কুমিল্লা সিটি করপোরেশন (কুসিক) নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আরফানুল হক রিফাতের নানা সম্পদের পাশাপাশি কোটি টাকার জিপ গাড়ি ও দামি প্রাইভেটকার রয়েছে। তবে তাঁর পকেট খালি, মানে কোনো নগদ অর্থ নেই তাঁর। এদিকে সদ্য সাবেক মেয়র মনিরুল হক সাক্কুর নিজের বিলাসবহুল ল্যান্ডক্রুজারের পাশাপাশি তাঁর স্ত্রীরও জিপ রয়েছে। দৃশ্যত তাঁর স্ত্রী বড় ধরনের কোনো উপার্জনমূলক কাজে জড়িত না থাকলেও তাঁর রয়েছে সম্পদের পাহাড়। দুই প্রার্থীর হলফনামা থেকে এসসব তথ্য জানা গেছে।

তবে সম্পদের দিক থেকে পিছিয়ে রয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী কামরুল আহসান বাবুল, নিজাম উদ্দিন কায়সার ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী রাশেদুল ইসলাম। তাঁদের কোনো গাড়ি নেই।

রিফাতের যত সম্পদ: নৌকার প্রার্থী রিফাতের শিক্ষাগত যোগ্যতা বিএ। তিনি বর্তমানে কোনো ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত নন। ২০০১ সালের একটি হত্যা মামলা থেকে তিনি অব্যাহতি পেয়েছেন। পেশায় তিনি ঠিকাদার। তাঁর নগদ কোনো টাকা নেই। তাঁর আয়ের উৎস হিসেবে কৃষি খাত থেকে ১০ হাজার, বাড়ি ও দোকান ভাড়া বাবদ তাঁর বার্ষিক আয় ৫ লাখ টাকা। ব্যবসা থেকে বার্ষিক আয় ১৭ লাখ টাকা। প্রার্থীর ওপর নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের বছরে আয় দেখানো হয়েছে ৪ লাখ ৬৬ হাজার টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে আয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ টাকা।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তাঁর জমা আছে ৬ লাখ টাকা। স্ত্রীর নামে আছে ৩৩ হাজার টাকা। নিজের নামে পোস্টাল ও বিভিন্ন সঞ্চয়পত্র আছে ৭৮ লাখ টাকার। আছে ১ কোটি ২ লাখ টাকা দামের একটি জিপ গাড়ি এবং ২০ লাখ টাকা দামের একটি প্রাইভেটকার।

তিনি ও তাঁর স্ত্রীর স্বর্ণ আছে ৫০ ভরি। রিফাতের নিজ নামে ৩ লাখ ও স্ত্রীর নামে ৫০ হাজার টাকার ইলেক্ট্রনিকস সামগ্রী আছে। অন্যান্য আসবাবপত্র আছে নিজের নামে ৩ লাখ ও স্ত্রীর নামে ৮৫ হাজার টাকার। অন্যান্য ব্যবসায় রিফাতের মূলধন আছে ৬ লাখ টাকা। রিফাতের স্থাবর সম্পত্তির মধ্যে আছে কোটবাড়ী এলাকায় ১৭ শতক জিম। স্ত্রীর নামে জমি আছে ৬ শতক। ফেনীতে যৌথ মালিকানায় আছে একটি আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন, যার মূল্য দেখানো হয়েছে ৩০ লাখ টাকা।

ঢাকায় তাঁর ৪০ লাখ টাকার ও কুমিল্লায় ৩০ লাখ টাকার অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে।

সাক্কু দম্পতির সম্পদের পাহাড়: তিনি কুসিকের দু'বারের মেয়র। বিএনপি থেকে পদত্যাগ করে তিনি স্বতন্ত্র পদে প্রার্থী হয়েছেন। তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি। গত কয়েক বছরে তাঁর নিজের ও স্ত্রীর সম্পদ বেড়েছে কয়েক গুণ।

সাক্কুর নিজের নামে একটি ল্যান্ডক্রুজার জিপ ও স্ত্রীর নামে একটি জিপ গাড়ি আছে। স্বর্ণালঙ্কারের মধ্যে নিজ ও স্ত্রীর নামে আছে ২০ তোলা স্বর্ণ। ইলেকট্রনিকস ও আসবাবপত্রের মধ্যে আছে ১ লাখ ৪৭ হাজার টাকার মালপত্র। স্থাবর সম্পত্তির মধ্যে নিজের নামে ২০ একর কৃষি জমি ও ১৪৬ শতকের একটি পুকুর, নাল জমি আছে ১০৪ শতক। স্ত্রীর নামে আছে ১.২৩ একর জমি।

সাক্কুর নিজের নামে রাজধানী ঢাকায় পৃথক পাঁচটি স্থানসহ কুমিল্লা নগরীর বজ্রপুর এলাকায় তাঁর জমি রয়েছে মোট ৪১ শতক। স্ত্রীর নামে রাজধানীর বসুন্ধরায় আছে তিন কাঠার প্লট। প্রার্থীর নিজের নামে ফ্ল্যাট রয়েছে কুমিল্লা নগরীতে দুটি। স্ত্রীর নামে নগরীর রেসকোর্স এলাকায় রয়েছে বহুতল ভবন ও রাজধানীর ধানমন্ডিতে স্ত্রীর নামে দোকান। এ ছাড়া স্ত্রীর নামে নগরীর বজ্রপুর এলাকায় বহুতল ভবন ও ঢাকায় দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে। তাঁর কোনো দায়দেনা নেই।

