সরোয়ার হোসেন চার পুরুষ ধরে বাগদা চিংড়ি চাষ করেন। বছরে শুরুতেই বিভিন্ন এনজিও থেকে সুদে প্রায় চার লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। ৯ বিঘা জমি এক লাখ ও ১৪ বিঘা জমি দেড় লাখ টাকা দিয়ে বর্গা নেন। বাকি টাকা দিয়ে ঘেরের কাজ ও পোনা ছাড়েন। মাছ বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে স্বপ্ন- এই মৌসুমেই শোধ করে দিতে পারবেন ঋণ, পরিবারের সদস্যদের জন্য কিছু কেনাকাটাও করবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন অধরাই থেকে গেল প্রান্তিক এই চিংড়ি চাষির।

দুই সপ্তাহ আগে হঠাৎ সরোয়ারের ৩১-৪০ গ্রেডের চিংড়ি (৩৫-৪০ টিতে কেজি) মারা যেতে থাকে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পাঁচ থেকে ছয় দিনের মধ্যে ঘেরের ৯০ ভাগ চিংড়িই মারা যায়। এতে তার ক্ষতি হয় ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা।

আক্ষেপ ঝরে পড়ে বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম মুজিবনগরের বাসিন্দা সরোয়ার হোসেনের (৪৪) কণ্ঠে- 'বাগদা চিংড়ি আয়ের ওপরেই আমাদের পাঁচ সদস্যের পরিবারের জীবন নির্ভর করে। কিন্তু বছরের শুরুতেই এত বড় ধাক্কা। এখন কীভাবে সংসার চালাব, কীভাবে ঋণ শোধ করব আর কীভাবেইবা ফের চিংড়ি পোনা ছাড়ব। ভরসার চিংড়িই শেষ করে দিল।'

বাগেরহাটের রামপালে চিংড়ি মৌসুমের শুরুতেই প্রচণ্ড তাপদাহ, হঠাৎ বৃষ্টি ও ভাইরাসে আশঙ্কাজনক হারে মারা যাচ্ছে সাদা সোনাখ্যাত বাগদা চিংড়ি। উৎপাদন মৌসুমের শুরুতে এমন বিপর্যয়ে উপজেলার অধিকাংশ চাষি ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। উপজেলার বেশিরভাগ চিংড়ি ঘেরে এ অবস্থার সৃষ্টি হওয়ায় পুঁঁজি হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন চাষিরা।

জনপ্রতিনিধি ও চাষিদের দাবি, গত কয়েক দিনে উপজেলার প্রায় সব ঘেরে ৮০ থেকে ৯০ ভাগ চিংড়ি মারা গেছে। এই মৌসুমে চিংড়িতে অন্তত ৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হবে। তবে রামপাল মৎস্য অফিস বলছে, চিংড়ি মারা যাওয়ার পরিমাণ ৪০ থেকে ৫০ ভাগের বেশি নয়।

রামপালে এ বছর ১৩ হাজার ১২৯ হেক্টর জমিতে বাগদা চাষ হয়েছে। ছোট-বড় সব মিলিয়ে ঘের রয়েছে ৭ হাজার ৪৫০টি। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৮৫০ টন। ২০২০-২১ অর্থবছরে বাগদা উৎপাদন হয়েছিল ৪ হাজার ৪৫৬ টন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ২০০ টন।
এই অঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষের একমাত্র জীবিকা চিংড়ি চাষ বলে জানান হুড়কা ইউপি চেয়ারম্যান তপন কুমার গোলদার। তাঁর ইউনিয়নে দেড় হাজারের মতো ঘেরে এ মাছ চাষ হয়। এ বছর মৌসুমের শুরুতেই ভাইরাসে ৮০ ভাগ চিংড়ি মারা গেছে।

বাঁশতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ মোস্তাফিজুর রহমান সোহেলও চিংড়িতে মড়কের কারণ হিসেবে ভাইরাসের কথা উল্লেখ করেন। 'এই মৌসুমেই চাষিদের অন্তত অর্ধশত কোটি টাকা ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে'- যোগ করেন তিনি।

তবে শুধু ভাইরাসের কারণেই ঘেরে চিংড়ি মারা যাচ্ছে- এমন অভিযোগ সঠিক নয় বলে দাবি রামপাল উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা অঞ্জন বিশ্বাসের। তাঁর ভাষ্য- এই অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তন চিংড়ি চাষে বিপর্যয় ঘটার অন্যতম কারণ। বাগদার জন্য উপযুক্ত তাপমাত্রা ২৬ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর লবণাক্ততার উপযুক্ত মাত্রা ১৫ থেকে ২০ পার্টস পার থাউজেন্ড (পিপিটি)। জলবায়ুগত কারণে তাপমাত্রা বাড়ছে এবং লবণাক্ততা কমছে, দুটো বিষয়ই এ মাছের জন্য ক্ষতিকর। ঘেরের পানির তাপমাত্রা ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠে যাচ্ছে। যেসব ঘেরের পানি বেশি স্বচ্ছ, সেসব ঘেরে তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত চলে যাওয়ার প্রমাণ মিলেছে। লবণাক্ততা কমে বেশিরভাগ ঘেরে ৫ থেকে ৭ পিপিটি, কোনো কোনো সময় এ মাত্রা ২ থেকে ৩ পিপিটিতে নেমে যাচ্ছে। বাগদা উৎপাদনে ঘেরে পানির গভীরতা তিন ফুট বা এক মিটার রাখার জন্য চাষিদের পরামর্শ দিলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁরা তা মানছেন না।

