চলমান বন্যার মধ্যেই সুরমা-কুশিয়ারার উৎপত্তিস্থলের মুখের বিভিন্ন বাঁধ ভেঙে প্রবল বেগে পানি প্রবেশ করছে সিলেটে। এতে এ অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বন্যায় সিলেটের বিয়ানীবাজারের ৮৪ গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঢলের পানিতে মৌলভীবাজারের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। একটানা বৃষ্টি ও উজানের পানিতে কুড়িগ্রামের চিলমারীতে জমির ধান ও পাট তলিয়ে গেছে। বন্যাকবলিত সুনামগঞ্জ শহরে চলছে নৌকা, বেড়েছে জনদুর্ভোগ।

ভারতের বরাক নদের পানি সবচেয়ে বেশি প্রবাহিত হয় সিলেটের কুশিয়ারা নদী দিয়ে। এরপর রয়েছে সুরমা নদী। এবার সেই সুরমা-কুশিয়ারার উৎপত্তিস্থলের মুখের বিভিন্ন বাঁধ ভেঙে প্রবল বেগে পানি প্রবেশ করছে সিলেট অঞ্চলে।

বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে অমলসিদ ডাইক তথা নদী প্রতিরক্ষা বাঁধের প্রায় ৩০ ফুট ভেঙে পানি প্রবেশ করায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে। এর আগে শুক্রবার বিকেলে কুশিয়ারা নদীর বড়চালিয়া, সুপ্রাকান্তি ও রারাই গ্রামের বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে। এর ফলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা দীর্ঘস্থায়ী বন্যা হওয়ার আশঙ্কাও করছেন।

শুক্রবার বিকেলে ডাইক ভাঙনের এলাকা পরিদর্শন করেছেন বিভাগীয় কমিশনার ড. মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ও জেলা প্রশাসক মজিবর রহমান। জেলা প্রশাসক সমকালকে বলেছেন, ৫-৬ ফুট ওপর দিয়ে ৩০ ফুট এলাকাজুড়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। অবস্থা খুবই ভয়াবহ। ডাইকের পাশে অনেক গাছও রয়েছে। সেগুলো উপড়ে গেলে আরও বিপদ বাড়বে। এ অবস্থায় পানি উন্নয়ন বোর্ড কতটুকু কাজ করতে পারবে বলা মুশকিল। তার পরও তাদের ব্যবস্থা নিতে বলেছেন।

সিলেট থেকে পূর্ব সীমান্তের ৯০ কিলোমিটার দূরে জকিগঞ্জ উপজেলার বরাক মোহনায় সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর উৎসমুখের অবস্থান। মূলত ভারত থেকে সুরমা ও কুশিয়ারা নদী হয়ে সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন নদী ও খালে পানি প্রবেশ করে।

জকিগঞ্জের বারোঠাকুরী ইউপি চেয়ারম্যান মহসীন মর্তুজা টিপু জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে অমলসিদ ডাইক ভেঙে প্রবল বেগে এলাকায় পানি ঢুকছে। এতে বারোঠাকুরী, কসকনকপুর, কাজলশাহ সুলতানপুর ইউনিয়ন তলিয়ে গেছে। ধীরে ধীরে এ পানি সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় প্রবেশ করবে।
জকিগঞ্জে তিন নদীর মোহনার বাঁধ ভাঙায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা করছেন পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সিলেটের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী একেএম নিলয় পাশা। তিনি সমকালকে জানান, বিভিন্ন স্থানে পাউবোর আওতাধীন বাঁধের ৩০-৩৫টি স্থানে ভেঙে গেছে। সব বাঁধই ঝুঁকিতে রয়েছে।

এদিকে বন্যার কারণে সিলেট জেলার ৭ শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। প্রায় ২০০ প্রতিষ্ঠানে খোলা হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্র। সিলেট নগরীর অর্ধশত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ জেলার ১৩ উপজেলার প্রায় ৪০০ প্রতিষ্ঠানে পানি উঠেছে। এর মধ্যে বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট, জৈন্তাপুর, জকিগঞ্জ, কোম্পানীগঞ্জ ও সিলেট সদর উপজেলায়। তবে কয়েকটি উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। সুরমা ও কুশিয়ারার কিছু পয়েন্টে পানি বেড়েছে, আবার কিছু পয়েন্টে কমেছেও।

