গ্রামটির অবস্থান সংরক্ষিত বনভূমিতে। তাই খ্যাতি পেয়েছে রিজার্ভপাড়া নামে। কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা এই গ্রামে বসবাস তিন হাজার মানুষের; তাদের বেশিরভাগই দরিদ্র। পাহাড়ি গ্রামটিতে রয়েছে শতবর্ষী গর্জনসহ হরেক প্রজাতির বৃক্ষরাজি।

দিনের বেলায় গ্রামটি দেখে যে কেউই বলবেন- বড় শান্তিতে আছেন এখানকার বাসিন্দারা। তবে রাত হলেই রূপ বদলায় রিজার্ভপাড়া। অস্ত্রধারী অর্ধশতাধিক সন্ত্রাসী দাপিয়ে বেড়ায় এখানে। পাড়াবাসীর ওপর চালায় নানা নির্যাতন। শ্নীলতাহানি ও ধর্ষণের শিকার হন কিশোরী ও তরুণীরা।

এরই মধ্যে বন থেকে বিপুল পরিমাণ গর্জন গাছ কেটে নিয়েছে সন্ত্রাসীরা, দখলে নিয়েছে গ্রামের একটি মাঠ। দীর্ঘদিন ধরে এসব অপকর্ম করে আসছে তারা। সন্ত্রাসীদের এক পক্ষ অন্য পক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষেও জড়াচ্ছে। তবে সন্ত্রাসীদের ভয়ে থানা বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ করতে সাহস পাচ্ছেন না স্থানীয়রা। জিম্মি হয়ে শঙ্কার মধ্যেই বাস করতে হচ্ছে তাদের।

কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জের ডুলাহাজারা বনবিটের সংরক্ষিত বনভূমিতে গড়ে উঠেছে রিজার্ভপাড়া। ডুলাহাজারা ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডে রেল রাস্তার পশ্চিমাংশে এ পাড়ার অবস্থান। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পরে বেশিরভাগ মানুষ এখানে অবৈধভাবে বনভূমি দখল করে বসবাস করছে। তিন শতাধিক বসতবাড়ি রয়েছে এখানে।

সম্প্রতি রিজার্ভপাড়ায় গিয়ে কথা হয় স্থানীয় এক স্কুলশিক্ষকের সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, রিজার্ভপাড়ার বাসিন্দারা বড়ই অসহায়। দিনে শান্তিতে থাকলেও রাত ১০টার পরে এ গ্রামের অবস্থা ভিন্ন রূপ নেয়। অর্ধশতাধিক সন্ত্রাসী বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে।

স্থানীয় মসজিদের এক ইমাম বলেন, আমরা বড় অসহায়। ভয়ে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কথা বলা যায় না। এখানকার বড় সমস্যা হচ্ছে কিশোরী ও তরুণীরা প্রায় প্রতি রাতেই ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। লাজলজ্জার ভয় ও প্রাণ বাঁচাতে কোনো দপ্তরে গিয়ে অভিযোগও করতে পারছে না।

গত ৭ মে চকরিয়া থানায় আয়োজিত 'ওপেন হাউজ ডে' অনুষ্ঠানে জেলা পুলিশ সুপার হাসানুজ্জামানের সামনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ওই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাসানুল ইসলাম আদর রিজার্ভপাড়ার বাসিন্দাদের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ৪০ তেকে ৫০ জন চি‎হ্নিত অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী গ্রামটি জিম্মি করে রেখেছে। বিষয়টি শুনে এসপি হাসানুজ্জামান সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। সন্ত্রাসীদের তালিকা থানা এবং পুলিশ সুপারের দপ্তরে জমা দিতে বলেন তিনি।

ডুলাহাজারা ইউপি চেয়ারম্যান হাসানুল ইসলাম আদর বলেন, পাড়ার প্রতিটি বাড়ির অসহায় অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে সন্ত্রাসীদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তিনি জেনেছেন। সন্ত্রাসীদের একটি তালিকাও করেছেন তিনি। ওই সন্ত্রাসী দল সংরক্ষিত বনএলাকায় গর্জন গাছ কেটে সাবাড় করে দিচ্ছে। এ ছাড়া একসময়ের সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ মাঠটিও (বনবিভাগের মালিকানাধীন) তারা দখল করে রেখেছে।

স্থানীয়রা জানায়, গত সোমবার রাতে দুই দল সন্ত্রাসীর সংঘর্ষে এক পক্ষের প্রধান আমির হোসেন (৪০) ঘটনাস্থলে প্রাণ হারায়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দু'পক্ষই এখন মারমুখী। যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের ঘটনা ঘটার আশঙ্কা করছেন এলাকার লোকজন। নিহত আমির হোসেনের পরিবার দাবি করছে, সে একজন দিনমজুর ছিল। তবে এলাকাবাসীর জানায়, আমির ছিল সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে হত্যাসহ বেশক'টি মামলা রয়েছে।

চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) চন্দন কুমার চক্রবর্তী বলেন, ওই এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ তৎপর রয়েছে। আমির হোসেন হত্যার পর এখনও কেউ মামলা করেনি।