মার্সিডিজ বেঞ্জ, বিএমডব্লিউ, রেঞ্জ রোভার- গাড়ির জগতে অভিজাত ও বিলাসবহুল ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিত। সারা দুনিয়ায় এর কদর থাকলেও চট্টগ্রাম বন্দরে একেবারেই ভিন্ন চিত্র। এখানে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে নষ্ট হচ্ছে ২৫টি মার্সিডিজ বেঞ্জ, ২৫টি বিএমডব্লিউ, ৭টি রেঞ্জ রোভার, ৭টি ল্যান্ড ক্রুজার, ৬টি লেক্সাস, ৫টি ফোর্ড, ২৬টি মিৎসুবিসিসহ নামিদামি ব্র্যান্ডের ১০৮টি গাড়ি। বার বার নিলামে তোলা হলেও এসব গাড়ির জন্য ক্রেতাও মিলছে না এখন। বিলাসবহুল গাড়ির এমন সর্বনাশের মূলে পাওয়া গেছে তিন 'স'- সময়ক্ষেপণ, সিদ্ধান্তহীনতা ও সিন্ডিকেট।

সংশ্নিষ্টরা জানান, এনবিআরের 'সময়ক্ষেপণ', বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের 'সিদ্ধান্তহীনতা' ও নিলাম 'সিন্ডিকেটের' খপ্পরে পড়ে তিনশ কোটি টাকা মূল্যের এসব গাড়ি নষ্ট হচ্ছে বন্দরের চত্বরেই। অথচ দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া গেলে এসব গাড়ি থেকে শতকোটি টাকা রাজস্ব পেত সরকার।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কাস্টমসের কমিশনার ফখরুল আলম বলেন, 'গাড়িগুলো ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে অনেকবার উদ্যোগ নিয়েছি আমরা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ভালো সাড়া মিলেছে। আশা করি, এবারের নিলামে ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে পারব গাড়িগুলো।'

নিলাম কার্যক্রম তদারকি করা চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের ডেপুটি কমিশনার আল আমিন বলেন, '১০৮টি গাড়ি এ মাসের শেষ সপ্তাহের দিকে নিলামে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। গতবার ১১২টি গাড়ি নিলামে তুললেও বিক্রি হয়েছে মাত্র তিনটি। সেবার ২০টি গাড়ির সিপি (ক্লিয়ারিং পারমিট বা ছাড়করণ অনুমোদন) নেওয়া ছিল। এবারে নিলামে তোলার আগে সব গাড়ির সিপি পাওয়া গেছে।'
কীভাবে জমল এত গাড়ি :পর্যটক সুবিধার সুযোগ নিয়ে প্রায় ১০ বছর আগে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে এসব গাড়ি আমদানি করেছিলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ পর্যটকরা। শুল্ক্কমুক্ত সুবিধার অপব্যবহার করে এসব গাড়ি দেশে হাতবদল করতেন তাঁরা। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর গাড়ি খালাসে ব্যাংক গ্যারান্টি জমা দেওয়ার শর্তারোপ করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। এ কারণে গাড়িগুলো আর খালাস না করে তা বন্দর চত্বরে ফেলে রাখে তারা। নিয়ম অনুযায়ী এসব গাড়ি নিলামে তুলে বিক্রি করার কথা কাস্টমসের। তারা বেশ কয়েক দফা গাড়িগুলো নিলামেও তুলেছিল। কিন্তু নানা কারণে নিলামে বিক্রি হয়নি এসব গাড়ি। গাড়িগুলো তখন থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনারের মধ্যে পড়ে আছে। এসব গাড়ি জার্মানি, জাপান, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি। বয়স ১১ থেকে ২৫ বছর।

এখনও দুই বাধা :ব্যবসায়ীরা বলেছেন, সিপি জটিলতা দূর হলেও পুরোনো এসব গাড়ি রেজিস্ট্রেশন করতে গেলে পড়তে হবে নতুন বিড়ম্বনায়। বিআরটিএর সঙ্গে কথা বলে এই জটিলতা দূর করা গেলে নিলামে এবার ভালো দাম উঠতে পারে গাড়িগুলোর।
আবার নিলামের ক্ষেত্রে সংযোজিত পণ্যের মূল্যের ৬০ শতাংশ কাভারেজ করার নিয়ম রয়েছে। বিলাসবহুল এসব গাড়ির ৬০ শতাংশ মূল্য কাভারেজ করতে গেলে ভ্যাটসহ ৪ কোটি টাকার গাড়িতে অন্তত ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা মূল্য দিতে হবে। অথচ কোনো ধরনের ঝামেলা ছাড়াই পুরোনো গাড়ি দেশে এক কোটি টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। তাই ৬০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের বিষয়টিও অবমুক্ত চান ব্যবসায়ীরা।

