বগুড়া শহরের 'হোটেলপট্টি'র রেস্টুরেন্টগুলোতে সকাল, দুপুর এবং রাতে মানুষের উপচে পড়া ভিড় লেগেই থাকত। ভাত, রুটি, পরোটাসহ সব ধরনের খাবার কম দামে মেলে বলে খুদে ব্যবসায়ী, ফেরিওয়ালাসহ নানা প্রয়োজনে গ্রাম থেকে শহরে আসা মানুষ ওই রেস্টুরেন্টগুলোতে খেতে বসতেন।

তবে আটা-ময়দা এবং চাল-ডাল ও সয়াবিন তেলসহ প্রায় সব পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে রেস্টুরেন্ট মালিকরা লোকসান ঠেকাতে হয় খাবারের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন, নয়তো পরিমাণে কমিয়েছেন। আর সে কারণেই টিঅ্যান্ডটি ভবনের পেছনের ওই রেস্টুরেন্টগুলোতে নিম্ন আয়ের মানুষের আনাগোনা কমেছে। তাদের বড় একটি অংশ পেটের ক্ষুধা নিবারণে এখন বাধ্য হয়েই ফুটপাতের খাবারের দোকানে যাচ্ছেন। সোমবার দুপুরে 'কাফেলা হোটেল' নামে একটি রেস্টুরেন্টে গিয়ে দেখা গেছে, ৫৪টি চেয়ারের মধ্যে মাত্র ১৩টিতে লোকজন বসে খাবার খাচ্ছেন। অন্য রেস্টুরেন্টগুলোতেও প্রায় একই অবস্থা। টুথব্রাশসহ নানা ধরনের পণ্য ফেরি করেন নওগাঁর পত্নীতলা এলাকার বাসিন্দা জুয়েল আলম। সারাদিন শহর ঘুরে পণ্য বিক্রি শেষে বগুড়া শহরের 'হোটেল পট্টি' এলাকার একটি বোডিংয়ে তিনি রাত যাপন করেন। ওই বোডিংয়ের পাশের রেস্টুরেন্টেই তিনি সকাল ও রাতের খাবার খান। জুয়েল আলম বলেন, 'আমরা যারা ওই হোটেলে (রেস্টুরেন্ট) নিয়মিত খাবার খাই তাদের জন্য আগে ভাতের সঙ্গে সবজি ফ্রি দেওয়া হতো। কিন্তু সবকিছুর দাম বেড়ে যাওয়ার কথা বলে কয়েক দিন আগে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমিনুল ইসলাম নামে অপর এক খুদে ব্যবসায়ী জানান, ওই রেস্টুরেন্টটিতে পরোটার দাম ৫ টাকা বাড়িয়ে এখন ১৫ টাকা করা হয়েছে। তিনি বলেন, সকালে দুটি পরোটা না হলে পেট ভরে না। ডিম ভাজি দিয়ে খেতে গেলে সব মিলে খরচ পড়ে ৪৫ টাকা। কিন্তু ইনকাম কমে গেছে বলে সবদিন তা খাওয়া সম্ভব হয় না। তাই কোনো কোনো দিন ফুটপাতে ২৫ থেকে ৩০ টাকার মধ্যে খিচুড়ি খেয়ে পেট ভরাতে হয়।

কাফেলা হোটেল নামে একটি রেস্টুরেন্টের মালিক রাজু জানান, চাল-ডাল এবং আটা-ময়দা এবং মাছ-মাংসসহ সবকিছুর দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে। আগে এক বস্তা ময়দার দাম ছিল ২ হাজার ৪০০ টাকা, তা কয়েক ধাপে বেড়ে ৪ হাজার ২০০ টাকা হয়েছে। তিনি বলেন, 'এখন পর্যন্ত একমাত্র পরোটা ছাড়া আর অন্য কোনো খাবারের দাম বাড়াইনি। তবে যে অবস্থা চলছে তাতে অন্যান্য খাবারের দাম না বাড়ালে লোকসান গুনতে হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'আমার রেগুলার কাস্টমারদের মধ্যে অনেকে এখন আর আসেন না। তারা হয়তো অন্য কোনো স্থান থেকে খাবার কিনে খাচ্ছেন।' পাশের সুফুরা নামে অপর এক রেস্টুরেন্টের মালিক বাবু জানান, ময়দার দাম বাড়ার কারণে আগের পরোটার সঙ্গে ছোট সাইজের পারোটাও তৈরি করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, লোকসান ঠেকাতে এরই মধ্যে সামুচা তৈরি বন্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া মুরগির ভুনা প্রতিদিনের পরিবর্তে এক দিন পর পর রান্না করা হচ্ছে। সবজি দিয়ে ট্যাংরা মাছের তরকারি রান্নার জন্য এখন ছোট ছোট ট্যাংরা কিনতে হচ্ছে। বগুড়া শহরের বৌবাজার এলাকার ৬২ ধরনের ভর্তার জন্য বিখ্যাত রেস্টুরেন্টের মালিক সুজন মিয়া জানান, সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়লেও তারা এখন পর্যন্ত খাবারের দাম বাড়াননি। তিনি বলেন, যদি বাজার স্থিতিশীল না হয় তাহলে খাবারের দাম বাড়ানো ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না। একই কথা বলেছেন শতাব্দীপ্রাচীন বগুড়ার অভিজাত আকবরিয়া গ্র্যান্ড হোটেলের উপমহাব্যবস্থাপক শামীম তালুকদার। তিনি বলেন, বাড়তি দামে পণ্য কিনলেও এখন পর্যন্ত আমরা কোনো খাবারের দাম বাড়াইনি। এতে আমাদের কষ্ট হচ্ছে। তবে যদি পণ্যের দাম না কমে তাহলে অচিরেই খাবারের দাম সমন্বয় করতে হবে।


বিষয় : কম দামি রেস্তোরাঁ সবজি ফ্রি নেই

মন্তব্য করুন