এদিকে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পানি কমছে বলে জানিয়েছেন পানিবন্দিরা। উপশহর, তেররতন, যতরপুর, সোবহানীঘাট, চালিবন্দর, কানিশাইল, শেখঘাট, আখালিয়ার বিভিন্ন এলাকা, ঘাসিটুলা, তালতলা ও জামতলা এলাকায় কিছুটা কমলেও এখনও তাঁরা পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন।
জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের তথ্যমতে, ১৩ উপজেলার মধ্যে ১০টি উপজেলার ৮৬টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি অবস্থায় আছেন ১০-১৫ লাখ মানুষ। এ ছাড়া আউশ ধানের বীজতলা ২ হাজার ৪২১ হেক্টর, বোরো ধান ১ হাজার ৭০৪ হেক্টর ও গ্রীষ্ফ্মকালীন সবজি ১ হাজার ৩৩৪ হেক্টর বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। জেলা ও মহানগর এলাকায় মোট ২৭৪টি বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এর মধ্যে জেলায় ২৫২টি ও নগরে ২২টি। এসব কেন্দ্রে কয়েক হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।

সুনামগঞ্জ শহরে অথৈ পানি :সুনামগঞ্জে নদী উপচে পানি প্রবেশ করায় জনবসতিতে দুর্ভোগ বেড়েছে। জেলার ছাতকের ২০ শয্যার কৈতক স্বাস্থ্যকেন্দ্রসহ বেশ কয়েকটি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে পানি ওঠায় স্বাস্থ্যসেবা বিঘ্নিত হচ্ছে। সুনামগঞ্জ শহরের পূর্ব নতুনপাড়া, শান্তিবাগ, কালীপুর, ওয়েজখালীর বেশিরভাগ এলাকার সড়ক ডুবে গেছে। ঘরবাড়িতে হাঁটুপানি। কোনো কোনো এলাকায় রিকশা-গাড়ির বদলে চলছে ছোট ছোট নৌকা।

শান্তিবাগের বাসিন্দা অঞ্জন চৌধুরী বলেন, বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে মহল্লার সড়ক ডোবা শুরু হয়, ঘরেও পানি ওঠে। পরে রাতে সবাইকে নিয়ে হাসননগর এলাকায় আশ্রয় নিয়েছেন।

এদিকে, ঢলের পানিতে জেলার ছাতক, দোয়ারা, সুনামগঞ্জ সদর, শান্তিগঞ্জ, তাহিরপুর ও বিশ্বম্ভপুরের নিচু এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
বিয়ানীবাজারে ৮৪ গ্রাম বন্যাকবলিত :সিলেটের বিয়ানীবাজারে সুরমা নদীর পানি কিছুটা কমলেও বাড়ছে কুশিয়ারা নদীর পানি। এতে উপজেলার পাঁচ ইউনিয়নের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। ফলে ভোগান্তিতে পড়েছেন দুর্গত এলাকার মানুষ। শুক্রবার কুশিয়ারা নদীর শেওলা পয়েন্টে বিপৎসীমার ৫৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়েছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় উপজেলার অর্ধশত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। সিলেট-বিয়ানীবাজার মহাসড়কের ১৮টি অংশ ডুবে যাওয়ায় ঝুঁকি নিয়ে বাস চলাচল করলেও ছোট যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে।

উপজেলা বন্যা পর্যবেক্ষণ কক্ষ সূত্রে জানা যায়, পাঁচ ইউনিয়নের ৮৪ গ্রাম বন্যাকবলিত হয়েছে। এসব গ্রামের ৮৮ পরিবার ১৩টি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন।

চিলমারীতে জমির ধান ও পাট তলিয়ে গেছে :এক সপ্তাহ ধরে একটানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে নদের জলে। ব্রহ্মপুত্র নদে পানি বৃদ্ধির কারণে শত শত একর জমির পাট, বোরো ধান, পেঁয়াজ ও মসলা জাতীয় রাঁধুনি ফসল পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষিনির্ভর পরিবারসহ প্রান্তিক কৃষকরা।

রাজারহাটে ধান পানির নিচে : কুড়িগ্রামের রাজারহাটে নদী ও খালবিলে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় শত শত হেক্টর ফসলি জমির বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। পাকা ও আধা পাকা ধান কাটতে প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছেন কৃষকরা।

মৌলভীবাজারের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত : উজানের ঢল ও মৌলভীবাজারের প্রতিদিনের বৃষ্টির পানিতে নদনদী, খালবিল ও হাওরে পানি বাড়ছে। ফলে সদর উপজেলার কুশিয়ারা-তীরবর্তী হামরকোনা, দাউদপুর, ব্রাহ্মণগ্রাম, বাহাদুরপুরসহ বিভিন্ন গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। তীর প্রতিরক্ষা বাঁধের বাইরে থাকা ১০০টির মতো পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। নৌকা ছাড়া তাঁরা ঘর থেকে বের হতে পারছেন না। অনেকে নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। পানিবন্দি মানুষ এখন পর্যন্ত কোনো ত্রাণসামগ্রী পাননি।