কুমিল্লা সিটি করপোরেশন (কুসিক) নির্বাচনে মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা শুক্রবার প্রতীক বরাদ্দ পেয়ে শুরু করেছেন আনুষ্ঠানিক প্রচার। এরই মধ্যে এক মন্তব্য করে ভোটের মাঠে উত্তাপ ছড়িয়েছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী আরফানুল হক রিফাত। সাবেক মেয়র ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কুকে দুর্নীতিবাজ আখ্যা দিয়ে তাঁর 'দুর্নীতির শ্বেতপত্র' প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন রিফাত। এবার মেয়র নির্বাচিত হলে নগর ভবনকে 'দুর্নীতিমুক্ত' করারও ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। শুক্রবার রাতে নগরীর রানীর দিঘির পাড় এলাকায় নৌকার প্রধান নির্বাচনী কার্যালয় উদ্বোধনকালে তিনি এ ঘোষণা দেন।

তবে দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে পাল্টা জবাবে সাক্কু সাংবাদিকদের বলেছেন, তিনি কোনো দুর্নীতি করেননি। স্থানীয় সরকার বিভাগ, দুদকসহ বিভিন্ন সংস্থা রয়েছে। তারাও তো অনেক তদন্ত করেছে; দুর্নীতি হয়ে থাকলে তারা ব্যবস্থা নিল না কেন?

এদিকে, আনুষ্ঠানিক প্রচারের দ্বিতীয় দিনে গতকাল শনিবার মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের জমজমাট প্রচারে নগরী ছিল উৎসবমুখর। তবে গতকাল দুপুরে প্রচারে নেমে সাক্কু অভিযোগ করেন, শুক্রবার গভীর রাতে মুখোশ ও হেলমেট পরা দুর্বৃত্তরা নগরীর কান্দিরপাড় থেকে চকবাজার পর্যন্ত তাঁর সহস্রাধিক পোস্টার ও বেশ কিছু ব্যানার ছিঁড়ে ফেলেছে; ভেঙে ফেলেছে তাঁর দুটি প্রচার মাইক। এ বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া আচরণবিধি লঙ্ঘন করায় দুই মেয়র প্রার্থীকে ৬০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

শুক্রবার রাতে নির্বাচনী কার্যালয় উদ্বোধনের সময় বক্তব্য দেন আরফানুল হক রিফাত। এ সময় তিনি বলেন, আমি নির্বাচিত হলে সিটি করপোরেশনকে দুর্নীতিমুক্ত করব। সরকারি ফি ছাড়া আর কোনো ফি মেয়রকে দিতে হবে না।

মেয়র হিসেবে কমিশনও খাব না। সিটি করপোরেশনকে দলীয় কার্যালয় না বানিয়ে কুমিল্লার মানুষের কার্যালয় বানানো হবে। কুমিল্লার মানুষের দীর্ঘদিনের সমস্যা জলাবদ্ধতা ও যানজট নিরসনে প্রাণপণ চেষ্টা করা হবে।

রিফাতের বক্তব্য ও শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবির বিষয়ে গতকাল সন্ধ্যায় সাক্কু সাংবাদিকদের বলেন, আমি দুই মেয়াদে মেয়র ছিলাম। দুদকসহ বিভিন্ন সংস্থায় অনেকেই অভিযোগ করেছেন; কিন্তু তদন্তে কোনো সংস্থা আমার কোনো দুর্নীতি পায়নি। আশা করি, নতুন কেউ মেয়র নির্বাচিত হলে তিনিও পাবেন না।

তিন মেয়র প্রার্থীর প্রচার: গতকাল সকাল ১০টার দিকে নগরীর শিশু মঙ্গল রোড, বাদুরতলা, কান্দিরপাড়, মনোহরপুর, ছাতিপট্টি, চকবাজার, নবাববাড়ি, দক্ষিণ চর্থাসহ আশপাশের এলাকায় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের নিয়ে প্রচার চালান স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী নিজাম উদ্দিন কায়সার। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, পরিকল্পনা ছাড়া বড় বাজেটে অর্থ ব্যয় ও মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে নগরবাসীর সমস্যা দূর হবে না। নির্বাচিত হলে বাসযোগ্য নিরাপদ নগরী গড়ে তোলার আশ্বাস দেন তিনি।

সকাল সাড়ে ১১টার দিকে কাপাড়িয়াপট্টি, রাজগঞ্জ, চকবাজার, কাটাবিল, মোগলটুলি, নুরপুর ও তেরিপট্টি এলাকায় প্রচার চলান মনিরুল হক সাক্কু। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, তাঁর জনপ্রিয়তা দেখে এখন রাতের অন্ধকারে তাঁর পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে।

বিকালে কান্দিরপাড়, রানীর বাজার, স্টেশন রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় নৌকার প্রার্থী আরফানুল হক রিফাতের পক্ষে দলীয় নেতাদের নিয়ে প্রচার চালান আওয়ামী লীগ নেতা ও কুমিল্লা দোকান মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম। এর আগে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে নৌকার প্রার্থীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সভা মহানগর আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়।

সাক্কুর অভিযোগের বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. শাহেদুন্নবী চৌধুরী বলেন, আমরা প্রথমে অভিযোগটি মৌখিক এবং পরে বিকেলে প্রার্থীর পক্ষ থেকে লিখিতভাবে পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

দুই মেয়র প্রার্থীকে জরিমানা: কুসিক নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা শাহেদুন্নবী চৌধুরীসহ পরিদর্শক দলের সদস্যরা গতকাল দুপুরে কালিয়াজুরি এলাকায় প্রচার বাহনে একটির স্থানে দুটি মাইক ব্যবহার করায় নৌকার প্রার্থী আরফানুল হক রিফাতকে ফোনে সতর্ক করেন এবং একটি মাইক খুলে ফেলার নির্দেশ দেন। এ ছাড়া নৌকার সমর্থকরা গণপরিবহনে পোস্টার লাগানোর অভিযোগে তাঁকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অন্যদিকে, ঘোড়া প্রতীকের প্রার্থী নিজাম উদ্দিন কায়সার বিপুলসংখ্যক কর্মী-সমর্থক নিয়ে প্রচার চালানোয় এবং জীবন্ত ঘোড়া নিয়ে মিছিল করায় ভ্রাম্যমাণ আদালত তাঁকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নজরদারি: কুমিল্লার পুলিশ সুপার ফারুক আহমেদ জানান, পুলিশের নিয়মিত টহলের পাশাপাশি ২১টি বিশেষ ভ্রাম্যমাণ টিম নগরীতে কাজ করছে। ১৫টি স্থায়ী চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। এ ছাড়া সাদা পোশাকে নগরীর স্পর্শকাতর স্থানসহ বিভিন্ন স্থানে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ৯টি ভ্রাম্যমাণ টিম ও বিজিবির টহল অব্যাহত আছে।

রিটার্নিং কর্মকর্তা শাহেদুন্নবী চৌধুরী জানান, আচরণবিধি মেনে চলার জন্য আইনের কঠোর প্রয়োগ করা হবে। এ পর্যন্ত নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।