কুমিল্লা সিটি করপোরেশন (কুসিক) নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগ ঘরানার রাজনীতিতে রীতিমতো ধূম্রজাল তৈরি হয়ে আছে। এ নির্বাচনে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। কিন্তু ওই প্রার্থীকে ম্যানেজ করার জন্য এখনও ফলপ্রসূ কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তা ছাড়া এখনও গঠন করা হয়নি কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটি।

এ অবস্থায় গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদে কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন দলের কেন্দ্রীয় চট্টগ্রাম বিভাগীয় টিমের পদস্থ নেতারা। ওই বৈঠকে কুসিক নির্বাচন নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। কেউ এই নির্বাচন নিয়ে টুঁ শব্দটিও করেননি। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কুমিল্লা উত্তর আওয়ামী লীগ সভাপতি রুহুল আমিন সমকালকে বলেছেন, বৈঠকে সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কুসিক নির্বাচন নিয়ে কথা হয়নি।

আগামী ১৫ জুন কুসিক নির্বাচন। ২৬ মে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন। কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আরফানুল হক রিফাত দলের মনোনয়ন পেয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন দলের তথ্য ও গবেষণা উপ-কমিটির সদস্য মাসুদ পারভেজ খান ইমরান। এ নিয়ে দলের ভেতরকার দীর্ঘ দিনের গৃহদাহ নতুন করে উস্কে উঠছে। স্থানীয় নেতাকর্মী অনেকেই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন। তাঁরা রীতিমতো কিংকর্তব্যবিমূঢ়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সমকালকে জানিয়েছেন, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময় ফুরিয়ে যায়নি। কুসিক নির্বাচনে দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে। তবে আওয়ামী লীগে বিদ্রোহের কোনো সুযোগ নেই। বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিকভাবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় সরকারের অন্য সব নির্বাচনের মতো কুসিক নির্বাচনেও একই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হবে। কাউকেই ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনায় চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল-আলম হানিফ কুসিক নির্বাচনে দলের বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বলেছেন, 'আমরা আগেভাগেই সার্জারি করব না। বিদ্রোহী প্রার্থীর সঙ্গে আলোচনা করা হবে। ইতিবাচক কিছু না হলে বহিস্কারের সিদ্ধান্ত আসবে।' তিনি বিদ্রোহী প্রার্থীর সঙ্গে আলোচনার কোনো তথ্য জানাতে চাননি।

কেউ টুঁ শব্দটিও করেননি
মাহবুবউল-আলম হানিফ ও আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন ছাড়াও গতকাল কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের বৈঠকে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দলের কেন্দ্রীয় কৃষি ও সমবায় সম্পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলী, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী, ধর্মবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সবুর, কুমিল্লা-৪ আসনের এমপি রাজী মোহাম্মদ ফখরুল, কুমিল্লা-৭ আসনের এমপি ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত, কুমিল্লা উত্তর জেলার সভাপতি রুহুল আমিন এবং সাধারণ সম্পাদক রওশন আলী মাস্টার।

এ বৈঠকে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-বিবাদ মিটিয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হলেও কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। বৈঠকের পর সংশ্নিষ্ট নেতাদের কাছে কুসিক নির্বাচন নিয়ে নীরবতার কারণ জানতে চাইলে কেউই বিষয়টি স্পষ্ট করেননি। তবে তাঁরা সমকালকে বলেছেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে প্রথম নির্বাচন হবে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে। আর এই নির্বাচন যাতে শতভাগ অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু হয়, সে জন্য যা কিছু করা প্রয়োজন, তা-ই করবে আওয়ামী লীগ।

এদিকে আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর কয়েকজন সদস্য জানিয়েছেন, কুসিক নির্বাচন নিয়ে কৌশলগত নানা বিষয় রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর সঙ্গে আলোচনার সুযোগ রয়েছে। আবার কোনো কারণে বিদ্রোহী প্রার্থী নির্বাচনে থেকে গেলেও সমস্যা নেই। এতে নির্বাচন আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হবে। বিএনপি নির্বাচনে না এলেও ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি বাড়বে। সেই সঙ্গে নির্বাচনে মেয়র মনিরুল হক সাক্কুর অবস্থানও গোটা পরিস্থিতিকে ভিন্ন মাত্রায় নিতে যেতে পারে। মূলত এসব বিষয় চিন্তা-ভাবনায় রেখেই আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীকে নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে কোনো ধরনের সমন্বয়ও করা হচ্ছে না। তবে এসব বিষয়ে আগামী দু'এক দিনের মধ্যেই দলের হাইকমান্ডের পক্ষ থেকে সবুজ সংকেত দেওয়া হবে বলে নেতারা জানিয়েছেন। আর কুসিক নির্বাচন নিয়ে তখনই শুরু হবে আওয়ামী লীগের সার্বিক কার্যক্রম।