গৌরম্ভা ইউনিয়নের চিংড়ি চাষি হামিদুর রহমান যে তথ্য দিলেন তাতে তাঁদের এখানে ৯০ ভাগ ঘেরের চিংড়ি মরে শেষ। গত বছর ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও করোনাভাইরাসের কারণে তাঁদের অনেক ক্ষতি হয়েছে। আশা ছিল চলতি মৌসুমে ঘেরের পরিবেশ ভালো যাবে এবং গত বছরের লোকসান উঠে আসবে। কিন্তু যেভাবে মড়ক দেখা দিয়েছে, তাতে সেই স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্ন।
'

যারা ঋণ নিয়ে চিংড়ি চাষ করেছেন, ঘুরে দাঁড়াতে না পারলে তাদের জমিজমা বিক্রি করে এই ঋণ পরিশোধ করতে হবে'- এমন আশঙ্কা গৌরম্ভা ইউপি চেয়ারম্যান রাজীব সরদারের।

টাইলস মিস্ত্রির সহকারীর কাজ করেন হাওলাদারপাড়া এলাকার গাজী নাজমুল হোসেন। ছয় সদস্যের পরিবারে একটু সচ্ছলতার জন্য সঞ্চিত অর্থ ও ঋণ নিয়ে ছয় বিঘা জমিতে চিংড়ির পোনা ছেড়েছিলেন। গত চার দিনে ঘেরের ৯০ ভাগ মাছ মারা গেছে বলে দাবি তাঁর।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জেলা কমিটির সদস্য ও স্থানীয় সাংবাদিক সবুর রানার ভাষ্য- স্থানীয়রা সনাতন পদ্ধতিতে ঘের পরিচালনা করায় পরিচর্যা সঠিকভাবে সম্ভব হয় না। সে ক্ষেত্রে ঘেরে চিংড়ির খাদ্য হিসেবে প্রয়োজনীয় উপাদান ফাইটোপ্লাঙ্কটন ও জুপ্লাঙ্কটন তৈরি হয় না। সংকট নিরসনে নিবিড় বা আধা নিবিড় পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষের পরামর্শ তাঁর।

বাগেরহাট জেলা চিংড়ি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ফকির মহিতুল ইসলাম সুমনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রামপালের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ঘের ইতোমধ্যে মড়কে উজাড় হয়ে গেছে। এ শিল্প টিকিয়ে রাখতে ক্ষতির তালিকা করে ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের দ্রুত প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন বলে অভিমত তাঁর।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এএসএম রাসেল জানালেন, তাঁদের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী রামপালের চার ইউনিয়ন বাঁশতলী, গৌরম্ভা, হুড়কা ও ভোজপাতিয়ায় বেশি চিংড়ি মারা গেছে। ইতোমধ্যে সেখান থেকে চিংড়ির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। কী কারণে চিংড়ি মারা যাচ্ছে, তা বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাঁরা ধারণা করছেন, অতিরিক্ত গরম, হোয়াইট স্পট ভাইরাস বা মৌসুমের শেষে ভাইরাসযুক্ত চিংড়ি ঘেরে ছাড়ার কারণে এমনটা হতে পারে। সমস্যা সমাধানে চাষিদের ঘের প্রস্তুত ও পোনা ছাড়ার সঠিক পদ্ধতি ব্যবহারের পরামর্শ দেন এই কর্মকর্তা।

বাগেরহাট চিংড়ি গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এইচ এম রাকিবুল ইসলাম জানান, রামপাল থেকে মৎস্য অফিসে পাঠানো চিংড়ির নমুনা ল্যাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তন ও হোয়াইট স্পট ভাইরাসের কারণে কিছু ঘেরে চিংড়ি মারা যাচ্ছে। চিংড়ির ভাইরাস রোধে সরাসরি কোনো প্রতিষেধক এখনও আবিস্কার হয়নি। তবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চিংড়ি ঘের প্রস্তুত ও মানসম্মত পোনা মজুত নিশ্চিত করতে পারলে ভাইরাসের ঝুঁকি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। এ ছাড়া চিংড়ি গবেষণা কেন্দ্র থেকে বিভিন্ন সময় প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ ক্লিনিকের মাধ্যমে চাষিদের ঘেরে গিয়েও সেবা দেওয়া হয়। কেন্দ্রে আসা চাষিদের চিংড়ি ও পানি পরীক্ষাসহ প্রয়োজনীয় পরামর্শও দেওয়া হয়।