ঈশ্বরদীতে এবার লোকসানের মুখে পড়েছেন লিচু চাষিরা। মূলত ভেজাল সার ও কীটনাশকের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় তাদের এ ক্ষতি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্নিষ্টরা। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, এ মৌসুমে গত মঙ্গলবার পর্যন্ত মোট লিচুর মাত্র ১০ ভাগ তোলা হয়েছে। গত বছর এ সময়ে এ পরিমাণ ছিল ২৫ ভাগ। ২০২১ সালে ঈশ্বরদীতে লিচু আবাদ হয়েছিল ২৫০০ হেক্টর জমিতে। এ বছর তা বেড়ে হয়েছে ৩১০০ হেক্টর। গত বছর ঈশ্বরদীতে লিচু বিক্রি হয়েছিল ৪৩০ কোটি টাকার। এ বছর জমির পরিমাণ বাড়লেও লিচু বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা কমে নির্ধারিত হয়েছে ৩৪৪ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ গত বছরের চেয়ে এ বছরের ক্ষতির পরিমাণ হবে অনুমানিক ৮৫ কোটি টাকা।

এবার সার ও কীটনাশকে ভেজাল ও গাছে প্রয়োগের ক্ষেত্রে পরিমাণের তারতম্যের কারণে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন উপজেলা কৃষি অফিসের উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা এখলাছুর রহমান। গত মার্চ মাসের প্রথম দিকে সলিমপুর ইউনিয়নের নয়টি স্থানে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও কৃষি বিভাগ ভেজালবিরোধী যৌথ অভিযান চালায়। তারা নয়জনের কাছে ২০ টন ভেজাল কীটনাশক এন্ট্রাকল এবং দস্তা ও বোরোন সার জব্দ করে। এ ঘটনায় চারজনের নামে মামলা করে তারা।

গত শুক্রবার তারা জয়নগর শিমুলতলায় অভিযান চালিয়ে ভেজাল কীটনাশক এন্ট্রাকলসহ কয়েক ধরনের কীটনাশক রাখার দায়ে একজন বিক্রেতার কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করে।
এ কর্মকর্তা জানান, সারের বস্তা ও কীটশানকের প্যাকেটে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আইএমপি (ইমপোর্টেড প্রডাক্ট) নম্বর দেওয়া থাকে। যেসব বস্তা বা প্যাকেটে এ সাংকেতিক নম্বর থাকে না, সেগুলোই ভেজাল বলে চিহ্নিত হয়।
জব্দ করা এসব সার ও কীটনাশকের নমুনা রাজশাহী মৃত্তিকা গবেষণাগারের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়েছে মার্চের প্রথম দিকে। এখনও ফলাফল না পাওয়া গেলেও প্রাথমিকভাবে সব সার ও কীটনাশকেই ভেজাল পাওয়া গেছে বলে তারা জানিয়েছে।

রাজশাহী মৃত্তিকা গবেষণাগারের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মিজানুর রহমান বলেন, ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি বিভাগ থেকে পাঠানো সার ও কীটনাশকের নমুনা পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট প্রস্তুত এখনও সম্পন্ন হয়নি। পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ শেষ হলে চূড়ান্ত রিপোর্ট দেওয়া যাবে। তবে প্রাথমিকভাবে এগুলো ভেজালই মনে হচ্ছে।

তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী দস্তা, বোরোন সার এবং ছত্রাকনাশক কিংবা কীটনাশকে রাসায়নিক পদার্থ জিঙ্ক, সালফার ও দস্তার মাত্রা প্রকারভেদে ২১ মাত্রা, ৪৬ মাত্রা ও ৩৬ মাত্রা থাকার কথা। কিন্তু জব্দ করা সার ও কীটনাশকে ১০-১২ মাত্রার বেশি এসব রাসায়নিক পদার্থ পাওয়া যায়নি। কাঙ্ক্ষিত মাত্রার রাসায়নিক পদার্থ কিংবা দ্রবণ না থাকায় এসব সার ও কীটনাশক ভেজাল বলে প্রতীয়মান হয়েছে। সারের বস্তা ও কীটনাশকের লেবেলে কাঙ্ক্ষিত ও নির্দিষ্ট মাত্রা উল্লেখ করা থাকলেও বাস্তবে ল্যাবে পরীক্ষা করে তা পাওয়া যায়নি।