২০১৭ সালে হলফনামায় সাক্কুর নিজ নামে নগদ ৮৭ লাখ টাকা ছিল। এবার নগদ আছে ১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। স্ত্রীর নামে ২০১৭ সালে ছিল ৫৫ লাখ টাকা, এবার আছে ৯৯ লাখ টাকা। এ বছরের তথ্যে তাঁর বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট, দোকান ও অন্যান্য খাতে আয় দেখানো হয়েছে ৪ লাখ টাকা। এ খাতে নির্ভরশীলদের কাছ থেকে আয় দেখানো হয়েছে ৬৪ লাখ টাকা।

ব্যবসা খাতে নির্ভরশীলদের আয় ২০ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে। প্রার্থীর শেয়ার, সঞ্চয়পত্র, ব্যাংক আমানত রয়েছে ৩ লাখ টাকার। তিনি মেয়র হিসেবে বার্ষিক সম্মানী ভাতা পেয়েছেন ১৬ লাখ টাকা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নিজের নামে জমা আছে ২ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। স্ত্রীর নামে ব্যাংকে আছে ৯ লাখ টাকা। বিভিন্ন কোম্পানিতে জমা আছে ২ লাখ টাকা। পোস্টাল সঞ্চয়পত্র ৫০ লাখ ও স্ত্রীর নামে আছে ৩৯ লাখ টাকা।

সাক্কুর বিরুদ্ধে বর্তমানে দুদক ও আয়কর আইনের দুটি মামলা বিচারাধীন। এ ছাড়া তিনি আগে হত্যাসহ ফৌজদারি ও অন্যান্য আইনে ১০টি মামলা থেকে অব্যাহতি বা খালাস পেয়েছেন।

মাসুদ পারভেজ খান ইমরান: তিনি প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা আফজল খানের ছেলে। ইমরানের শিক্ষাগত যোগ্যতা বিএসএস। তাঁর বিরুদ্ধে ২০১৬ ও ২০১৯ সালের পৃথক দুটি মামলা বিচারাধীন। তিনি অতীতে দুটি ফৌজদারি মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন। এ ছাড়া একটি মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে সাজার আদেশ হাইকোর্টে স্থগিত আছে। কৃষি খাত থেকে তাঁর আয় ২০ হাজার টাকা, ব্যবসা থেকে আয় ১৪ লাখ টাকা, অন্যান্য উৎস থেকে আয় ৮ হাজার ২০৫ টাকা।

তাঁর স্ত্রীর বার্ষিক আয় ৭ লাখ ৮০ হাজার টাকা। অস্থাবর সম্পত্তির মধ্যে নগদ টাকা আছে ২ লাখ ৪২ হাজার, ব্যাংকে নিজ নামে জমা আছে ৩ লাখ টাকা। স্ত্রীর নামে নগদ ও ব্যাংকে আছে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

নিজের নামে আছে ৫২ লাখ টাকা দামের একটি জিপ, স্ত্রীর নামে ১১ লাখ ৫০ হাজার টাকা দামের একটি প্রাইভেট কার। নিজের ২৫ তোলা ও স্ত্রীর ৫০ তোলা স্বর্ণ আছে। নিজ ও স্ত্রীর নামে ইলেকট্রনিকস ও অন্যান্য আসবাবপত্র আছে ৪ লাখ টাকার। নিজের নামে অন্যান্য ব্যবসায় মূলধন আছে ৫ লাখ টাকা। স্থাবর সম্পত্তির মধ্যে নিজের নামে নগরীর শাকতলা এলাকায় ৭৭.৬৬ শতক জমি আছে। লালমাই পাহাড়ে বাগান আছে ১.১২ একরের।

নিজাম উদ্দিন কায়সার: তিনি স্বেচ্ছাসেবক দল থেকে পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র পদে প্রার্থী হয়েছেন। তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা বিকম। তাঁর বিরুদ্ধে বিচারাধীন ফৌজদারি মামলা রয়েছে আটটি। খালাস পেয়েছেন চারটি মামলা থেকে। দ্রুত বিচার আইনের একটি মামলার কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। বার্ষিক আয়ের উৎস দেখানো হয়েছে- চাকরি থেকে ৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা। তাঁর নগদ আছে ৩৮ লাখ ৭২ হাজার টাকা। ব্যাংকে জমা আছে ৩ লাখ টাকা। বেসরকারি বিভিন্ন কোম্পানি থেকে আয় ৪০ হাজার টাকা। নিজের ৩০ তোলা ও স্ত্রীর ২০ তোলা স্বর্ণ আছে। ইলেকট্রনিকস সামগ্রী আছে ১ লাখ ৯ হাজার ও স্ত্রীর নামে ইলেকট্রনিকস ও আসবাবপত্র আছে ৭ লাখ টাকার।

রাশেদুল ইসলাম: তিনি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী। তিনি নগরীর আসাদনগর এলাকার বাসিন্দা। তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। নগদ টাকা আছে ৫০ হাজার। ব্যাংকে আছে ২ লাখ ৪২৮ টাকা। অকৃষি জমি আছে ৮.২৫ শতক।

কামরুল আহসান বাবুল: তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী। তাঁর বিরুদ্ধে দুটি মামলা আছে। ব্যবসা থেকে তাঁর বার্ষিক আয় ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। নগদ টাকা আছে ৩ লাখ ৫০ হাজার। ব্যাংকে আছে ৫ হাজার টাকা। ইলেকট্রনিকস সামগ্রী ও আসবাবপত্র আছে ৪০ হাজার টাকার। অস্থাবর সম্পদ আছে ২ লাখ ৯০ হাজার টাকার। ৩ লাখ ৪০ হাজার টাকার অকৃষি জমি আছে। ১.৭৫ শতক জমির মধ্যে একটি নির্মাণাধীন ভবন আছে।