করোনা অতিমারির প্রভাব কাটিয়ে কাজের চাপ অনেক বেড়েছে পোশাক খাতে। এমনকি আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে কর্মঘণ্টা বেশি শ্রমিকদের। এখন গড়ে ১০ ঘণ্টা কাজ করছেন তারা। মূল বেতনের সঙ্গে ওভারটাইম হিসেবে আয় বেড়েছে। তবে তাদের বাড়তি এ আয় কেড়ে নিচ্ছে মূল্যস্ম্ফীতি। এতে তাদের প্রকৃত আয় কমেছে, কমেছে ক্রয় ক্ষমতা।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) এবং পোশাক শ্রমিকদের সঙ্গে বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ চ্যানেল দ্য গার্মেন্ট ওয়ার্কার ডায়েরিসের (জিডব্লিউডি) যৌথ জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। মাইক্রো ফিন্যান্স অপরচুনিটি (এমএফও) এতে সহযোগিতা দিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার এক ওয়েবিনারে এ জরিপের ফল প্রকাশ করা হয়। এতে শ্রমিকদের এ সংকটময় পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে তাদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া শ্রমিকদের জন্য রেশনিংয়ের ব্যবস্থা করার কথাও বলা হয়েছে এতে।

অনুষ্ঠানে সানেমের নির্বাহী পরিচালক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেন, করোনাকালে পোশাক শ্রমিকদের জীবনযাত্রায় কী পরিবর্তন এসেছে তা বোঝার জন্যই এ জরিপটি চালানো হয়। জরিপে উঠে আসা ফল থেকে ব্র্র্যান্ড-ক্রেতা, উদ্যোক্তা ও মালিকপক্ষ যাতে নীতিনির্ধারণী পদক্ষেপ নিতে পারেন- সে ব্যাপারে সহায়তা দেওয়াও জরিপের উদ্দেশ্য।

২০২০ সাল থেকে প্রতি সপ্তাহভিত্তিতে শ্রমিকদের গ্রুপের সঙ্গে আলোচনা এবং শ্রমিকদের কাছে থাকা ডায়েরি থেকে নেওয়া হিসাবের ভিত্তিতে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। ডায়েরিতে শ্রমিকরা সপ্তাহের আয়-ব্যয় লিখে রাখেন। এক হাজার ৩০০ শ্রমিক জরিপে অংশ নেন। তাদের ৭৬ শতাংশই নারী। জরিপ এলাকা ছিল ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়া ও চট্টগ্রাম।

গতকালের অনুষ্ঠানে জরিপের ফল উপস্থাপন করেন সানেমের চেয়ারম্যান বজলুল হক খন্দকার এবং জিডব্লিউডির মাঠ ব্যবস্থাপক ফারাহ মারজান। আলোচনায় অংশ নেন এমএফওর প্রতিনিধি ড্যানিয়েল ওর্তেগা।

জরিপে দেখা যায়, ২০২০ সালের এপ্রিলের লকডাউনের পর থেকেই শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা বেড়েছে। এতে বেতনের সঙ্গে ওভারটাইমসহ শ্রমিকদের আয়ও বেড়েছে। তবে যে পরিমাণ আয় বেড়েছে, তার চেয়ে বেশি হারে বেড়েছে চালের মূল্য। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত সময়কে তুলনা করা হয়েছে। এ সময় শ্রমিকরা যে ধরনের চাল কিনে থাকেন সেগুলোর দর বেড়েছে ১৩ শতাংশ। এ সময়ে বাড়ি ভাড়া বেড়েছে ১৭ শতাংশ। তিন হাজার টাকার ভাড়া দাঁড়িয়েছে সাড়ে তিন হাজার টাকায়। অন্যান্য পণ্যের দরসহ বিভিন্ন ব্যয় তো আছেই।

জরিপের সাক্ষাৎকারে একজন শ্রমিক বলছেন, তার বেতন ৯ হাজার ৪০০ টাকা। ওভারটাইমসহ ১২ হাজার টাকা আয় করেন তিনি। আরেক শ্রমিক জানান, করোনা-পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় এখন তারা ভালো আছেন। কারণ করোনার আগে কারখানায় কাজ কম ছিল। এ কারণে বেতনও নিয়মিত ছিল না। প্রতি মাসে বেতনের অর্ধেকের মতো পেতেন। এখন নিয়মিত বেতন পান তিনি।

জরিপে দেখা যায়, করোনা টিকার প্রথম ডোজ পেয়েছেন অন্তত ৮০ শতাংশ শ্রমিক। নারী শ্রমিকদের মধ্যে এ হার ৭৭ শতাংশ। তবে দ্বিতীয় ডোজ কত শ্রমিক পেয়েছেন সে ব্যাপারে সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। করোনাকালে মাত্র ১০ শতাংশ শ্রমিক তাদের সন্তানের শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পেরেছেন। ক্ষতি পুষিয়ে নিতে স্কুল ও সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং বিজিএমইএ থেকে উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

অনুষ্ঠানে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে পোশাক খাতে রপ্তানি আদেশ অনেক বেড়েছে। সেসঙ্গে কাজও বেড়েছে। ব্যবসা সম্প্রসারণ করছেন উদ্যোক্তারা। এতে শ্রমিক সংকট দেখা দিচ্ছে। প্রয়োজনীয় সংখ্যক শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে শ্রমিকদের দিয়ে অতিরিক্ত কাজ করাতে হচ্ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনাকালে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে সরকারের দেওয়া প্রণোদনার আওতায় ডিজিটাল মাধ্যমে বেতন পেতেন শ্রমিকরা। ২০২০ সালের এপ্রিলে ৭৬ শতাংশ বা প্রায় ২০ লাখ শ্রমিক এ ব্যবস্থায় যুক্ত ছিলেন। তবে তার তিন মাস পরই আবার নগদ বেতন পরিশোধের পদ্ধতিতে ফিরে গেছেন মালিকরা। এখন তা ৫৩ শতাংশে নেমে এসেছে। কী কারণে ডিজিটালাইজেশনের এ প্রক্রিয়া থেমে গেল তা জেনে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার বলে মন্তব্য করা হয়েছে প্রতিবেদনে।