প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আফছার আলী এসব তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম খানের দেওয়া তথ্যে জানা যায়, ঈশ্বরদীর সলিমপুর এলাকায় মাসুদ রানা নামের এক ব্যক্তি তাঁর দু'জন সহযোগীকে নিয়ে ভেজাল সার ও ভেজাল কীটনাশকের কারবার করেন। তাঁরা অন্য কোম্পানির প্যাকেটে ভেজাল সার ও কীটনাশক নতুন করে প্যাকেটজাত করে জয়নগর, সাহাপুর, ছিলিমপুর, আওতাপাড়া, বাঁশেরবাদাসহ বিভিন্ন গ্রামের সার ব্যবসায়ীর কাছে বিপণন করে থাকেন।

এ কর্মকর্তা জানান, মাসুদ ও তাঁর সহযোগীরা বিভিন্ন কোম্পানির প্যাকেট ও লেবেল গোপনে ছাপিয়ে সেসব বস্তা ও প্যাকেটে ভেজাল সার-কীটনাশক প্যাকেটজাত করে বিক্রি করে আসছিলেন। কৃষকদের অভিযোগ ও গোপন সংবাদের সূত্র ধরে মর্চের শুরুর দিকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও কৃষি বিভাগ ভেজালবিরোধী যৌথ অভিযান চালিয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করে। তাঁদের কাছ থেকে সার ভেজাল করার বিভিন্ন উপকরণ, বিভিন্ন কোম্পানির নামে মুদ্রিত বস্তা, প্যাকেট, লেবেল জব্দ করা হয়। ভেজাল সার উৎপাদন করার দায়ে সলিমপুর কলেজের পাশে গোপনে গড়ে ওঠা তাদের সার কারখানা সিলগালা করা হয়।

ঈশ্বরদীর সাঁড়াগোপালপুর গ্রামের সার-কীটনাশক বিক্রেতা তৌফিক আলমের দাবি, তারা বিভিন্ন কোম্পানির কীটনাশক বিক্রি করেন। কোম্পানির নামে যদি কেউ ভেজাল জিনিস তাদের কাছে সরবরাহ করে, সেটা তারা কীভাবে বুঝবেন।
পাবনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল লতিফের ভাষ্য- শুধু সার ও কীটনাশকের ভেজালের কারণে গত বছরের চেয়ে ঈশ্বরদীতে এ বছর ১০০ কোটি টাকার লিচু কম উৎপাদন হয়েছে। ঈশ্বরদীর বোম্বাই লিচু সাধারণত যে আকারের হয়, এবার তার চেয়ে ছোট হয়েছে। এই লিচুর বৈশিষ্ট্য বিচি ছোট; কিন্তু এবার এ লিচুর বিচিও বড় হয়েছে। ফলে এ বছর বোম্বাই লিচুর উৎপাদনে বড় ক্ষতি হয়েছে।

কৃষি বিভাগ ও কৃষক পর্যায়ে আলাপ করে জানা গেছে, ফল পরিপকস্ফ হওয়ার সময় প্রয়োগের পর কৃষকরা বুঝতে পারেন সার-কীটনাশকে ভেজাল ছিল। এ কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ফলটির উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সাহাপুর গ্রামের লিচু চাষি আমিরুল ইসলাম সরদারেরও ভাষ্য- লিচু পরিপকস্ফ হওয়ার পর তারা ভেজাল কীটনাশক ও সারের বিষয়টি বুঝতে পারেন; কিন্তু তখন করার কিছুই ছিল না।

কৃষক ও কৃষি অফিসের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি লিচু গাছের পেছনে আবাদে সাড়ে চার হাজার টাকা খরচ হয়। ঈশ্বরদীতে প্রতি হেক্টর জমিতে ১১২টি লিচু গাছ অনুযায়ী এই উপজেলায় মোট লিচু গাছ রয়েছে ৩ লাখ ৪৭ হাজার ২০০টি। চাষির সংখ্যা ৮ হাজার ৩২১ জন। এসব লিচু গাছের পেছনে জমির ভাড়া বাদ দিয়ে কৃষককে বিনিয়োগ করতে হয় কমবেশি ১২১ কোটি ৫২ লাখ টাকা।

ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মিতা সরকার জানান, এই এলাকার লিচুর আলাদা সুনাম রয়েছে। কিন্তু দুই-তিন বছর ধরে আবাদের খরচের সঙ্গে উৎপাদনের তারতম্য এবং প্রাকৃতিক কারণ ও কীটনাশকের কার্যকারিতা কমে যাওয়ায় কিছু কিছু কৃষক আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়ছেন। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে তারা চেষ্টা করছেন।