সালটা ১৮০০-এর আশপাশে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তসংলগ্ন প্রাচীন বাংলার গৌড়ে এক ভগ্নস্তূপে বাস করতেন ফজলবিবি নামের এক বৃদ্ধা। সেই সময় মালদহ জেলা কালেক্টর রাজভেনশ সরকারি কাজে গৌড়ে আসেন ও বৃদ্ধার বাড়ির কাছে শিবির স্থাপন করেন। কালেক্টরের আগমনবার্তা শুনে বৃদ্ধা কালেক্টরের জন্য উপহার হিসেবে তাঁর আঙিনার গাছের আম নিয়ে যান। কালেক্টর আম খেয়ে তো মহাতৃপ্ত। তিনি বৃদ্ধার কাছে সেই আমের নাম জানতে চান। বৃদ্ধা ইংরেজি বুঝতে না পেরে তাঁর নিজের নামই বলে ফেলেন। সেই থেকে আমটির নামকরণ হয় 'ফজলি'। ফজলি আম নিয়ে লোকগল্প বা জনশ্রুতি এমনই।

এই আম নিয়েই রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের মধ্যে শুরু হয়েছে রশি টানাটানি। আমটির ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতির দাবি করছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ। ফজলি আম জিআই পণ্য হিসেবে রাজশাহী জেলার পক্ষে নিবন্ধনের বিরোধিতা করছেন তাঁরা। আমটিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার পক্ষে নিবন্ধনের দাবিতে আপত্তি দাখিল করা হয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়ের পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস বিভাগে। সেই আপত্তির যৌক্তিকতা বিবেচনা করে আজ মঙ্গলবার উভয় পক্ষের শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ উদ্যানতত্ত্ব ও গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুখলেসুর রহমানের দাবি- রাজশাহীর দাবি করা বাঘা ফজলি নামে কোনো আমের জাত নেই।

অন্যদিকে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মুনজের আলম মানিকের ভাষ্য- ১৮০০ সালের দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তসংলগ্ন গৌড়ে ফজলির চাষ শুরু হয়। বিশাল আকৃতির অসংখ্য আমগাছ তারই সাক্ষী। তিনি আরও বলেন, পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস বিভাগ যেসব শর্তের (ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক, উৎপাদন, বিপণন) পরিপ্রেক্ষিতে জিআই পণ্যের স্বীকৃতি দেয়, সবই ফজলি আমের ক্ষেত্রে পূরণ করেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে উৎপাদিত মোট আমের এক-চতুর্থাংশ চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাতেই উৎপাদিত হয়। এ জেলায় ৩৮ হাজার হেক্টর জমিতে প্রায় ৪ লাখ টন আম উৎপাদিত হয়, যার শতকরা ২৩ ভাগ বা প্রায় ৮৮ হাজার টন ফজলি আম। অন্যদিকে, রাজশাহী জেলায় এ আমের উৎপাদন ২৮ হাজার টন। সারাদেশের উৎপাদিত ফজলি আমের ৫৬ শতাংশ আম চাঁপাইনবাবগঞ্জের এবং ১৮ শতাংশ রাজশাহীতে উৎপাদিত হওয়ায় এ আমকে জিআই পণ্য হিসেবে দাবি করছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ।
রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আলীম উদ্দীন। তিনি ভৌগোলিক পণ্য নির্দেশক হিসেবে রাজশাহীর বাঘা ফজলি নামে ফজলি আমের উৎপত্তিস্থল এবং এর জীবনচক্র রাজশাহীর বলে দাবি করেন। আমটির পূর্ব ইতিহাস তাঁদের পক্ষে উল্লেখ করে এর মধ্যস্বত্ব চেয়ে পণ্য ব্যবহারকারীর নিবন্ধনের জন্য ২০১৭ সালের ৯ মার্চ আবেদন করেন। ২০২১ সালের ৬ অক্টোবর পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস বিভাগের ১০ নম্বর জার্নালে এ নিয়ে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। নিবন্ধ প্রকাশের দুই মাসের মধ্যে এটি নিজেদের বলে কেউ আপত্তি না করলে সনদ দেওয়া হবে বলে জানায় সংশ্নিষ্ট বিভাগ। বিষয়টি জানতে পারেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মুনজের আলম মানিক। তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার পক্ষে ফজলি আমকে রাজশাহীর ভৌগোলিক পণ্য নিবন্ধনের বিরোধিতা করে চলতি বছরের ১ মার্চ মামলা করেন। এ মামলার পরিপ্রেক্ষিতেই শুনানি আজ।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের ৯টি পণ্য ভৌগোলিক নির্দেশক হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছে।