ্গলের বস্তির মুখেই এসএস স্টিল মিল। সেই কারখানার নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়ায় দিনেই নামে রাত। কারখানাটির লোহা পোড়া ধোঁয়াকাণ্ড অজানা নয় পরিবেশ অধিদপ্তরের। ভুক্তভোগী এলাকার মানুষের অভিযোগ, অধিদপ্তরের জরিমানা ও নোটিশেও বন্ধ করা যায়নি এসএস স্টিল মিলের কালো ধোঁয়া।

ভূতুড়ে কারখানা :এসএস স্টিল মিলের সামনে গিয়ে দেখা যায়, দিনেও যেন নেমেছে রাত। বিকট শব্দ। পঞ্চাশ দশকের পুরোনো কারখানাটি বেশ জীর্ণ। জং ধরেছে মিলের যন্ত্রাংশে। কাজ করছেন শতাধিক শ্রমিক। চুল্লিতে জ্বলছে পুরোনো লোহার টুকরো। ধোঁয়া শোধনের নেই কোনো যন্ত্র। ধোঁয়া নির্গমনের চিমনির উচ্চতা কম। ফলে ধোঁয়া ছাদ ও  দেয়ালের টিনের ফাঁক দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। সেই ধোঁয়ায় কালোর আস্তরণ আশপাশের দেয়ালে দেয়ালে। বাতাসে উড়ে ছাই এসে পড়ছে গাছ ও পাশের বিভিন্ন ভবনে।

কারখানার বিষাক্ত ধোঁয়ায় পাশের রপ্তানিমুখী পোশাক ও অন্য কারখানাগুলোর কয়েক হাজার শ্রমিকের কর্মকাে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। ব্যাহত হচ্ছে পণ্য রপ্তানির কর্মযজ্ঞ। বিদেশি ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। বাতিল হচ্ছে রপ্তানি আদেশ।

অস্বস্তিতে আশপাশের কারখানা :এসএস স্টিল মিলের পাশের একটি কারখানার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, আশপাশের কারখানার শ্রমিকদের কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা ধোঁয়া বের হচ্ছে। শ্রমিকদের শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। বারবার অভিযোগ জানানো হলেও এসএস স্টিল মিল কর্তৃপক্ষ ধোঁয়া পরিশোধন ও চারপাশে ছড়িয়ে পড়া বন্ধ করতে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক কর্মকর্তা বলেন, ধোঁয়ায় শুধু কর্মীরা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন তা-ই নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কারখানার অবকাঠামো ও রপ্তানি পণ্যও। ভবনগুলো প্রতি মাসে সংস্কার করতে হচ্ছে। তাঁদের অনেক পণ্য ধোঁয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা রপ্তানির অযোগ্য হয়ে পড়ে। প্রায়ই বিদেশি ক্রেতারা কারখানা পরিদর্শনে এলে ধোঁয়াচ্ছন্ন পরিবেশ দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন; রপ্তানি আদেশ বাতিল করেন। এতে উদ্যোক্তাদের ক্ষতির পাশাপাশি রপ্তানিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, তাঁরা এসএস স্টিল মিল কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার সাক্ষাৎ করে ও চিঠি দিয়ে কারখানার অবকাঠামো সংস্কার ও ধোঁয়ার নির্গমন রোধে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। মিল কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করেছিল। তারপর আর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পোশাক শ্রমিক বলেন, পাশের পোশাক কারখানার বিভিন্ন ফ্লোর ধোঁয়াচ্ছন্ন হয়ে যায়। একাধিক বড় আকারের বৈদ্যুতিক পাখা চালিয়েও পরিস্থিতি সহনীয় করা যায় না। চোখ জ্বলে। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।

শুধু ধোঁয়া কিংবা শব্দ নয়, এসএস স্টিল মিলের অবকাঠামোও ঝুঁকিপূর্ণ। কারখানার ছাদ ও চারপাশে যে টিনের বেষ্টনী রয়েছে, তাতে প্রায়ই ঘটে দুর্ঘটনা। ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামোর কারণে গত দুই বছরে ওই কারখানায় বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনাও ঘটেছে। আগুনে দগ্ধ হয়ে দু'জন নিহত ও অন্তত ৫০ শ্রমিক আহত হয়েছেন।

ভালো নেই বস্তির পাঁচ লাখ মানুষ :মিলটির পাশের মঙ্গল বস্তিতে চার থেকে পাঁচ লাখ লোকের বাস। গার্মেন্টস শ্রমিক আমেনা বেগম তিন সন্তান ও স্বামীকে নিয়ে থাকেন ওই বস্তিতে। তিনি বলেন, 'স্টিল মিলের কারণে গাছের পাতা সব সময় বিবর্ণ হয়ে থাকে। ঘরে ঘরে দেখা দেয় রোগবালাই। প্রাণভরে শ্বাস নেওয়ার জো নেই। নিঃশ্বাসের সঙ্গে যেন ঢুকে যাচ্ছে বিষ। দুই বছরের মেয়ের শরীরে কয়েকটি কালচে দাগ দেখিয়ে তিনি বলেন, আমার তিন সন্তানই শ্বাসকষ্টে ভুগছে। পাঁচ বছর ধরে দেখছি, দিনের চেয়ে রাতে ধোঁয়া বাড়ে। সব সময় চোখ জ্বালাপোড়া করে। আমেনা বেগম যখন কথা বলছিলেন, তখন সাংবাদিক দেখে শতাধিক বাসিন্দা একত্র হন। তাঁদের অভিযোগ, প্রশাসনের সামনে এমন বিষ ছড়ানো হলেও কেউ ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

