খুলনার কয়রা উপজেলার আমাদি খেওনা গ্রামের দিনমজুর হায়দার আলী গাজী বসবাস করতেন কয়রা নদীর তীরে খাস জমিতে। ২০০৯ সালের ২৫ মে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় আইলায় গৃহহীন হয়ে পড়েন তিনি। ঝড়ের পর এলাকায় দেখা দেয় খাদ্য ও কাজ সংকট। নতুন করে ঘর তোলার সামর্থ্য না থাকায় স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে আশ্রয় নেন খুলনা নগরীর ঘাট এলাকার গ্রিনল্যান্ড বস্তিতে। এখন রিকশা চালিয়ে চলে এই বৃদ্ধের সংসার।

একই উপজেলার মেঘারাইট গ্রামের কৃষক ইসমাইল সরদার ভিটেবাড়ি হারান আইলার জলোচ্ছ্বাসে। প্রথমে খুলনা শহরে গিয়ে ঠেলাগাড়ি চালান। পরবর্তী সময়ে চলে যান ঝিনাইদহ সদরে। এখন দিনমজুরি করে চলে তার ছয় সদস্যের সংসার।
পশুর নদের তীরে দাকোপ উপজেলার চালনা কলোনিপাড়া এলাকায় খাস জমিতে ৩০ বছর ধরে বসবাস করেন মাছ বিক্রেতা আবদুর রহমান। ঘূর্ণিঝড় আইলা ও আম্পানসহ চারটি ঝড়ে ঘরবাড়ি ভেঙেছে তার। প্রতিবারই কোনোমতে মেরামত করে পরিবারের সাত সদস্যকে নিয়ে সেখানে বসবাস করছেন তিনি। বলেন, যাওয়ার কোনো জায়গা নেই, তাই ঝুঁকি নিয়ে এখানে পড়ে আছি।

শুধু হায়দার আলী ও ইসমাইল সরদারই নন; একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঘরবাড়ি হারিয়ে উপকূলীয় জেলা খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের বিভিন্ন গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন অসংখ্য মানুষ। কেউ খুলনা নগরীতে, কেউ রাজধানীতে আবার কেউ কেউ চলে গেছেন পার্বত্য এলাকায়ও। পেশা পরিবর্তন ও পেশা হারিয়েছেন বহু মানুষ। যারা এলাকায় রয়েছেন, তাদের টিকে থাকতে হচ্ছে প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে। ঘূর্ণিঝড় আইলার ১৩ বছর পরও পাল্টায়নি উপকূলীয় এলাকার চিত্র।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দেশের উপকূলীয় তিন জেলায় বেড়েছে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বেড়িবাঁধ ও নদীভাঙন, অমাবস্যা-পূর্ণিমায় বেড়িবাঁধ উপচে লোকালয়ে লবণ পানি প্রবেশ। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নদীর তীর অথবা বেড়িবাঁধের পাশে খাস জমি বা নিজের জমিতে বসবাস করা লোকজন। একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠেছে নদী তীরবর্তী এলাকাগুলো। এতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কয়েক লাখ মানুষ। তারপরও বাধ্য হয়ে বছরের পর বছর ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন অনেকে। গৃহহীনও হচ্ছেন বহু মানুষ।

জেলা প্রশাসনের ত্রাণ ও পুনর্বাসন শাখা সূত্রে জানা গেছে, গত ১৫ বছরে এই উপকূলে আঘাত হেনেছে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় আইলা, সিডরসহ আটটি ঘূর্ণিঝড়। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বরে ঘূর্ণিঝড় সিডর, ২০০৯ সালের ২৫ মে আইলা, ২০১৩ সালের ১৬ মে মহাসেন, ২০১৯ সালের ৪ মে ফণি, ২০১৯ সালের ১০ নভেম্বর বুলবুল, ২০২০ সালের ২০ মে আম্পান, ২০২১ সালের ২৬ মে ইয়াস এবং ২০২১ সালের ৪ ডিসেম্বর ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এ ছাড়া ২০১৫ সালের ৩০ জুলাই ঘূর্ণিঝড় কোমেন, ২০১৬ সালের ২১ মে রোয়ানু ও ২০১৭ সালের ৩০ মে ঘূর্ণিঝড় মোরা আঘাত করলেও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল সামান্য।

২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় সিডরে তিন জেলায় প্রাণহানি হয়েছিল ৯৫৩ জনের। আর ২০০৯ সালের ২৫ মে আইলায় নিহত হয় ৭৬ জন। এসব ঝড়ে মোট কত মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ কোনো পরিসংখ্যান নেই সরকারি বা বেসরকারি কোনো সংস্থার কাছে। তবে বেসরকারি সংস্থার কিছু সমীক্ষা রয়েছে।

কোস্টাল লাইভলিহুড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল অ্যাকশন নেটওয়ার্কের (ক্লিন) প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী জানান, ২০০৯ সালে আইলার পর তারা একটি সমীক্ষা করেছিলেন। তখন খুলনার কয়রা ও দাকোপ এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলা থেকে ১ লাখ ২৩ হাজার মানুষ এলাকা ছেড়েছিলেন। ঘূর্ণিঝড় আম্পানের পর তারা কয়রা ও শ্যামনগরে সমীক্ষা চালান। ওই সমীক্ষায় দেখা যায়, প্রায় ২১ হাজার মানুষ এলাকা থেকে অন্যত্র চলে গেছেন। ইয়াসের পরও অনেকে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। তিনি জানান, এর আগে ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডরে স্থায়ী বাস্তুচ্যুত হয় প্রায় ৪০ হাজার মানুষ।

ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশনের (আইওএম) গবেষণা বলছে, ঘূর্ণিঝড় আম্পানে খুলনার কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশী, দক্ষিণ বেদকাশী, কয়রা ও মহারাজপুর ইউনিয়ন এবং পাইকগাছা উপজেলার চাঁদখালি, দেলুটি, গড়ইখালি ও লতা ইউনিয়নের ৪ হাজার ৩১৮ জন মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। সংস্থাটির তথ্য বলছে, ঘূর্ণিঝড় আম্পানে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা, বুড়ি গোয়ালিনী, পদ্মপুকুর ও মুন্সীগঞ্জ ইউনিয়ন এবং আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর, শ্রীউলা, আশাশুনি সদর ও বড়দল ইউনিয়নের ১১ হাজার ৩২৩ জন মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়।

খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) ২১ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শামসুজ্জামান মিয়া স্বপন জানান, তার ওয়ার্ডের গ্রিনল্যান্ড বস্তি, ৪, ৫, ৬ ও ৭ নং ঘাট এলাকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাস্তুচ্যুত হয়ে আসা দুই শতাধিক পরিবার বসবাস করে।
কেসিসি থেকে জানা গেছে, নগরীতে ছোট-বড় প্রায় ৪০টি বস্তি রয়েছে। বিভিন্ন সময় দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় এলাকার লোকজন এসব বস্তিতে এসে আশ্রয় নেয়।
কেসিসির প্যানেল মেয়র মো. আলী আকবর টিপু বলেন, প্রত্যেক ঘূর্ণিঝড়েই ঘরবাড়ি হারিয়ে উপকূলীয় এলাকার লোকজন খুলনা শহরে আসে। এরপর বস্তিগুলোতে মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজে নেয়। বিশেষ করে রেলওয়ে এলাকা, লবণচরা, জিন্নাহপাড়া, নতুন বাজার প্রভৃতি এলাকায় আশ্রয় নেয়।

কয়রার দক্ষিণ বেদকাশী ইউপি চেয়ারম্যান আছের আলী মোড়ল বলেন, আইলা, আম্পানসহ কয়েকটি দুর্যোগ এলাকার সব কিছু তছনছ করে দিয়েছে। এলাকায় কাজ নেই। অনেক মানুষ কাজের সন্ধানে শহরমুখী হয়েছে।
উপকূলীয় খুলনার কয়রা, দাকোপ, পাইকগাছা, সাতক্ষীরার শ্যামনগর, আশাশুনি এবং বাগেরহাটের শরণখোলা ও মোংলায় বসবাস করেন ২০ লাখেরও বেশি মানুষ। তবে উপকূলীয় তিন জেলায় ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা মানুষের কোনো পরিসংখ্যান নেই জেলা প্রশাসন কিংবা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নদীর তীরে ও বেড়িবাঁধের পাশে অসংখ্য মানুষ বসবাস করেন। প্রতিবারই ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন তারা। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ এসব মানুষকে অন্যত্র সরিয়ে নিতে কোনো উদ্যোগ নেই।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিন প্রধান অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, উপকূলীয় এলাকার প্রধান সমস্যা দুর্বল বেড়িবাঁধ। প্রাকৃতিক দুর্যোগে কাজে আসছে না ষাটের দশকে মাটি দিয়ে তৈরি দুর্বল বেড়িবাঁধ। এ ছাড়া নদীর নাব্য কমেছে, বেড়েছে জোয়ারের পানির উচ্চতা। ফলে জরাজীর্ণ বেড়িবাঁধ ভেঙে বারবার লবণ পানিতে লোকালয় প্লাবিত হচ্ছে। ঘরবাড়ি, সহায়-সম্পদ হারিয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, উপকূলীয় তিন জেলার এক হাজার ৮৫৪ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে ১৫৭ কিলোমিটার ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় কমেছে বেড়িবাঁধের উচ্চতা ও প্রশস্ততা।
কয়রা উপজেলা চেয়ারম্যান এস এম শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রতি বছরই প্রাণহানির পাশাপাশি অসংখ্য মানুষ নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। নিরুপায় হয়ে অনেকেই এলাকা থেকে শহরে চলে যায়।
খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, উপকূলীয় তিন জেলায় যারা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে, তাদের স্থানান্তর, ঘর তৈরি করে দেওয়াসহ পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানে বিভিন্ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
খুলনা-৬ (কয়রা-পাইকগাছা) আসনের সংসদ সদস্য শেখ মো. আকতারুজ্জামান বাবু বলেন, ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও ইয়াসের পর প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা দুর্যোগের ঝুঁকির বিষয়টি খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে পেরেছেন। ঝুঁকিপূর্ণ লোকজনকে স্থানান্তর করে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. সফি উদ্দিন বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ সংস্কারের জন্য চেষ্টা চলছে।

বিষয় : আইলার ১৩ বছর

মন্তব্য করুন