মানিকগঞ্জ শহরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কালীগঙ্গা নদী। পৌর এলাকার বান্দুটিয়া থেকে শুরু হওয়া খাল শহর বেষ্টন করে বকজুড়ি এলাকায় আবার গিয়ে মিশেছে সেই নদীতে। বর্ষাকালে বান্দুটিয়া ও বকজুড়ি এলাকার দুটি স্লুইসগেট দিয়ে খালটির পানি ওঠানামা করে। অন্য সময় খালটি হয়ে পড়ে পানিশূন্য। অবৈধ দখল, ময়লা ফেলাসহ নানা কারণে এক রকম ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে খালটি।

সোয়া ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ খালটির সংস্কারকাজ বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় শুরু হয়। ২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত দুই দফায় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে এর সংস্কারসহ দুই তীরে বসে সুরক্ষাপ্রাচীর (গাইডওয়াল)। এ ছাড়া কালীগঙ্গা নদীর উৎসমুখে নির্মিত হয় স্লুইসগেট দুটি। নতুন করে ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে খালের সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ শুরু হয়েছে। বুধবার সন্ধ্যায় ভার্চুয়াল মাধ্যমে এর উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক এমপি। নতুন এই প্রকল্পের মধ্যে খালটি খননও রয়েছে। তবে এর পরও এই প্রকল্পটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হওয়া নিয়ে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মনে শঙ্কা রয়েই গেছে। কালীগঙ্গা নদী খনন না হলে এর সুফল মিলবে কিনা, এ নিয়ে প্রশ্ন তাঁদের।

পৌরসভার প্রকৌশল বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, সিটি রিজিয়ন ডেভেলপমেন্ট (সিআরডিপি) প্রকল্পের আওতায় খাল খনন ও সৌন্দর্যবর্ধনে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৭ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। ১০ দশমিক ৬২ শতাংশ কমে যৌথভাবে এই কাজ পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স এপেক্স এন্টারপ্রাইজ ও কামরুল ব্রাদার্স। প্রকল্পের আওতায় তিনটি সেতু নির্মিত হবে। এ ছাড়া সিসি ব্লক দিয়ে খালের পাড় বাঁধাইসহ গড়ে ৫ মিটার চওড়া ওয়াকওয়ে নির্মাণ হবে।

অবৈধ দখল :এদিকে খালটির সীমানা নির্ধারিত হলেও বহু জায়গা প্রভাবশালীদের দখলে। অনেকের বাড়ির পয়ঃনিস্কাশনের ব্যবস্থার সংযোগও এসে পড়েছে এই খালে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ভিক্টোরিয়া ক্লাবের পাশে খালপাড়ের ১ নম্বর খাস খতিয়ানের ৫ শতাংশ ভূমি কৃষিজমি দেখিয়ে দলিল করে নেন সাবেক পৌর কাউন্সিলর খবিরুল আলম চৌধুরী। ওই জমিতে তাঁর নির্মিত তিনতলা ভবন সম্প্রতি পৌর কর্তৃপক্ষ অবৈধ স্থাপনা হিসেবে 'লাল কালি'র চিহ্ন বসিয়েছে। এ বিষয়ে খবিরুল আলম চৌধুরী বলেন, খালের সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য যতটুকু জমির প্রয়োজন হবে, তা ছেড়ে দেবেন তিনি।

গঙ্গাধরপট্টি এলাকার মৃণাল ভট্টাচার্যের বাড়ির সামনে থেকে বাদল রায়ের বাড়ির সামনে পর্যন্ত খালের ওপর পাঁচটি দোকান। দোকানমালিক খালিদুর রহমানের দাবি, আরএস ৭৬ দাগে ৬ শতাংশ জমির মালিক তাঁদের পূর্বপুরুষ। বর্তমানে ২৮৪ ফুট দীর্ঘ ও ১২ ফুট চওড়া এ জমির অংশীদার ১৬ জন। পৌরসভার পক্ষ থেকে ওই জায়গাকে ২০০৮ সালে অবৈধ স্থাপনা হিসেবে উচ্ছেদের নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। এ নিয়ে মামলা করেন তাঁরা, যা বর্তমানে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন।

খালের পাড়ে ৩ শতাংশ জমি রয়েছে সেওতা গ্রামের আবেদা বেগমের নামে। সেখানে বেশ কয়েকটি দোকান তৈরি করে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। তাঁর ছেলে আইনজীবী আসাদুজ্জামান বলেন, জমিটি তাঁর দুই বোনের দখলে রয়েছে। খাল সংস্কারকে স্বাগত জানালেও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির ওপর যেন না হয়- তা নজরে রাখতে বলেন।
আইনজীবী দীপক ঘোষ বলেন, এক সময় খালে সারা বছর পানিপ্রবাহ থাকলেও দখলের কারণে সেটি এখন নালায় পরিণত। দোকানপাট ও স্থাপনা উচ্ছেদ না করলে সরকারের কোটি কোটি টাকা গচ্চা যাবে। খালটি যেন কোনোভাবেই নালা হিসেবে ব্যবহার করা না হয়। এর উৎসমুখ খনন করে সারা বছর পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।
পৌরসভার শহর পরিকল্পনাবিদ রুমানা নাজনিন বলেন, নদীর যে অবস্থা, খনন করেও কাজ হবে না। খালে সারা বছর পানিপ্রবাহ রাখতে হলে পাম্পের মাধ্যমে নদী থেকে পানি আনতে হবে।

খালের উৎসমুখ খনন না করেই এই পরিকল্পনা নেওয়ার বিষয়ে কিছুই বলতে পারেননি পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. বেল্লাল হোসেন। কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ২৫ কোটি ৮ হাজার ৫২৪ টাকায় চুক্তি হয়েছে। দেবেন্দ্র কলেজের সেতুর পাড় থেকে ভিক্টোরিয়া ক্লাব পর্যন্ত বেশকিছু অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ হয়েছে। শিগগিরই অন্যান্য অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদেও তাঁরা অভিযানে যাবেন।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লাভলু খান বলেন, প্রকল্পটির কাজ শুরু করেছেন তাঁরা। তবে খালের ওপর নির্মিত খবিরুল আলম চৌধুরী ও খোরশেদ আলম চৌধুরীর পাকা ভবন এখনও উচ্ছেদ না হওয়ায় কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে।
মানিকগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র গাজী কামরুল হুদা সেলিম বলেন, তিনি নির্বাচিত হওয়ার পর বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।প্রকল্পটি সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়িত হলে পৌরবাসী এর সুফল পাবে বলে মনে করেন।
বর্তমান মেয়র রমজান আলী বলেন, খালের পাড় যাঁরা অবৈধভাবে দখল করে রেখেছেন, তাঁদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা হয়েছে। সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য যে জমির প্রয়োজন, তা ছেড়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তাঁরা।