বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার মেঘনাতীরের গ্রাম উলানিয়া। এই গ্রামেরই চৌধুরীবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী। তাঁর মৃত্যুতে পুরো গ্রাম শোকে মুহ্যমান। আজ শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত উলানিয়া বন্দরের সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা শ্রদ্ধা জানাবেন তাঁদের গর্ব আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর প্রতি। আজ জুমার নামাজ শেষে দক্ষিণ উলানিয়া ও উত্তর উলানিয়া ইউনিয়নের সব মসজিদে তাঁর রুহের মাগফেরাত কামনা করে দোয়া করা হবে।

উলানিয়া চৌধুরীবাড়ির বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা ইউসুফ চৌধুরী (৭৩) গ্রামেই থাকেন। সম্পর্কে তিনি গাফ্‌ফার চৌধুরীর ভাতিজা। তিনি সমকালকে বলেন, 'গাফ্‌ফার চাচা সর্বশেষ ২০১২ সালে উলানিয়া এসেছিলেন করোনেশন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শতবর্ষ পূর্তি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে। তাঁর সঙ্গে তখন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও এসেছিলেন।' তিনি জানান, আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর ভাইরা সবাই মারা গেছেন। ঢাকায় এক বোন আছেন। তাঁর নাম ফজিলাতুন্নেছা চৌধুরী।

ইউসুফ চৌধুরী বলেন, 'চাচার সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি। আমাকে খুব ভালোবাসতেন। সকালে চাচার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো গ্রামে শোকের ছায়া নেমে আসে। শত শত মানুষ এসেছে উলানিয়া চৌধুরীবাড়িতে। তাঁরা জানতে চেয়েছেন কবে মরদেহ দেশে আনা হবে? উলানিয়ায় জানাজা হবে কিনা?'

মোবাইল ফোনে সমকালের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন ইউসুফ চৌধুরী। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেন, মেঘনার কড়াল গ্রাস থেকে উলানিয়া রক্ষা পেয়েছে চাচার জন্য। উলানিয়াবাসী তাদের অভিভাবক হারালো।

উলানিয়া চৌধুরীবাড়ির সন্তান আকবর আলী চৌধুরী (৫৫) সম্পর্কে আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর নাতি। তিনি বলেন, 'দাদা আমাদের ঘরে এসে পড়াশোনা করতেন। আমার মায়ের আপন মামা ছিলেন তিনি। দেশে এলে আমাকে নিয়ে রিকশায় ঘুরতেন খুব। আব্বার সঙ্গে দাদার খুব ঘনিষ্ঠতা ছিল। আমাকে খুবই পছন্দ করতেন।'

স্থানীয় এনায়েত চৌধুরী মিল্টন গাফ্‌ফার চৌধুরীর চাচাত ভাইয়ের ছেলে। তিনি বলেন, 'উলানিয়ার প্রতি বিশেষ মায়া ছিল তাঁর। বিদেশে থাকার কারণে গ্রামবাসী চাচাকে খুব বেশি কাছে পায়নি। তবে আজ মনে হচ্ছে আমরা আমাদের বড় সম্পদ হারিয়েছি।'
উলানিয়ার বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল খালেক বলেন, 'এতদিন পরিচয় দিতাম আমরা গাফ্‌ফার চৌধুরীর গ্রামের মানুষ। আমাদের পরিচয়ের আলো নিভে গেলো।' উলানিয়া করোনেশন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হেলাল উদ্দিন বলেন, গাফ্‌ফার চৌধুরীর বাড়ি সংরক্ষণ করে ইতিহাস রক্ষা করা প্রয়োজন।

সর্বশেষ গত ১৩ মে শুক্রবার সন্ধ্যায় বরিশালের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের নেতাদের সঙ্গে প্রায় ১০ মিনিট কথা হয় আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর। তখন তিনি লন্ডনের হাসপাতালে শয্যাশায়ী।

বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক নজমুল হোসেন আকাশ সমকালকে বলেন, শুক্রবার সন্ধ্যায় ছিল বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদের বার্ষিক সাধারণ সভা। এক শুভাকাঙ্ক্ষীর মাধ্যমে সভা চলাকালে তাঁরা ভার্চুয়ালি যুক্ত হন আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি আমাদের উদ্দেশে বলেন, 'বরিশালের সাংস্কৃতিক কর্মীদের মৌলবাদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এগিয়ে যেতে হবে। ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হবে প্রগতির আলো।' তিনি বরিশাল আসার খুব ইচ্ছা ব্যক্ত করে বলেন, 'সুস্থ হয়ে একবার বরিশাল আসব'।