শুধু বস্তির বাসিন্দা নন, আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, দোকানপাট, মসজিদ ও কারখানাও এসএস স্টিল মিলের দূষণের শিকার। একাধিকবার অভিযোগ করেও কোনো কাজ হয়নি।

পরিবেশ অধিদপ্তরের চিঠি চালাচালি :পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানিয়েছে, ২০০৫ সালের ২০ জুলাই একটি লিগ্যাল নোটিশের পরিপ্রেক্ষিতে এসএস স্টিল মিল কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাহমুদ হাসান খানের সই করা ওই চিঠিতে বলা হয়, 'এসএস স্টিল কারখানার ধোঁয়া ও অগ্নিকণায় আশপাশের কারখানার পরিবেশদূষণ হচ্ছে। যে কোনো সময় অগ্নিকাে র ঘটনা ঘটতে পারে।' ওই চিঠিতে কারখানার পরিবেশ ছাড়পত্রসহ অন্য কাগজপত্র চাওয়া হয়। পরে এই চিঠির অগ্রগতির বিষয়ে আর কিছু জানা যায়নি। এক কারখানার ভুক্তভোগী একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ২০১৭ সালে পরিবেশ অধিদপ্তরের গাজীপুর জেলা কার্যালয়ে এসএস স্টিল মিলের বায়ুদূষণ ও ঝুঁকির বিষয়ে একটি চিঠি দেওয়া হয়। সেই চিঠির অনুলিপি পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, বন ও পরিবেশমন্ত্রী এবং ওই মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছেও পাঠানো হয়েছে। তবে কোনো সাড়া মেলেনি। ২০১৬ সালেও পরিবেশ অধিদপ্তরে একই রকম চিঠি দেওয়া হয়েছিল। ২০১৯ সালে পরিবেশ অধিদপ্তরের গাজীপুর জেলা কার্যালয় এসএস স্টিল মিলে অভিযান চালিয়ে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে। সর্বশেষ গত ২৫ এপ্রিল এই স্টিল মিলের লোহা পোড়ানো দূষিত ধোঁয়ার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, গাজীপুর জেলা প্রশাসক, এসএস স্টিল মিল কর্তৃপক্ষ, পরিবেশ অধিদপ্তরের গাজীপুর জেলা কার্যালয়সহ সংশ্নিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়। তবে এখনও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

কারা কী বলছেন :স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, স্টিল মিলের ধোঁয়া স্বাস্থ্যের জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। লোহা উচ্চ তাপমাত্রায় গলানোর সময় সহযোগী হিসেবে কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাইঅক্সাইড, কার্বন ডাইঅক্সাইডসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর যৌগ উৎপাদিত হয়। পরিবেশসম্মতভাবে ধোঁয়া শোধন না করলে তা দ্রুত বাতাসের সঙ্গে এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এতে পরিবেশদূষণের পাশাপাশি মানবদেহে অ্যাজমা, শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ ও ক্যান্সারের মতো রোগ তৈরি হতে পারে।

এ বিষয়ে এসএস স্টিল মিলের নির্বাহী পরিচালক নাজিম উদ্দিন বলেন, 'মিল পরিচালনায় আমরা সব রকম পদক্ষেপ নিয়েছি। আড়াই কোটি টাকা খরচ করে যন্ত্র বসিয়েছি। তারপরও ময়লা জমে অল্প সময়ের জন্য কিছু ধোঁয়া বের হবেই। বাংলাদেশের দুটি স্টিল মিল ছাড়া সবকটি থেকেই এ রকম ধোঁয়া বের হয়। ওই দুটি কারখানা ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস ব্যবহার করে, যা ব্যয়বহুল।' বাংলাদেশে সব স্টিল মিল একই প্রক্রিয়ায় চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, 'আমাদের এখানে আশপাশে গার্মেন্টস ও আবাসিক এলাকা হওয়ায় সমস্যা।'

পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. আবদুল হামিদ বলেন, আমি নতুন দায়িত্ব নিয়েছি। বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে শিগগির সংশ্নিষ্ট বিষয়ে খোঁজ নেব। অনিয়ম পাওয়া গেলে আইন অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের গাজীপুর কার্যালয়ের উপপরিচালক নয়ন ভূঁইয়া বলেন, এসএস স্টিল মিলের দূষণের বিষয়ে আমি অবগত। দু-এক দিনের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


বিষয় : কালো ধোঁয়া ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক এসএস স্টিল মিল বিষের ধোঁয়া

মন্তব্য করুন