প্রতিবেশী ফুফুর বাড়িতে কাজ করতে গিয়ে হারিয়ে যান ইয়াসমিন। বয়স তখন তার ৯ বছর ছিল। জীবনচক্রে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে নিজেও সন্তানের মা হয়েছেন ইয়াসমিন। কিন্তু নিজের বাবা-মা ও ঠিকানায় ফেরার ব্যাকুলতা সব সময় ছিল। অনেক চেষ্টা করেও নিজের ঠিকানায় ফিরতে পারছিলেন না। অবশেষে নিজের ঠিকানা পেয়েছেন ‘আপন ঠিকানার’ মাধ্যমে। প্রায় ২১ বছর পর ঠিকানা পেয়ে খুশি ইয়াসমনি ও তার স্বজনরা।

জানা যায়, ইয়াসমিন ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার বড়হিত ইউনিয়নের জুগিয়াখালি গ্রামের আবদুল হেকিম ও মনোয়ারা বেগম দম্পতির মেয়ে। বাব-মা আর চার ভাইবোনের বড় পরিবার ছিল তাদের। কৃষক বাবার অভাবের সংসারে লেগে থাকত টানাপোড়েন। সে কারণে ময়মনসিংহ নগরীর বাগমারা এলাকায় প্রতিবেশী ফুফুর বাড়িতে কাজে দেওয়া হয়েছিল ইয়াসমিনকে।

২০০০ সালের দিকে কিছু দিন বাসায় থাকার পর ফুফু একদিন ইয়াসমনিকে মারধর করলে রাগ করে বাস থেকে বের হয়ে যায় সে। ঘণ্টা দুয়েক হাঁটার পর হারিয়ে ফেলে বাসায় ফেরার রাস্তা। এরপর একের পর এক হাত বদল হতে থাকে ইয়াসমিন। ঢাকায় গৃহকর্মীর কাজ করে জীবন চালাতে হতো।

একপর্যায়ে নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার খারনৈ ইউনিয়নের তেলীগাঁও গ্রামের শাবুল মিয়ার সঙ্গে পরিচয় হয়। ১২ বছর আগে দু’জন সংসার পাতেন। স্বামীকে ঘিরেই নিজের জীবনের সব হারানোর দুঃখ ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করেন। সংসারে মিম আক্তার (১১) ও গোলাম রাব্বী (৮) নামে দুই সন্তান রয়েছে। এর মধ্যে গত দেড় বছর আগে শাবুল ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। স্বামী হারিয়ে দুই সন্তান নিয়ে অথৈ সাগরে পড়েন ইয়াসমিন। বর্তমানে ঢাকায় একটি বাসায় গৃহকর্মী (রোগীর দেখাশোনা) কাজ করেন বেঁচে আছেন।

ইয়াসমিন হারিয়ে যাওয়ার পর নিজের ঠিকানা খোঁজতে অনেক চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন। অবশেষে আর জে কিবরিয়ার উপস্থাপনায় স্টুডিও অব ক্রিয়েটিভ আর্টস লিমিটেডের ‘আপন ঠিকানা’ অনুষ্ঠানের বদৌলতে নিজ ঠিকানা খুঁজে পেয়েছেন তিনি।

নিজের স্বজনদের যখন পেলেন ইয়াসমিন তখন জানতে পারলেন, ৯ বছর আগে মা মনোয়ারা ও ৪ বছর আগে মারা গেছেন তার বাবা আবদুল হাকিম। গত রোববার রাতে আর জে কিবরিয়ার ফেসবুক পেজ ও ইউটিউবে প্রচার হওয়া ১৮৯ নম্বর পর্বের আপডেট ভিডিওর মাধ্যমে ও পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় এসব তথ্য।

ইয়াসমিন জানায়, একদিন ফুফুর সঙ্গে রাগ করে বাসা থেকে চলে যান। এ সময় তার ভাবনা ছিল বাইরে সারাদিন থেকে আবারও ফিরবেন বাসায়। কিন্তু পথ ভুলে গিয়ে আর ফেরা হয়নি তার। তারপর কয়েকটি বাসায় কাজ করতে করতেই বড় হয়েছে সে।

তিনি আরও জানান, স্বামী হারিয়ে একা হয়েছেন। ২১ বছর পর পরিবার পেলেও বাবা-মা হারিয়েছেন চিরতরে। তবে ভাইদের কাছে এখন প্রশান্তি খুঁজছেন। দু’দিন ধরে মাওনা ওভার ব্রিজের পাশে ভাইদের বাসায় বেড়াচ্ছেন তিনি। আগামী ঈদে ঈশ্বরগঞ্জে বাবার ভিটেতে যাবেন।

ইয়াসমিনের বড় ভাই রমজান মিয়া বলেন, বোনকে হারিয়ে নানাভাবে খুঁজেছি, থানায় জিডিও করেছি; কিন্তু পাইনি। বোনকে ফিরে পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। ইয়াসমিনের জন্য আমাদের মা কাঁদতে কাঁদতে অন্ধ হয়ে মারা গেছেন মা। বাবাও দেখে যেতে পারলেন না হারিয়ে যাওয়া ইয়াসমিনকে।

তিনি আরও বলেন, তিনি মাওনাতে একটি দোকানে কাজ করেন। গ্রামের বাড়িতে কেউ না থাকায় বোন তাদের বাসায় বেড়াচ্ছেন। বোনকে পেয়ে তারা আল্লাহ তায়ালার কাছে শুকরিয়া জানান তিনি।

আর জে গোলাম কিবরিয়া সরকার জানান, একটি ভিডিওর সফল সমাপ্তি করা গেছে। এই বোনটিও তার পরিবারের কাছে ফিরে গেল। এরই মধ্যে আপন ঠিকানার মাধ্যমে ১৩০ জন ও লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ৩০ জনসহ মোট ১৬০ জন হারিয়ে যাওয়া মানুষকে তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

বিষয় : আপন ঠিকানা

মন্তব্য করুন