মেসার্স আর রেজা প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী সৈয়দ জহিরুল ইসলাম বলেন, 'গাড়ি নিলামের আগে একটি ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। সামগ্রিক দিক বিবেচনা করে এটি করার কথা থাকলেও তা যথাযথভাবে হচ্ছে না। তিন হাজার সিসির পুরোনো বিএমডব্লিউ গাড়ি কিনতে তৃতীয় নিলামে আমি ৭০ লাখ টাকা দর দিই। কিন্তু কাস্টমস বলছে, এ গাড়ির দাম চার কোটি টাকা।' তিনি দাবি করেন, লাইফটাইম যত কমবে গাড়ির দামও তত কমতে থাকে। তা ছাড়া দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় এসব গাড়ির অনেক যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে চাবিও।

কোন গাড়ির দাম কত :নিলামে তোলা গাড়ির মধ্যে আছে ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকার রেঞ্জ রোভার, ১ কোটি ৬১ লাখ টাকার মিৎসুবিসি জিপ, ২ কোটি ২৩ লাখ টাকার মার্সিডিজ বেঞ্জ জিপ, ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকার ল্যান্ড রোভার জিপ, ২ কোটি ১২ লাখ টাকার লেক্সাস জিপ, ১ কোটি ৭৪ লাখ টাকার মিৎসুবিসি পাজেরো, ৩ কোটি ২০ লাখ টাকার ল্যান্ড ক্রুজার জিপ, ২ কোটি ৭৮ লাখ টাকার বিএমউব্লিউ, ২ কোটি ২৭ লাখ টাকার মিৎসুবিসি শোগান, ৩ কোটি ৭০ লাখ টাকার বিএমউব্লিউ এক্স ফাইভ জিপ স্পোর্টস।

পানির দরে কিনতে চায় সিন্ডিকেট :২০১৬ সালে প্রথমবারের মতো ৮৫টি গাড়ি একসঙ্গে নিলামে তোলা হয়। সেবার ২৬টি গাড়ির আগ্রহী কোনো ক্রেতা ছিল না। অবশিষ্ট ৫৯টি গাড়ি কিনতে সেবার ব্যবসায়ীরা দর দিয়েছিল মাত্র ১১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। সেই নিলামে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ প্রত্যাশিত দাম পেয়েছে মাত্র তিনটি গাড়িতে। প্রথম নিলামে কাঙ্ক্ষিত দর না পাওয়ায় ২০১৭ সালের আগস্টে আগের ৮৫টিসহ একসঙ্গে ১১৩টি গাড়ি নিলামে তোলে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস। কিন্তু দ্বিতীয় নিলামেও ২০টি গাড়ির জন্য আগ্রহী কোনো ক্রেতা পাওয়া যায়নি। অবশিষ্ট ৯৩টি গাড়ির দাম উঠেছে মাত্র ২৭ কোটি টাকা। তাই ২০১৮ সালে একই গাড়ি তোলা হয় তৃতীয় নিলামে। এবার অবস্থা হয় আরও করুণ। তৃতীয় নিলামে ১১১টি গাড়ির মধ্যে ৫৬টিতে আগ্রহী কোনো ক্রেতা পাওয়া যায়নি। অবশিষ্ট ৪৫টি গাড়ির দর উঠেছে মাত্র ৭ কোটি ১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। দ্বিতীয় নিলামের তুলনায় তৃতীয় নিলামে গাড়ির দাম কম পড়েছে প্রায় ২০ কোটি টাকা। এই সিন্ডিকেট ভাঙতে গত ৪ নভেম্বরের নিলাম অনলাইনে উন্মুক্ত করে দেয় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।

বিষয় : বন্দর চত্বরে নষ্ট হচ্ছে গাড়ি

মন্তব্য করুন