আবুল মাল আবদুল মুহিত ছিলেন একজন বিনম্র চরিত্রের মানুষ। তিনি সবাইকে আপন করে নিতে পারতেন। একইসঙ্গে তিনি ছিলেন একজন বহুমাত্রিক মানুষ। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ার পথে বাংলাদেশ যে এগিয়ে যাচ্ছে, এতে তার অসামান্য ভূমিকা রয়েছে। তিনি তার কর্মগুণে নিজেকে একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন।

শনিবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনস্থ অ্যালামনাই ফ্লোরে প্রয়াত সাবেক অর্থমন্ত্রী ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি আবুল মাল আবদুল মুহিত স্মরণে আয়োজিত এক শোকসভায় এসব কথা বলেন বিশিষ্টজনরা। 'ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন (ডুয়া)' এই শোকসভার আয়োজন করে।

অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এ. কে. আজাদের সভাপতিত্বে এবং মহাসচিব রঞ্জন কর্মকারের সঞ্চালনায় সভায় অন্যান্যদের মধ্যে স্মৃতিচারণ করেন আবুল মাল আবদুল মুহিতের বোন ও জাতীয় অধ্যাপক ডা. শায়লা খাতুন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান, সাবেক কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্যসচিব ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ বার্ষিকী উদযাপন জাতীয় কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী, সাবেক নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা প্রমুখ। এছাড়া সভায় অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ও মহাসচিবসহ বর্তমান কমিটির নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন।

সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত স্মরণে ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত অনুষ্ঠানে অতিথিরা। ছবি: সমকাল

সভায় ডা. শায়লা খাতুন বলেন, ‘তিনি (আবুল মাল আবদুল মুহিত) সবার সঙ্গে একই ধরনের আচরণ করতেন। কে উচ্চপদস্থ বা কে নিম্নপদস্থ তা তিনি ভেদাভেদ করতেন না। তার আরেকটা গুণ হলো, তিনি সবাইকে আপন করে নিতে পারতেন। আমার সব বন্ধু-বান্ধব ও তাদের পরিবারের সঙ্গে তার পরিচয় ছিলো।’ এসময় তিনি আবুল মাল আবদুল মুহিতের আদর্শকে ধারণ করতে নতুন প্রজন্মকে পরামর্শ দেন।

ঢাবি উপাচার্য আখতারুজ্জামান বলেন, ‘আবুল মাল আবদুল মুহিত ছিলেন একজন বিনম্র চরিত্রের মানুষ। জাতি যেমন তার মতো একজন শ্রেষ্ঠ সন্তান পেয়েছে, একইসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পেয়েছে তার মতো একজন গ্রাজুয়েট। তার মতো সন্তান এবং গ্রাজুয়েট আমাদের আরও প্রয়োজন। তাহলে সোনার বাংলা বিনির্মানে আমরা এগিয়ে যেতে পারবো।’

মতিয়া চৌধুরী বলেন, ‘উচ্চমার্গে তার জীবন যাপনে অভ্যস্ত থাকার পরও তিনি সবসময় কৃষিতে গুরুত্ব দিয়েছেন। কৃষি মন্ত্রণালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে মুহিত ভাই আমাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন। যেখানে কৃষিতে ভর্তুকির কথা শুনলে অন্যান্য অর্থমন্ত্রীরা আতকে উঠতেন, সেখানে মুহিত ভাই অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন সারে ভর্তুকি দিয়েছেন। কৃষির আধুনিকায়নে সহযোগিতা করতে তিনি কখনও কার্পণ্য করেননি। তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে আজ বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এর পেছনে দুইজন মানুষের অবদান রয়েছে। একজন হলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আরেকজন হলেন মুহিত ভাই।’

কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী বলেন, ‘মুহিত ভাইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিলো একজন অসাধারণ মানুষের স্নেহ পাওয়ার সম্পর্ক। তিনি ছিলেন একজন বহুমাত্রিক মানুষ। তিনি ছিলেন আমাদের সমকালে অসাধারণ একজন ব্যক্তিত্ব। সোনার বাংলার স্বপ্নযাত্রায় তার অসামান্য ভূমিকা রয়েছে। মুহিত ভাই আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন।’

কে এম নুরুল হুদা বলেন, ‘সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয় ১৯৯৮ সালে। এরপর পরিবেশ আন্দোলনে যুক্ত থাকার কারণে তার সঙ্গে আমার একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছিলো। রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পর তিনি আন্দোলনে ওইভাবে যুক্ত থাকতে না পারলেও তিনি জামিলুর রেজা চৌধুরীর মতো একজন ব্যক্তিকে দায়িত্ব দিয়ে যান। তার মধ্যে একটা গুণ ছিলো যে, তিনি যেই দায়িত্ব পালন করতেন, তা পরিপূর্ণভাবে পালন করতেন।’

সভাপতির বক্তব্যে এ. কে. আজাদ বলেন, ‘মুহিত সাহেব একজন বড় মনের মানুষ ছিলেন। তার ভেতর এবং বাহির দুটোই এক ছিলো।’ স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘একবার তার সঙ্গে তার বাড়ি সিলেটে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিলো আমার। সেখানে তার বাড়ির মধ্যে একটা কমিউনিটি সেন্টার দেখতে পায়। আমি সেটা দেখে অবাক হই, কেন না তার পৈত্রিক ভিটা একটা 'ঐতিহাসিক স্থাপনা' হওয়া উচিত, সেখানে কমিউনিটি সেন্টার কেন? পরে জানতে পারি, এই সেন্টারের ভাড়া দিয়ে ওই বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের খরচ ওঠে। তিনি এবং তার পরিবার কতটা সৎ, এটা থেকে তা বোঝা যায়।’

তিনি বলেন, ‘তার জীবন ছিলো পরিপূর্ণ। একজন মানুষের জীবন সবদিক দিয়ে পূর্ণতা লাভ করেছে, এটা সচারাচর দেখা যায় না।’ এসময় তিনি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের থেকে তার নামে একটা ট্রাস্ট চালু করার ঘোষণা দেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে আবুল মাল আবদুল মুহিতের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর তাকে নিয়ে অ্যালামনাইয়ের সহসভাপতি শাইখ সিরাজ নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।