করোনাকালে উপবৃত্তি দেওয়ার নামে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের মোবাইল ফোনে এসএমএস পাঠায় প্রতারকরা। শিক্ষা বোর্ডের নামে ভুয়া ফোন নম্বর দিয়ে যোগাযোগ করতে বলা হয়। 

তাদের ফাঁদে পা দিয়ে কেউ যোগাযোগ করলে কৌশলে মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টের পিন নম্বর সংগ্রহ করে তারা। এরপর ওই অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকলেই তা হাতিয়ে নেয়। এভাবে সরলমনা শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের কাছ থেকে অর্ধকোটি টাকা হাতিয়েছে চক্রটি। 

প্রতারণায় জড়িত এই চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর বুধবার এসব তথ্য জানায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলো আশিকুর রহমান, তার সহযোগী সাইফুল সর্দার ও মোক্তার হোসেন। মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর মাতুয়াইল ও ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে প্রতারণায় ব্যবহৃত ১০টি সিমকার্ড জব্দ করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানাতে বুধবার সকালে রাজধানীর মালিবাগে সিআইডি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। 

এতে সিআইডির এলআইসি শাখার বিশেষ পুলিশ সুপার মুক্তা ধর বলেন, সম্প্রতি উপবৃত্তি দেওয়ার নামে কয়েকটি প্রতারক চক্রের কর্মকাণ্ডে অত্যন্ত উৎকণ্ঠায় রয়েছে শিক্ষার্থী-অভিভাবকসহ সংশ্নিষ্টরা। এসব ঘটনায় দেশের বিভিন্ন থানায় প্রতারণার মামলা হয়। এই প্রতারকদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে কাজ শুরু করে সিআইডি। এরপর তিনজনকে ধরা হয়।

আসামিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তারা দু-তিন বছর ধরে উপবৃত্তির নামে বিভিন্ন শিক্ষার্থীর মোবাইল ফোন নম্বরে মেসেজ দিয়ে প্রতারণা করে আসছে। আগে শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা দেওয়া হলেও করোনাকালে তা বন্ধ রাখা হয়। এ সুযোগ নিয়ে তারা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উপবৃত্তির টাকা দেওয়া হচ্ছে বলে প্রলোভন দেখায়।

সিআইডির এই কর্মকর্তা জানান, চক্রগুলো সাধারণত তিন-চার সদস্যের হয়ে থাকে। প্রত্যেকের কাজ আলাদা। প্রথম সদস্য বিকাশ, নগদ বা রকেট এজেন্টের দোকানে গিয়ে টাকা পাঠানোর নামে দীর্ঘক্ষণ অবস্থান করে। তখন সে কৌশলে গ্রাহকের লেনদেনের খাতার ছবি তুলে নেয়। সেই ছবি ইমো, মেসেঞ্জার বা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে দ্বিতীয় সদস্যের কাছে পাঠিয়ে দেয়। দ্বিতীয় সদস্যের কাজ হলো পিন কোড সংগ্রহ করা। সে টার্গেট ব্যক্তিকে ফোন করে কথা বলার মাধ্যমে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করে।

একপর্যায়ে উপবৃত্তির যে পরিমাণ টাকা দেওয়া হবে, তার সঙ্গে মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টের পিন কোড যোগ-বিয়োগ করে চক্রের আরেক সদস্যকে জানাতে বলা হয়। ভুক্তভোগী না বুঝেই পিন কোড যোগ-বিয়োগ করে চক্রটিকে তথ্য দেয়। তৃতীয় সদস্য পিন কোডটি অসংখ্য মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ সংবলিত একটি ফোনের অ্যাপে লগ-ইন করলে ভেরিফিকেশন কোড যায় ভুক্তভোগীর নম্বরে। তখন দ্বিতীয় সদস্য ভেরিফিকেশন কোডটি জেনে নেয়।

এরপর যখনই ভুক্তভোগীর নম্বরে ক্যাশ ইন হয়, তখনই দলের তৃতীয় সদস্য সেই টাকা তাদের দলনেতার মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেয়।

পরে দলনেতা প্রতারণার মাধ্যমে সংগৃহীত টাকা বিভিন্ন জেলায় অবস্থানরত পরিচিত ব্যক্তিদের কাছে পাঠিয়ে আবারও তা নিজের নম্বরে পাঠাতে বলে। শেষ ধাপে দলনেতা টাকা ক্যাশআউট করে প্রত্যেক সদস্যকে বিভিন্ন হারে বণ্টন করে দেয়। মূলত দলনেতাই ভুয়া এনআইডিতে নিবন্ধিত সিমকার্ড সংগ্রহ করে দলের সদস্যদের সরবরাহ করে।

সিআইডি জানায়, প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক হয়ে চক্রের সদস্যরা বিলাসবহুল জীবনযাপন করে আসছিল। তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা বিচারাধীন।